মন্দিরে ভগবান কোথায়?

তামিল মন্দির, মন্দিরের ছবি, মন্দির, ভারতের মন্দির

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের গত দুইশো বছরে এত অবতারের জন্ম হয়েছে, যার সঠিক পরিসংখ্যান হয়ত কেউ দিতে পারবে না। গত পঞ্চাশ বছরে বঙ্গে যত মন্দির হয়েছে, এর অধিকাংশই বিভিন্ন গুরুদের মন্দির। এ গুরুদের অন্ধ শিষ্যরা সকলেই তাদের গুরুকে অবতার বলে মনে করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় বুয়েটের এম এ রশীদ হলে আমার এক নেপালি বন্ধু ছিল। নাম ছিল উমেশ গৌতম। অসম্ভব অমায়িক স্বভাবের ছিল সে।

উমেশ নিয়মিত আমার জগন্নাথ হলে আসত।আমিও যেতাম এম এ রশীদ হলে। লালবাগের ঢাকেশ্বরী মন্দির এবং রমনা কালী মন্দিরে বেশ কয়েকবারই যাওয়া হয়েছে। তাই ঢাকা শহরের অন্যান্য মন্দিরগুলো দর্শন করানোর জন্যে উমেশ আমাকে অনুরোধ করে। তাকে পুরাণ ঢাকার মন্দিরগুলো ঘুরে দেখাতে আমিও রাজি হয়ে যাই। সে অনুসারে ২০০৬ সালের শুরুর দিকে একটি শুক্রবারের ছুটির দিনে, উমেশকে নিয়ে আমি পুরাণ ঢাকার মন্দিরগুলো ঘুরিয়ে দেখানো শুরু করি। আমি ভাবলাম, পুরাণ ঢাকার মন্দিরগুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথম ভাগে শাঁখারীবাজার, তাঁতিবাজার, সূত্রাপুর, সদরঘাট ; অন্য দ্বিতীয় ভাগে স্বামীবাগ, টিকাটুলি, গোপীবাগ ইত্যাদি। তখন আমি ভাবি, এই সপ্তাহ উমেশকে স্বামীবাগ, টিকাটুলি রামকৃষ্ণ মিশনের দিকে নিয়ে যাই, অন্য সপ্তাহ ওকে অন্যস্থানে নিয়ে যাব। এই মনে করে এক শুক্রবার বন্ধের দিন আমরা দুজনে রিক্সায় করে মন্দির দর্শন শুরু করি। প্রথমেই যাই স্বামীবাগ লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রমে। উমেশ খুবই খুশী হয় আশ্রমটি দেখে। লোকনাথ ব্রহ্মচারীর আশ্রম থেকে এরপরে আমরা যাই, টিকাটুলি পুলিশ বক্সের পাশে জগদ্বন্ধু সুন্দরের মহাপ্রকাশ মঠে। সদ্য তরুণ বয়সের জগদ্বন্ধু সুন্দরের অপূর্ব সুন্দর মূর্তিটা প্রচণ্ড আকর্ষিত করে।মনে হয় তিনি সত্যিই সশরীর বসে আছেন।

এরপরে আমরা যাই কে এম দাশ লেনে সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজের বিপরীতে ভোলানন্দ গিরি আশ্রমে। আশ্রম মন্দিরের উত্তরদিকের বেদিতে পূজিত হচ্ছে, স্বামী ভোলানন্দ গিরি মহারাজ এবং একই মন্দিরের কক্ষে পশ্চিম দিকের বেদিতে পূজিত হচ্ছে স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ। চাইলে স্বামী ভোলানন্দ গিরি মহারাজ এবং স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ এ দুজন শৈব সন্ন্যাসীকে একসাথে একই বেদিতে রেখেই তাঁদের পূজা করা যেত। কিন্তু সবার কাছে তাদের গুরুই ভগবান, তাই কি আর করা। একই মন্দিরে দুইপাশে দুজন মহাপুরুষের দুটি পূজার আসন। সাধারণ মানুষ অনেক সময়েই বিভ্রান্ত হয়ে যায় যে, উত্তরদিকে নাকি পশ্চিমদিকে কোনদিকে ফিরে সে প্রণাম করবে।

সেখান থেকে আমরা যাই, অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীতে ২০০৫ সালে সদ্য নির্মিত গোপীবাগে অবস্থিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনে। মন্দিরের চূড়ায় নটরাজের মূর্তি এবং মন্দিরের বাইরের দেয়াল জুড়ে বিভিন্ন গ্রহদেবতাদের মূর্তি দেখে আমিও মুগ্ধ হই, উমেশও প্রচণ্ড মুগ্ধ হয়। রামকৃষ্ণ মন্দিরের বাইরের অংশটি দেখে, আমরা মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করি।মন্দিরে প্রবেশ করে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে প্রণাম করে চরণামৃত গ্রহণ করি।

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের বিগ্রহের কক্ষটি কাঁচ দিয়ে ঘেরা। এ কাঁচের ঘেরাও পর্যন্ত চলে গিয়ে, কাঁচে হাত দিয়ে প্রচণ্ড কৌতুহলী দৃষ্টিতে এদিক ওদিক উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে আমার বন্ধুটি। আমি এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, কি হয়েছে? উমেশ একরাশ কৌতুহল নিয়ে বিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করে, মন্দিরে ভগবান কোথায়? পদ্মের বেদিতে বসা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বিগ্রহ দেখিয়ে আমি বলি, ঐযে বসা আছে। উমেশ বলে, এটা তো মানুষের মূর্তি; তোমাদের বাংলাদেশে কি শুধু মানুষের মূর্তিই পূজা হয়?
সাথে সাথে আমার স্মরণ হয়, তাই তো আমি আজ লোকনাথ ব্রহ্মচারীর মন্দির থেকে রামকৃষ্ণ মন্দির পর্যন্ত যত মন্দির দেখিয়েছি, সকল মন্দিরেই মানুষের বিগ্রহ। শিব, বিষ্ণু, দুর্গা, কালী, কৃষ্ণ আমাদের পূজিত প্রাচীন দেববিগ্রহ তো কোথাও মূলবেদিতে পূজিত নয়। শুধু জগদ্বন্ধু মঠে, জগদ্বন্ধু সুন্দরের সাথে রাধাকৃষ্ণ পূজিত। আমি বন্ধুর প্রশ্নের কি উত্তর দিব, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। একটু সামলে নিয়ে ওকে পাল্টা প্রশ্ন করি, তোমাদের নেপালের মন্দিরগুলোতে কি আমাদের মত এরকম মানুষের বিগ্রহাদি পূজিত হয় না? উত্তরে উমেশ বলে, দেখ নেপালে যে অঞ্চলে আমাদের বাড়ি, সেখানে জন্ম থেকে কোনদিনও আমরা মন্দিরে কোন মানুষের পূজা হতে দেখিনি।

একবার কিছু ভারতীয় মাড়োয়ারিরা মিলে সাঁইবাবার একটি মন্দির তৈরি করে পূজা শুরু করে। কিন্তু অনেক দিন চলে যাবার পরেও, মন্দিরে কোন নেপালিই পূজা দিতে যেত না। বিষয়টি যখন কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, তারা তখন নিজেদের শুধরে নিয়ে বেদির উপরে শিববিগ্রহ স্থাপন করে, সেই শিববিগ্রহের পায়ের কাছে সাঁইবাবার মূর্তিটি স্থাপন করে। পরবর্তীতে সাধারণ নেপালি হিন্দুরা সে মন্দিরে ধীরেধীরে যাওয়া শুরু করে।

উমেশের কথাগুলো শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। আমি ভাবি, আহারে আমাদের বঙ্গেও যদি এমন হত কতই না ভাল হত। নেপালিদের সাথে মিশে মনে হয়েছে, তাদের ধর্মীয় জ্ঞানের থেকে অনুভূতি এবং বিশ্বাসটা তীব্র। সাধারণ নেপালি মানুষেরা অত বেশি ধর্মীয় জ্ঞানে ডুব না দিয়েও, অন্ততপক্ষে এই সহজ সরল সত্যটা সকলেই জানে যে, মন্দিরে দেববিগ্রহ পূজিত হয়। মানুষের মূর্তি নয়। যিনি মহাপুরুষ, সাধক পুরুষ ; তাঁকে আমরা শ্রদ্ধা করব। কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন শ্রদ্ধার সীমানা অতিক্রম করে না যায়। আমরা তেলবাজি করে, বর্তমানে আমাদের আশেপাশের সকল মহাপুরুষ সাধকপুরুষদেরই অবতার বানিয়ে পূজার বেদিতে বসিয়ে দিতেছি।

মহাপুরুষ সাধকপুরুষদের কালী-কৃষ্ণ-শিব ইষ্টদেবতাকে বাদ দিয়ে, আমরা সাধকপুরুষদেরই আমাদের ইষ্টদেবতা বানিয়ে ফেলেছি। মহাপুরুষেরা আমাদের জীবনে সদা অনুসরণীয় ; কিন্তু তাঁরা আমাদের আরাধ্য ইষ্টদেবতা নয়। মানুষকে ভগবান সাজিয়ে পূজা করার তীব্র বিরোধিতা করেছেন শ্রীচৈতন্যদেব। এ প্রসঙ্গে তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশনা আমাদের সকলের স্মর্তব্য এবং অনুসরণীয়। মানুষকে অতিস্তুতি করে যে ঈশ্বরের অবতার বানিয়ে ফেলা হয়; এ বিষয়টির ঘোরতর বিরোধী ছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব । বাংলার আনাচে-কানাচে গত দেড়শো বছরে অবতারের হাইব্রীড ফসল দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছে।কিন্তু শ্রীচৈতন্যদেব তাঁর দূরদৃষ্টি দিয়ে বলেছেন,"জীবধামে কৃষ্ণজ্ঞান" না করতে। জীব এবং ঈশ্বর সমান নয়। যে মূর্খ জীবকে ঈশ্বরের সমতুল্য মনে করে, তাকে পাষণ্ডী বলে। যমরাজও সেই পাষণ্ডীকে দণ্ড প্রদান করে।
প্রভু কহে বিষ্ণু বিষ্ণু ইহা না কহিহ।
জীবধামে কৃষ্ণজ্ঞান কভু না করিহ।।
জীব ঈশ্বর তত্ত্ব কভু নহে সম।
জলদগ্নি রাশি যৈছে স্ফুলিঙ্গের কণ।।
যেই মূঢ় কহে জীব ঈশ্বর হয় সম।
সেই ত পাষণ্ডী হয় দণ্ডে তবে যম।।
(চৈতন্যচরিতামৃত : মধ্য, অষ্টাদশ পরিচ্ছেদ)
শ্রীচৈতন্যদেব সহ সকল মহাপুরুষের আদর্শে উজ্জীবীত হয়ে আমরা একটি সময়ে হয়ত একদিন জাতিকে সঠিক পথ দেখাতে পারব। সে দিন বেশী দূরে নয়, এ মানুষের মন্দিরগুলো একদিন পূর্বের মত সেই দেব মন্দির হবে। মাত্র অর্ধশতাব্দী পূর্বেও অধিকাংশ মন্দিরে দেববিগ্রহ পূজিত হত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ মন্দিরে পূজিত হয় বিভিন্ন গুরু, তার অনুসারী এবং তাদের সন্তানসন্ততি। যে মহাপুরুষ কালীর উপাসক, সেই মহাপুরুষের অনুসারীদের তৈরি মন্দিরের মূলবেদিতে মাকালীর বিগ্রহ স্থাপিত থাকা উচিত। মাকালীর পায়ের কাছে, সেই সাধক বা মহাপুরুষের ছবি মূর্তি থাকবে। কিন্তু নির্মম পরিহাস হল, অধিকাংশক্ষেত্রেই থাকে না।

একইভাবে যিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপাসক বা ভগবান শিবের উপাসক তাঁদের ক্ষেত্রে এই একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ আমাদের প্রত্যেকটি মন্দিরের মূলবেদিতে দুর্গা, কালী, শিব, বিষ্ণু, কৃষ্ণ প্রমুখ দেববিগ্রহ পূজিত হবে।এ উপাস্য বিগ্রহাদির পায়ের কাছে থাকবে বিভিন্ন সাধক এবং মহাপুরুষদের ছবি অথবা বিগ্রহ। সাধকের উপাস্য বৈচিত্রে বিভিন্ন রূপে-রূপান্তরে পরমেশ্বরের বিভিন্ন রূপের প্রকাশ, দেবতাদের কারোই আলাদা সত্ত্বা নেই।সকলেই এক এবং অদ্বিতীয় ব্রহ্মের অনন্ত রূপের করুণাঘন মূর্তি।

কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক,
সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বেদ কি? কেন বেদ একটি বই নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার

বেদ কি? কেন বেদ একটি বই নয় বরং পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার

বেদ কি? কেন বেদ একটি বই নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার


বেদ শব্দটি √বিদ্ ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার উৎপত্তিগত অর্থ জ্ঞান। এ জ্ঞান কোন সাধারণ জ্ঞান নয়; এক অতীন্দ্রিয় অপৌরুষেয় জ্ঞান। ঝর্ণাধারার মত স্নিগ্ধ এ জ্ঞান জীব কল্যাণে নেমে এসেছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে। বেদে ঈশ্বর ঘোষণা করেছেন-
অহং বৃক্ষস্য রেরিবা। কীর্তিঃ পৃষ্ঠং গিরেরিব। (তৈত্তিরীয় উপনিষদ: প্রথম অধ্যায়, দশম অনুবাক)
"আমিই এ জগৎ সংসারের প্রবর্তক। পর্বতশৃঙ্গের মতো সমুন্নত আমার কীর্তি।"

ঈশ্বরই এ জগৎ সংসারের প্রবর্তক। তিনি পৃথিবী কিভাবে চলবে তার একটি নির্দেশিকা দিয়েছেন, সে নির্দেশিকাই বেদ। তাইতো ঋষি মনু বলেছেন, "বেদঃ অখিলধর্মমূলম্।"বেদ অখিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ধর্মের মূল। প্রায় একই কথা ধর্মসূত্রকার ঋষি গৌতমও বলেছেন- "বেদঃ ধর্মমূলম্।" বেদের জ্ঞানকে ঈশ্বরের নি:শ্বাসরূপে অবিহিত করা হয়েছে-

অস্য মহতো ভূতস্য নি:শ্বসিতং যদেতদৃগ্বেদো যজুর্বেদঃ সামবেদঃ অর্থবাঙ্গিরসঃ।
(বৃহদারণ্যক উপনিষদ ০২.০৪.১০)
"সেই পরমেশ্বর থেকেই ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ব বেদের উৎপত্তি। স্বয়ংপ্রকাশ এই চতুর্বেদই পরমেশ্বরের নিঃশ্বাসস্বরূপ। "

যেমন বায়ুপ্রবাহ বিহীন আমরা এক দণ্ডও বেঁচে থাকতে পারি না। তেমনি ঈশ্বরের নিঃশ্বাসরূপ বেদের জ্ঞানপ্রবাহহীন আমরা চলতে পারব না, আমাদের মানবসভ্যতার জ্ঞানপ্রবাহ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাইতো কল্পে কল্পে ভগবান ঋষিদের মাধ্যমে অনন্ত বেদজ্ঞান প্রবাহের প্রকাশ ঘটান।

ঋষয়ো মন্ত্রদ্রষ্টারো ন তু বেদস্য কর্তারঃ।
ন কশ্চিদদ্বেদ কর্ত্তা চ বেদস্মর্তা চতুর্ভুজঃ।।
যুগান্তে অন্তর্হিতান্ বেদান্ সেতিহাসান্ মহর্ষয়ঃ। লেভিরে তপসা পূর্বমনুজ্ঞাতা স্বয়ম্ভূবা।
(মহাভারত: শান্তিপর্ব, ২১০.১৯)
"একমাত্র ভগবান ছাড়া কেউই বেদের স্রষ্টা নয়। বেদদ্রষ্টা ঋষিগণ মন্ত্রদ্রষ্টা মাত্র, বেদের রচনাকারী নন। যুগান্তে প্রলয়কালে ইতিহাস সহ বেদ অপ্রকাশিত হয়ে থাকে। কিন্তু সৃষ্টির শুরুতে মহর্ষিরা তপস্যার মাধ্যমে স্বয়ম্ভূ পরমেশ্বর থেকে এ জ্ঞানপ্রবাহ পুনরায় লাভ করেন।"


অর্থাৎ কল্পে কল্পে ভগবান ঋষিদের মাধ্যমে মানবজাতিকে বেদ জ্ঞান দান করেন। ঋষিদের বলা হয় "সাক্ষাৎকৃতধর্মাণ।" যাঁরা অখিল ধর্মের মূল বেদকে সাক্ষাৎ দর্শন করেছেন, তাই তাঁরা ঋষি। নিরুক্তকার যাস্ক বলেছেন-
তদ্ যদেনাংস্তপস্যমানন্ ব্রহ্ম স্বয়ম্ভ্বভ্যানর্ষত্ত
ঋষয়ো অভবংস্তদৃষীণামৃষিত্বমিতি বিজ্ঞায়তে।।
(নিরুক্ত : ০২.০১.১১.০৬)
দর্শন করেন বলেই তাঁদের ঋষি বলা হয়। তপস্যার গভীরে ঋষিদের কাছে স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মবাণী বেদ স্বয়ং আগমন করে এজন্যই তাঁদের ঋষি বলা হয়। ঋষিদের কাছে বেদবাণী ছবির মত ভেসে ওঠে ধ্যানের গভীরে। এ বেদবাণী দর্শনের জন্যই তাঁদের মন্ত্রদ্রষ্টা বলা হয়; মন্ত্রস্রষ্টা নয়। পরাশর সংহিতায় (১.২০) বলা হয়েছে-"ন কশ্চিৎ বেদকর্তাস্তি।"কোন মানুষ বেদের রচয়িতা নয়, স্বয়ং ঈশ্বরই এর রচয়িতা। দ্রষ্টা ঋষিরা অমৃতময় বেদকে শিষ্য পরম্পরায় শ্রুতির মাধ্যমে শিখিয়ে দিতেন। এভাবেই শ্রুতি পরম্পরায় বেদ ধরা ছিল বহুদিন। একারণেই এর অন্য নাম শ্রুতি।

শতশত ঋষিদের নিকট থেকে লক্ষাধিক মন্ত্র নিয়ে একসাথে সম্পাদনার মাধ্যমে প্রকাশ করেন শ্রীকৃষ্ণ নামক এক ঋষি। তিনি যমুনা নদীর কূলে এক দ্বীপে জন্মেছেন, তাই তাঁর নামের সাথে এসে যুক্ত হয় দ্বৈপায়ন এবং তিনি বেদকে সম্পাদনা করেছেন তাই তাঁর নামের সাথে একটি উপাধি যুক্ত হয় "বেদব্যাস।" শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস। ঋষি পরাশর এবং জেলে কন্যা সত্যবতীর পুত্র। যিনি পৃথিবীতে ‘ব্যাসদেব’ নামেই প্রাতঃস্মরণীয়।


ব্যাসদেব চিন্তা করলেন অনন্ত এ বেদজ্ঞান একত্রে গ্রহণ করা মানবের পক্ষে দুঃসাধ্য। তাই তিনি বেদবিদ্যাকে চারভাগে বিভক্ত করে তাঁর প্রধান চার শিষ্যকে দান করলেন। পৈলকে দিলেন ঋগ্বেদ। জৈমিনিকে দিলেন সামবেদ। বৈশম্পায়নকে দিলেন যজুর্বেদ এবং পরিশেষে সুমন্তকে দিলে অথর্ববেদ।
ব্যাসদেবের প্রধান এ চার শিষ্য জগতে বেদবিদ্যার প্রচার করেন তাঁদের শিষ্য-প্রশিষ্যের মাধ্যমে। এভাবেই গুরুশিষ্য পরম্পরায় বেদজ্ঞান শত শত শাখায় বিকশিত হয়ে ওঠে এবং জগতে বেদবিদ্যার অমৃতধারাকে দিকে দিকে প্রবাহিত করে তোলে।
বেদ কোন একটি গ্রন্থ নয়, অসংখ্য গ্রন্থের সমষ্টি। এ গ্রন্থের সমষ্টি প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত- মন্ত্র এবং ব্রাহ্মণ। বেদের প্রাচীন কল্পসূত্রকার আপস্তম্ব তাঁর যজ্ঞপরিভাষাসূত্রে (১.৩৪) বলেছেন, "মন্ত্রব্রাহ্মণয়োর্বেদনামধেয়ম্। "
অর্থাৎ মন্ত্র এবং ব্রাহ্মণকে একত্রে বেদ বলে। এ মতকেই সমর্থন করে চতুর্দশ শতাব্দীর বেদভাষ্যকার সায়ণাচার্য তাঁর ঋগ্বেদ ভাষ্যোপক্রমণিকায় বলেছেন-
"মন্ত্রব্রাহ্মণাত্মকঃ শব্দরাশির্বেদঃ।"
মন্ত্র অংশকে সংহিতা বলা হয়। সংহিতা অর্থ সংকলন। অর্থাৎ এখানে বিভিন্ন ঋষিদৃষ্ট মন্ত্রগুলো গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে সাজানো থাকে বলে তাকে সংহিতা বলা হয়। সংহিতা অর্থ সংকলন। অর্থাৎ এখানে বিভিন্ন ঋষিদৃষ্ট মন্ত্রগুলো গুচ্ছ গুচ্ছ আকারে সাজানো থাকে বলে তাকে সংহিতা বলা হয়। ব্রাহ্মণ অংশ দুটি ভাগে বিভক্ত- আরণ্যক এবং উপনিষদ। সুতরাং বেদ বলতে আমরা বুঝি চার প্রকার শাস্ত্রগ্রন্থকে যথা
১. সংহিতা
২. ব্রাহ্মণ
৩.আরণ্যক ও
৪. উপনিষদ
এদের মধ্যে সংহিতা এবং ব্রাহ্মণকে বলা হয় ক্রিয়া বা কর্মকাণ্ড। যেখানে যাগযজ্ঞ বিভিন্ন প্রকার বিধি ব্যবস্থার কথাই প্রধানত আছে। অবশিষ্ট আরণ্যক এবং উপনিষদকে বলা হয় জ্ঞানকাণ্ড; যেখানে বিভিন্ন প্রকার উপাসনা বিধি এবং অধ্যাত্মবিদ্যাই মূখ্য আলোচনার বস্তু। যার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে বেদান্তদর্শন।

শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস সম্পাদিত বেদবিদ্যা:
ঋগ্বেদ
(ঋষি পৈল)
সংহিতা: ১০২৮টি সূক্ত এবং ১০,৬০০ মন্ত্র বা ঋক্
(অষ্টম মণ্ডলের ৮০টি ঋক্ নিয়ে ১১টি সূক্ত আছে তাদের বালখিল্য সূক্ত বলা হয়; এ সূক্তগুলোর গ্রহণ এবং বর্জনের মাধ্যমে ঋগ্বেদ সংহিতায় সূক্ত এবং মন্ত্রে পার্থক্য হয়)
ব্রাহ্মণ: ১. ঐতরেয় ব্রাহ্মণ
২. কৌষীতকি বা শাংখ্যায়ন ব্রাহ্মণ
আরণ্যক: ১. ঐতরেয় আরণ্যক
২. কৌষীতকি আরণ্যক বা শাংখ্যায়ন আরণ্যক
উপনিষদ: ১.ঐতরেয় উপনিষদ
২. কৌষীতকি উপনিষদ

সামবেদ
(ঋষি জৈমিনি)
সংহিতা: ১৮১০ টি মন্ত্র বা সাম।
(এর মধ্যে ৭৫টি ছাড়া সবই ঋগ্বেদের মন্ত্রের পুনরাবৃত্তি। আবার সামবেদ সংহিতায় একইমন্ত্রের পুনরাবৃত্তি আছে, এ পুনরাবৃত্তিগুলির কারণে মন্ত্র সংখ্যায় পার্থক্য হয়।)
ব্রাহ্মণ: ১. পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণ
২. ষড়বিংশ ব্রাহ্মণ
৩. ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণ
৪.জৈমিনীয় ব্রাহ্মণ
৫.সামবিধান ব্রাহ্মণ
৬. দেবতাধ্যায় ব্রাহ্মণ
৭. আর্ষের ব্রাহ্মণ
৮.বংশ ব্রাহ্মণ
আরণ্যক: ১. ছান্দোগ্য আরণ্যক
উপনিষদ: ১. ছান্দোগ্য উপনিষদ
২. কেন উপনিষদ

যজুর্বেদ
কৃষ্ণযজুর্বেদ বা তৈত্তিরীয়
(ঋষি বৈশম্পায়ন)
সংহিতা: ২১৮৪ টি কণ্ডিকা বা মন্ত্র।
ব্রাহ্মণ: ১. তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ
আরণ্যক: ১. তৈত্তিরীয় আরণ্যক
উপনিষদ: ১. কঠ উপনিষদ
২.মৈত্রায়ণী উপনিষদ
৩. তৈত্তিরীয় উপনিষদ
৪.মহানারায়ণ উপনিষদ
৫.শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ
শুক্লযজুর্বেদ বা বাজসনেয়
(ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য)
সংহিতা : ১৯১৫টি কণ্ডিকা বা মন্ত্র
ব্রাহ্মণ: শতপথ বাহ্মণ
আরণ্যক: বৃহদারণ্যক
উপনিষদ: ১. বৃহদারণ্যক উপনিষদ
২. ঈশ উপনিষদ

অথর্ববেদ
(ঋষি সুমন্ত)
সংহিতা: ৫৯৭৭টি মন্ত্র।
ব্রাহ্মণ: গোপথ ব্রাহ্মণ
আরণ্যক: নেই
উপনিষদ: ১. প্রশ্ন উপনিষদ
২. মুণ্ডক উপনিষদ
৩. মাণ্ডুক্য উপনিষদ
বেদের জ্ঞান সবাই ধারণ করতে পারেননা, যদি সে যোগ্য অধিকারী না হয়। যিনি অধিকারী তাঁর কাছে বেদমাতা স্বয়ং প্রকাশিত হন এবং তাকে মহিমান্বিত করেন। অনেকেই বেদকে কোরান বা বাইবেল সহ অন্য ধর্মগ্রন্থের মত একটি গ্রন্থ মনে করেন। কিন্তু বেদের চর্চা না থাকার কারণে তাদের অনেকেই জানেননা যে বেদ নামের গ্রন্থটি অসংখ্য গ্রন্থের সমষ্টি। একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রন্থাগার। মানবজাতির জ্ঞানজগতের চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যকরণ, ছন্দ, যুদ্ধবিদ্যা, স্থাপত্যবিদ্যা, সংগীত, পারিবারিক আইন, রাষ্ট্রীয় সামাজিক আইন, জ্যামিতি, বিভিন্ন বিধিব্যবস্থা, মাঙ্গলিক লোকাচার, আধ্যাত্মিক জ্ঞান, আত্মতত্ত্ব সহ প্রত্যেকটি বিষয়ের উপরে আলাদা আলাদা গ্রন্থ আছে।


আকারে প্রকারে এবং বিষয়বস্তুগত বৈচিত্র্যময়তার কারণে অনেকেই বেদ বুঝতে পারেন না। আবার অনেক গ্রন্থ হওয়ার কারণে কোথা থেকে শুরু করবেন তাও বুঝতে পারেন না। এক বেদ বুঝতে হলে অধিকারী হবে, পূর্বজন্মের সুকৃতি থাকতে হবে। আবার বৈদিক জ্ঞানটি একটি গুরুমুখী পরম্পরাগত জ্ঞান হওয়ায়, ইদানিং বাংলাদেশে সেই পরম্পরার ছেদ হয়ে যাওয়ায় আমরা অনেকেই বেদ পড়েও বুঝতে পারি না। এরপরেও আমাদের বেদের পথে ফিরতে হবে। কারণ, বেদের উপরেও সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত।

বেদের পথে চলার বিষয়টি বেদমন্ত্রেই খুব সুন্দর করে উপমা দিয়ে বলা আছে। সেখানে বলা আছে, যারা
বেদবিদ্যা ছেড়ে পুষ্পফলবিহীন অসার বাক্যের মোহময় পথে অগ্রসর হয়, তারা দুগ্ধহীন কাল্পনিক মায়াময় গাভীর পিছনে ছুটে শুধুমাত্র নিজের জীবনকেই ধ্বংস করেন।
উত ত্বঃ পশ্যন্ন দদর্শ
বাচমুত ত্বঃ শৃণ্বন্ন শৃণোত্যেনাম্।
উতো ত্বস্মৈ তন্বংবি সস্রে
জায়েব পত্য উশতী সুবাসাঃ।।
উত ত্বং সখ্যে স্থিরপীতমাহুর্নৈনং
হিন্বন্ত্যপি বাজিনেষু।
অধেন্বা চরতি মায়য়ৈষ
বাচং শুশ্রুবাঁ অফলামপুষ্পাম্।।
(ঋগ্বেদ সংহিতা: ১০.৭১.৪-৫)
"বেদবিদ্যার জ্ঞান অনেকে দেখেও দেখতে পায় না, শুনেও শুনতে পায় না, একমাত্র যিনি যোগ্য অধিকারী হিসেবে বৈদিক পথে অগ্রসর হয়, সেই যোগ্য অধিকারীর কাছেই বেদবিদ্যা স্বমহিমায় প্রকাশিত হয়; যেমন করে প্রেমপরিপূর্ণা স্ত্রী একমাত্র তার স্বামীর কাছেই নিজদেহ প্রকাশিত করে।
যিনি বেদবিদ্যা লাভ করেন তিনি সমাজে সম্মানিত হন; পক্ষান্তরে যারা বেদবিদ্যা ছেড়ে পুষ্পফলবিহীন অসার বাক্যের মোহময় পথে অগ্রসর হয়, তারা দুগ্ধহীন কাল্পনিক মায়াময় গাভীর পিছনে ছুটে শুধুমাত্র নিজের জীবনকেই ধ্বংস করেন।"

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক,
সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ

গুরুপূর্ণিমার আদর্শই হল, বৈদিক মার্গে ফেরা

গুরুপূর্ণিমার আদর্শই হল, বৈদিক মার্গে ফেরা

আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিকে আমরা ব্যাসপূর্ণিমা ও গুরুপূর্ণিমা নামেই জানি। এ পবিত্র তিথিতেই জন্ম নিয়েছেন অখিল বেদবিদ্যার ধারক, বাহক এবং প্রচারক ভগবানের অবতার শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। তাঁর প্রকৃত নাম শ্রীকৃষ্ণ। তিনি যমুনা নদীর কূলে এক দ্বীপে জন্মেছেন, তাই তাঁর নামের সাথে এসে যুক্ত হয় দ্বৈপায়ন এবং তিনি বেদকে সম্পাদনা করেছেন তাই তাঁর নামের সাথে একটি উপাধি যুক্ত হয় ‘বেদব্যাস’। শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস। ঋষি পরাশর এবং জেলে কন্যা সত্যবতীর পুত্র। যিনি পৃথিবীতে ‘ব্যাসদেব’ নামেই প্রাতঃস্মরণীয়। শ্রীমদ্ভাগবতে তাঁর সম্পর্কে বলা আছে:
ততঃ সপ্তদশো জাতঃ সত্যবত্যাং পরাশরাৎ।
চক্রে বেদতরোঃ শাখা দৃষ্ট্বা পুংসঃ অল্পমেধসঃ।।
(শ্রীমদ্ভাগবত: ০১.০৩.২১)
"এরপর তিনি সপ্তদশ অবতারে সত্যবতীর গর্ভে এবং পরাশর মুনির ঔরসে বেদব্যাসরূপে অবতীর্ণ হন। পৃথিবীর মানুষের মেধাশক্তি দিনদিন ক্ষীণ হয়ে আসছে দেখে অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানবের প্রতি কৃপাপূর্ণ হয়ে তিনি বেদরূপ বৃক্ষের শাখা বিভাজন করেন (তাই তাঁর নামের সাথে অনন্তকালের জন্যে একটি উপাধি যুক্ত হয় বেদব্যাস)।"

ব্যাসদেব চিন্তা করলেন অনন্ত এ বেদবিদ্যা একত্রে গ্রহণ করা মানবের পক্ষে দুঃসাধ্য। তাই তিনি বেদবিদ্যাকে চারভাগে বিভক্ত করে তাঁর প্রধান চার শিষ্যকে দান করলেন। পৈলকে দিলেন ঋগ্বেদ, জৈমিনিকে দিলেন সামবেদ, বৈশম্পায়নকে দিলেন যজুর্বেদ এবং পরিশেষে সুমন্তকে দিলেন অথর্ববেদ। ব্যাসদেবের প্রধান এ চার শিষ্য জগতে বেদবিদ্যার প্রচার করেন তাঁদের শিষ্য-প্রশিষ্যের মাধ্যমে। এভাবেই গুরুশিষ্য পরম্পরায় বেদজ্ঞান শত-সহস্র শাখায় বিকশিত হয়ে জগতে বেদবিদ্যার অমৃতধারাকে দিকে দিকে প্রবাহিত করে তোলে। বেদ কোন একটি গ্রন্থ নয়, অসংখ্য গ্রন্থের সমষ্টি।

এরপরেই ব্যাসদেবের অনন্য কীর্তি বৃহত্তর ভারতবর্ষের ইতিহাসের মহাগ্রন্থ মহাভারত রচনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে গ্রন্থকে বলেছেন– ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস।একলক্ষ শ্লোকের এ মহাভারতের ভীষ্মপর্বের আঠারোটি অধ্যায় নিয়েই রচিত হয়েছে ‘শ্রীমদ্ভগবদগীতা’। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক গ্রন্থ, যাকে বেদান্ত দর্শনের স্মৃতিপ্রস্থান বলা হয়।
আঠারোটি পুরাণ এবং আঠারোটি উপ-পুরাণের সকলই ব্যাসদেবের রচনা বলে প্রচলিত। যদিও পুরাণগুলোর মধ্যে অনেক পরস্পর বিরোধী, অবাস্তব, কাল্পনিক, বালখিল্য জাতীয় কথা আছে; এ সত্যেও পুরাণগুলোর মধ্যে অনেক মণি-মুক্তা খচিত অমৃতময় কথাও বিদ্যমান। তাই আমাদের এ পুরাণগুলোকে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমেই গ্রহণ করতে হবে।

ব্যাসদেবের আরেকটি সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি সম্পূর্ণ বৈদিক সিদ্ধান্তগুলোকে মাত্র ৫৫৫ টা সূত্রে প্রকাশিত করা; যার নাম ব্রহ্মসূত্র। এ ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যের মাধ্যমেই ভারতবর্ষের সকল মত-পথের উৎপত্তি। শ্রীশঙ্করাচার্য থেকে আমাদের যত আচার্যবৃন্দ আছেন তাঁরা সকলেই এ ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য লিখে আপন আপন সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেছেন। এ কারনেই ব্যাসদেব গুরু পরম্পরায় সবার গুরু এবং তাই তাঁর জন্মতিথিকে গুরুপূর্ণিমা বলা হয়। এদিনে নিয়ম ব্যাসদেবের অর্চনার সাথে সাথে যার যার গুরুকেও সম্মান জানানো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যে আমরা যার যার গুরু নিয়েই ব্যতিব্যস্ত ; এ তিথিতে যে ব্যাসদেবের জন্ম হয়েছিল এবং এই কারণেই যে এ তিথিটি এত মাহাত্ম্যপূর্ণ তা আমরা অনেকেই হয়ত জানিনা। বা আমাদের গুরুরা হয়তো অনেকে শিষ্যদের জানতেও দেন না তিথিটির মাহাত্ম্য; পাছে তাদের ভাগে কম পরে যায়!

গুরুপূর্ণিমায় আধ্যাত্মিক গুরুদের সাথে সাথে আমাদের সকলেরই স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগুরুদেরও যথাযথ সম্মানিত করা বা শ্রদ্ধার্ঘ্য দেয়া প্রয়োজন। আমাদের বিদ্যা দুইপ্রকার -পরাবিদ্যা এবং অপরাবিদ্যা। পরাবিদ্যা হল অধ্যাত্মবিদ্যা বা ব্রহ্মবিদ্যা, যার গুরু ব্যাসদেব। কিন্তু অপরাবিদ্যা যা আমাদের স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা পড়াশোনা করে লব্ধ জ্ঞানে জীবন নির্বাহ করছি; সেই জাগতিক অপরাবিদ্যার যারা শিক্ষক তারাও গুরু, জাগতিক বিদ্যার গুরু। তাই তাদেরকেও এ দিনে যথাসাধ্য সম্মানিত করতে হয়। দক্ষিণ ভারত সহ বিভিন্ন স্থানে শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং সংগীতের শিক্ষাগুরুকে এদিনে তাদের ছাত্রদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধার সাথে সম্মানিত করতে দেখা যায়। নেপালে এ দিনটি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়। গুরুপূর্ণিমা আসলে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এই ভূখণ্ডের শিক্ষক দিবস।

অতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে এসেছে এ গুরুপূর্ণিমা স্মরণের রীতি। তাইতো গৌতমবুদ্ধ এ দিনেই সারনাথের ঋষিপত্তন মৃগদাবে তাঁর পঞ্চবর্গীয় শিষ্য কৌন্ডন্য, বপ্প,ভদ্দীয়, মহানাম ও অসসজিতের কাছে তাঁর নবমত প্রচার করেন এবং ধর্ম রক্ষার্থে 'ধর্মচক্র' প্রবর্ত্তন করে ব্যাসদেবের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। বৌদ্ধদের মত জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এ দিনটি অত্যন্ত পবিত্র ও মাহাত্ম্যপূর্ণ ।

শিখেরা যেমন তাদের দশম গুরু গোবিন্দ সিংহের পরে তাদের ধর্মগ্রন্থ গুরুগ্রন্থ সাহেবকেই অনন্তকালের জন্যে গুরুরূপে বরণ করে নিয়েছেন। ঠিক একইভাবে ভারতবর্ষের বহু আর্য হিন্দু, হিন্দুজাতির স্বাভিমানের প্রতীক বৈদিক গৈরিক ধ্বজাকে গুরুরূপে এবং সন্মার্গদর্শনকারী রূপে বরণ করে আজ গৈরিকধ্বজার গুরুরূপে বিশেষ পূজা করেন এক একতাবদ্ধ হিন্দু জাতির আকাঙ্ক্ষায়।এ দিনে দান করা অবশ্যকরণীয় কর্তব্য।
গুরুপূর্ণিমার পবিত্র দিন থেকেই সাধুসন্ত সহ সকলের জন্যে সাধনভজনের পথে আধ্যাত্মিক উন্নতিকল্পে বাৎসরিক অবশ্য পালনীয় চাতুর্মাস্য ব্রতানুষ্ঠান শুরু হয়।
প্রকৃত সৎগুরুর বিরোধী আমরা কেউ না। আমরা জানি মুক্তিলাভের জন্য সদগুরুর অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা আছে; কিন্তু তা বাধ্যতামূলক না। আপনার যদি ইচ্ছে হয় তবে আপনি একটি কেন দশটি গুরুরও শরণ নিতে পারেন। তাতে আমাদের কোন বাধা নেই। কিন্তু আপনি বলতে পারবেন না যে গুরু ছাড়া মুক্তিলাভ অসম্ভব। এ কথাটার প্রতিই আমাদের ঘোরতর আপত্তি আছে । অর্থাৎ আপনার ইচ্ছে হলে আপনি যেমন মানুষ গুরুর শরণ নিতে পারেন, আবার তেমনি কেউ যদি পাতঞ্জলদর্শন অনুসারে পরমেশ্বরকে এবং বেদাদি শাস্ত্রগ্রন্থকে গুরুরূপে মনে করে শিখদের ন্যায়, তবে তাকেও আপনি অস্বীকার করতে পারেন না।মহর্ষি পতঞ্জলি যোগসূত্রের সমাধিপাদে জগতের সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকেই গুরু বলেছেন-
তত্র নিরতিশয়ং সর্বজ্ঞবীজম্।
স পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেন অনবচ্ছেদাৎ।
তস্য বাচকঃ প্রণবঃ।
(যোগসূত্র : ১.২৫-২৭)
"ঈশ্বরই নিরতিশয়ত্ব প্রাপ্ত সর্বজ্ঞবীজ।তিনি কালের দ্বারা অবিচ্ছিন্ন পূর্ব পূর্ববর্তী অনাদিকাল থেকেই গুরু। প্রণব বা ওঁকারই তাঁর বাচক।"
যোগদর্শনের মত বেদাদি শাস্ত্রের বহুস্থানেই ভগবানকে গুরু বা জগদগুরু বলা হয়েছে, কারণ সকল জ্ঞানের উৎস তিনি। জীবকে সৃষ্টি করেছেন তিনি, সকল জ্ঞানের উৎসও তিনি, তাই তাকে জগদগুরু বলা হয়। শ্রীমদ্ভাগবত সহ বিভিন্ন পুরাণ এবং দর্শনে ভগবানকে বারবার গুরু বা জগদগুরু বলে অবিহিত হতে আমরা দেখি।কিন্তু ইদানিং বিভিন্ন গুরুদের নামের সাথে জগদগুরু শব্দটি দেখা যায়। যা ঠিক নয়। যেহেতু শাস্ত্রে ভগবানকে জগদগুরু বলে অবিহিত করা হয়েছে, তাই অন্যের ক্ষেত্রে শব্দটি প্রয়োগ করা সমীচীন নয়। শ্রীশঙ্করাচার্য তাঁর রচিত কৃষ্ণাষ্টক নামক ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে সমর্পিত স্তোত্রটি শুরুই করেছেন বেদের একমাত্র প্রতিপাদ্য, বুদ্ধির সাক্ষীরূপ সর্বান্তর্যামী, অসুর বিনাশক চরাচর সকলের গুরুরূপ পরমেশ্বরকে স্মরণ করে।

শ্রিয়াশ্লিষ্টো বিষ্ণুঃ স্থিরচরগুরুর্বেদবিষয়ো
ধিয়াং সাক্ষী শুদ্ধো হরিরসুরহন্তাব্জনয়নঃ ।
গদী শঙ্খী চক্রী বিমলবনমালী স্থিররুচিঃ
শরণ্যো লোকেশো মম ভবতু কৃষ্ণোঽক্ষিবিষয়ঃ॥
" শক্তি স্বরূপা শ্রীকে আলিঙ্গিত করে অভেদমূর্তিতে আছেন যে বিষ্ণু, যিনি চরাচর সকলের গুরু, বেদের যিনিই একমাত্র প্রতিপাদ্য বিষয়, যিনি বুদ্ধির সাক্ষীরূপ সর্বান্তর্যামী, যিনি অসুর বিনাশক, পদ্মকমলের ন্যার রক্তিম যাঁর নয়ন। যিনি শঙ্খ,চক্র ও গদা ও বিমল বনমালা ধারণকারী। যাঁর দেহের উজ্জল দীপ্তি সর্বদা বিরাজমান।যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র শরণ্য ঈশ্বর, সেই কৃষ্ণচন্দ্র দয়া করে আমার নয়নগোচর হোন।"

গুরু যদি শ্রীবাল্মিকী, শ্রীবেদব্যাস, শ্রীশঙ্করাচার্য, শ্রীরামানুজাচার্য, শ্রীনিম্বার্কাচার্য, আচার্য শ্রীরামানন্দ, আচার্য শ্রীরবিদাস, শ্রীমাধবাচার্য, শ্রীচৈত্যন্যদেব, সমর্থ শ্রীরামদাস, শ্রীশঙ্করদেব, শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী, শ্রীনিগমানন্দ এঁদের মতো জাজ্বল্যমান সদগুরু হয়, তবে তাদের শ্রীচরণে আশ্রয় নিতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু গুরু নামধারীরা, গুরু লেবাসধারীরা যদি রজনীশ, আসারাম, রামরহিম, রাধে মা, নির্মলা মায়ের মতো আত্মপ্রচারকামী, ভণ্ড, লোভী, দুশ্চরিত্র, পাষণ্ড হয়; তাহলে একবার হলেও আপনি চিন্তা করুন তো, তাদের চরণে আশ্রয় নিলে আপনার কি গতি হবে? একটা বৃক্ষে পূর্বে শ্রীফল দিত, কিন্তু বর্তমানে সেই বৃক্ষই দিচ্ছে বিষফল। আপনি কতদিন বা কতকাল এই গাছকে বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন? বিষে জর্জরিত হয়ে আপনারই বা কি গতি হবে ভাবতে পারেন একবার?

আজকে গুরু একটা ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায় মত এখানেও লাভ লোকসানের আছে। ব্যবসায় প্রোডাক্টের মার্কেটিং এর জন্যে যেমন লোক নিয়োগ করা হয়; এখানেও তাই চলছে। গুরুরা বিভিন্ন এজেন্ট নিয়োগ করে, তারা আবার গুরুদের আয়ের কমিশন পায়। এই ভণ্ড গুরুরা বেদবেদান্তের প্রচার বাদ দিয়ে নিজের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচার নিয়েই অষ্টপ্রহর ব্যস্ত।সেজেগুজে রোডশোসহ ক্ষমতা প্রদর্শনের হেন পন্থা নেই, যা তারা তা ব্যবহার করে না। এ কারণেই অনেকে মজা করে বলে-
"সকল ব্যবসা বন্ধ হল,
খোলা রইলো গুরুর দ্বার,
গুরুর ব্যবসা চলে ভাল,
যদি থাকে ভাল ক্যানভাসার।"
সকল সাধুই সাধু না। সকল গুরুই গুরু না।সাধুত্ব এবং পাণ্ডিত্য সবার থাকে না; কিন্তু এরপরেও গেরুয়া বস্ত্র সর্বদা প্রণম্য। যে গুরু ঈশ্বরের বাণী বাদ দিয়ে শিষ্যদের শুধু নিজের প্রচার করতে বলবে; তাকেই দান করতে বলবে; মরে গেলে তার উত্তরপুরুষ বংশধরদের দান করতে বলবে; মন্দিরে দেবতার বিগ্রহাদি বাদ দিয়ে নিজের ছবি পূজা করতে বলবে; গ্রাফিক্স ডিজাইন করে, নিজের পদ্মের উপরে বসা ছবি পেছনে সূর্যের আলো - এই টাইপের আত্মপ্রচারকামী অশাস্ত্রীয় ছবি শিষ্যদের দিয়ে প্রচার করাবে; শিষ্যদের বেদবেদান্তের জ্ঞানের পথে যেতে বাধা দিবে; ব্যক্তিস্বার্থে শাস্ত্রহীন অশাস্ত্রীয় নির্দেশনা দিবে; সাধারণ মানুষ থেকে দূরত্বে থেকে রাজার মত বিলাসবহুল জীবনযাপন করবে; হিন্দুদের আপদে বিপদে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে; অকারণ সর্বধর্ম সমন্বয়ের নামে সাধারণ হিন্দুদের বিভ্রান্ত করবে; কোন স্টেজে অথবা রাজপথে অন্ধ শিষ্যদের দিয়ে শোডাউন করে ক্ষমতার প্রদর্শন করবে; এ সকল কাজ যে যে গুরুনামধারী ব্যক্তিরা করবে, বুঝতে হবে তিনি সদগুরু নন, তিনি আত্মপ্রচারকামী ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরু ব্যবসায়ী। একজন সদগুরু কখনই নিন্দনীয় এ সকল কাজ মরে গেলেও করবে না এবং তার শিষ্যদেরও করতে দিবে না।
ভাবতে অবাক লাগে গুরু যদি ঈশ্বরের পথদ্রষ্টা হয় তবে গুরুই কেন ঈশ্বর সেজে বসে যান পূজার আসনে? ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে আমরা পরবর্তীতে তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পরি। আর এই সকল ভণ্ড গুরুরা শিষ্যদের পকেট মারতেই সদা ব্যস্তসমস্ত হয়ে পরেন। নিজের সাথেসাথে তার বউপোলাপান-নাতিপুতির সহ ভবিষ্যতের বংশধরদের জন্যে অন্নসংস্থানের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা করে যান।
শ্রীগোবিন্দাচার্যের মতো গুরু হলে আপনি শ্রীশঙ্করাচার্যের মতো শিষ্য পাবেন। সমর্থ শ্রীরামদাসের মতো গুরু পেলে আপনি ছত্রপতি শিবাজীর মতো রাজা পাবেন। শ্রীরামকৃষ্ণের মতো গুরু পেলে আপনি স্বামী বিবেকানন্দের মত বিশ্বদরবারে ভারতবর্ষ এবং সনাতন ধর্মের মুখ উজ্জ্বল করা বিশ্বজয়ী শিষ্য পাবেন। কিন্তু এই গুরু নামধারী ভণ্ডদের থেকে কি পাবেন আপনি?
আমাদের জন্ম হয়েছে বেদ বেদান্তের মূল রাজপথে ফেরার জন্যে। আমাদের সমস্যা হলে, আমরা সমাধান খুঁজব বেদাদি শাস্ত্রগ্রন্থের কাছে। কোন মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য বা বর্তমানকালের কোন বাবা-গুরুদের লেখা বাণীর সংকলন, চিঠির সংকলন, গানের বই, ছড়ার বই থেকে নয়।কারণ জগতে বেদবেদান্তই একমাত্র প্রমাণ।
বর্তমানে যেভাবে আমরা রাস্তা থেকে লোক ধরে ধরে এনে গুরু নামে মানুষ পূজা শুরু করে দিচ্ছি, এটা খুবই দুঃখজনক এবং যুগপৎ অশাস্ত্রীয়। গুরুর কাজ হলো বৈদিক সন্মার্গ দেখিয়ে মানুষকে মুক্তির পথে অগ্রসর করা। কিন্তু বর্তমানে অনেক ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরুরাই বেদ-বেদান্ত বাদ দিয়ে শিষ্যদের শুধুমাত্র নিজেদের এবং নিজের ছেলেমেয়ে বংশধরদের পূজা করাতেই ব্যস্ত।
এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরুদের প্রধান লক্ষ্যই থাকে ধনী শিষ্যদের পকেটের দিকে। এই সকল গুরু নামধারী ধান্ধাবাজ ভাইরাসদের কারণেই অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা ধর্মের উপরে বিরক্ত হয়ে ধর্মান্তরিতের পথে পা বাড়াচ্ছে এবং এই ভণ্ডদের বিভিন্ন ছলাকলা যুক্ত ভণ্ডামির কারণে অনেক মানুষই প্রকৃত গুরুদের ভুল বুঝে অবজ্ঞা করছে।
সকলের কাছে আমার আহ্বান, ব্যাসদেব প্রচারিত এবং প্রদর্শিত পথে, পরমেশ্বরের নামে আমরা যে কুসংস্কার মুক্তভাবে বৈদিকরাজপথে ফিরতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, এই ঐক্যের বন্ধন যেন আমাদের দিনেদিনে আরো দৃঢ় হয়। কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনাতো থাকবেই। এর মাধ্যমেই আমাদের সমাধানের পথের দিকে এগোতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সম্পদ শিক্ষিত একঝাক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া তরুণ সম্প্রদায়।আমাদের আশা এ তরুণেরাই আগামীতে জাতিকে সত্যিকার অর্থে কুসংস্কার মুক্ত মঙ্গলময় পথ দেখাবে।
বেদাদি শাস্ত্রানুসারে জাতপাত নির্বিশেষে সকলেই গুরু হতে পারে; শুধুমাত্র গুরুকে যোগ্য অধিকারী, নিষ্কাম এবং আত্মপ্রচার বিমুখ ব্রহ্মময় হতে হবে। এ প্রসঙ্গে শ্রীচৈতন্যদেবের একটি অত্যন্ত সুন্দর স্পষ্ট নির্দেশ আছে, তিনি ব্রাহ্মণ-শূদ্র নির্বেশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকেই গুরু হবার, আচার্য্য হবার, তত্ত্ববেত্তা হবার অধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
কিবা বিপ্র কিবা ন্যাসী শূদ্র কেনে নয়।
যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা সেই গুরু হয়।।
(চৈতন্যচরিতামৃত : মধ্য, অষ্টম পরিচ্ছেদ)
বর্তমানে আমাদের প্রচণ্ড ছদ্মবেশী মানসিকতা দেখা যায়, আমরা যখন নিজের জীবন নিয়ে লিখি, তখন জীবনের সকল ঘটনাগুলোকে ধুয়েমুছে কালিমাকে গোপন করে লিখি। কিন্তু ব্যাসদেবের জীবনে দেখা যায় উল্টোটি, তিনি সর্বদা সত্যে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর লেখায় নিজের জীবন নিয়ে সকল বিষয়ে ছিল তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি। বাবা পরাশর এবং মা জেলেকন্যা সত্যবতীর হঠাৎ মিলনে কিভাবে তাঁর জন্ম হয়েছে, তা তিনি না লিখলেও পারতেন। বংশরক্ষায় মায়ের আদেশে কুরুবংশের ক্ষেত্রজ পুত্র পাণ্ডু, ধৃতরাষ্ট্র এবং বিদুরের কিভাবে জন্ম হয়েছে, তাও না লিখলেও পারতেন।

তিনি কি জানতেন না একথাগুলি আগামীতে তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, তবুও সত্যরক্ষার্থে তিনি লিখেছেন। অথচ বর্তমানে আমরা যখন ডাইরি সহ নিজের জীবন নিয়ে লিখি, তখন অধিকাংশই সাজানো-গোছানো মিথ্যা কথা লিখি। প্রাচীন রাজবংশগুলিতে নিয়ম ছিল, যদি কোন কারণে বংশের প্রদীপ নিভে যায়, তবে সকলের পরামর্শে এবং সম্মতিতে কোন জ্ঞানী পণ্ডিত ব্যক্তিকে দিয়ে সন্তান উৎপাদন করতে পারবে। যিনি ক্ষেত্রজ হয়ে আসবেন, তাঁর যৌনতা উপভোগের কোন বিষয় ছিল না। তাকে সারা শরীরে ঘি মেখে দেহকে তৈলাক্ত করে নিতে হত। রাজপরিবারের পুরুষরা মারা গেলে বা নপুংসক হলে তবেই ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের রীতি ছিল।

রাজমহিষীদের গর্ভে ক্ষেত্রজ সন্তান যার থেকেই উৎপন্ন হোক না কেন সন্তান সেই রাজবংশের হোত। বর্তমানে যেমন ভাবে, আমরা নিজেরা যদি জমি চাষ করতে অপারগ হই, তবে ধানের জমিতে অন্যকে দিয়ে বর্গাচাষ করাই। বর্গাচাষি সকল শ্রম দিয়ে ধান উৎপাদন করলেও ধানের মালিক হয় জমির মালিক; বর্গাচাষি নয়, তিনি শুধু ভাগ পান। ক্ষেত্রজ বিষয়টি নিয়ে অনেকেই আমরা না বুঝেই কটুক্তি করি, কিন্তু একবার নিগূঢ়ভাবে ভেবে দেখলে দেখতে পাব চন্দ্রবংশের মত সুপ্রাচীণ বংশ যখন সন্তান না থাকার কারণে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন রাজমাতা সত্যবতীর চন্দ্রবংশের সন্তানধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে এটা ছাড়া আর কোন পথই তাঁর সামনে খোলা ছিল?

হিন্দুদের সাকার নিরাকার সকল মতপথের পক্ষেই লিখেছেন ব্যাসদেব। তাঁকে বা তাঁর চিন্তাকে খণ্ডিত করা যায় না। তখনও তাঁকে মনে হয় নিরাকার ব্রহ্মবাদী, কখনও বৈষ্ণব, কখনও শাক্ত, কখনও শৈব।অর্থাৎ তিনি সকল মতপথের সমন্বয়ের প্রতীক।পরবর্তীকালে এ সমন্বয় দেখা যায় শ্রীশঙ্করাচার্যের মধ্যে। তাই ব্যাসদেব শ্রীশঙ্করাচার্যের চিন্তাকে সংকীর্ণ করা যায় না। ব্যাসদেব যে পুরাণ লিখেছেন, সেই পুরাণের কেন্দ্রীয় উপাস্যকেই পরমেশ্বররূপে স্তোত্র করেছেন। যে কোনভাবে এবং যেকোন রূপেই যে তাঁকে পাওয়া যায় এ ব্রহ্মতত্ত্বটি বোঝাতে।

আজ আমরা অনেক সময় ব্যক্তিকে তাঁর সৌন্দর্য দিয়ে মূল্যায়ন করতে চাই, কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনন্য অদ্বিতীয় মেধাজগতের কাজ করা ব্যাসদেবের গায়ের বর্ণ ছিল কুচকুচে কাল। প্রচলিত অর্থে খুব একটা সুদর্শন ছিলেন না, কিন্তু এরপরেও তিনি তাঁর মেধা যোগ্যতাবলে সকল বিদ্যার আদিগুরু বলে আজও বিশ্বব্যাপী সম্মানিত পূজনীয়। রূপ নয়, কর্ম এবং যোগ্যতা যে মানুষকে মহান করে, এ আধুনিক মানবিক কথাগুলি আমরা তাঁর জীবনেই দেখি; যা আমাদের জন্যে শিক্ষনীয়।
কুরুবংশের ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনে অম্বিকা এবং অম্বালিকা তাঁর কাছে যখন আসে তখন তাঁর চেহারা দেখে অম্বিকা সারাক্ষণ চোখ বন্ধ করে ছিলেন এবং অম্বালিকা ভয়ে ফ্যাকাসে বা পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। কথাগুলো ব্যাসদেব নিজের সম্পর্কে নিজেই লিখেছেন। ভাবা যায়, নিজের লেখাতে নিজেকে নিয়েই কতটা সরল নিষ্কপট স্বীকারোক্তি। এরকম অসংখ্য কারণেই তিনি পূজনীয়, বরণীয় এবং মহান।
পরিশেষে গুরুপূর্ণিমার আদর্শে উদ্ভাসিত, উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা যেন ব্যাসদেব প্রচারিত বৈদিক আদর্শে উদীপ্ত হয়ে সর্বদা বৈদিক সন্মার্গী হতে পারি ; এ কামনায় সবাইকেই গুরুপূর্ণিমার শুভেচ্ছা।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক,সংস্কৃত বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ

দারুব্রহ্ম জগন্নাথদেব: পঞ্চমতের একত্বের প্রতীক।

জগন্নাথদেব, পুরীর রহস্য, জগন্নাথ মন্দির, রথযাত্রা, জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘর, jaganathdev, puri


জগন্নাথ অর্থাৎ জগতের নাথ। পরমেশ্বর ভগবানের করুণাঘন এক অপূর্ব রূপ। জগন্নাথধাম হিন্দুজাতির চার ধামের এক ধাম। দেবীর ৫১ পীঠের এক পীঠ। জগন্নাথদেবের বিগ্রহ দৃশ্যত অসম্পূর্ণ,কিন্তু তাঁর দৃশ্যমান হস্ত,পদ না থাকা সত্ত্বেও তিনি হস্ত-পদময়। কারণ , এ জগতে এবং সকল জীবের মাঝেই তাঁর প্রকাশ। আবার তিনি এ জগতের পারে, সকল ইন্দ্রিয়ের পারে, ইন্দ্রিয়, বাক্য, মনের অগোচর হয়ে সদা বিরাজিত হয়ে আছেন ।

সারা ভারতবর্ষে যতো প্রাচীন মন্দির আছে তার প্রত্যেকটি মন্দিরে বিগ্রহেরই কিছু স্বতন্ত্রতা আছে। তেমনি স্বতন্ত্রতা জগন্নাথ বিগ্রহের। অপরূপ করূণাঘন চখা-চখা চোখে তাকিয়ে আছেন ভগবান ভক্তের পানে। স্কন্ধপুরাণের উৎকল খণ্ডে জগন্নাথদেবের এ রূপের কারণ দেয়া আছে খুব সুন্দর করে, সেই মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন, রাণী গুণ্ডিচা এবং বৃদ্ধ কারিগরের এ ঘটনাটা আমরা সকলেই মোটামুটি জানি। তাই সেদিকে আর আমি যাচ্ছি না।

জগন্নাথদেব সনাতন হিন্দুর শাক্ত, শৈব,গাণপত্য, সৌর এবং বৈষ্ণব এ পঞ্চ মতেরই একত্বের প্রতীক। বলদেব শিবের, শুভদ্রা শক্তির, জগন্নাথ বিষ্ণু, আর সুদর্শন সূর্যের প্রতীক বলে উপাসনা করা হয়। পঞ্চমতের মধ্যে বাকি রইল একটি গাণপত্য। তাই স্নানযাত্রার দিনে জগন্নাথদেবকে গণেশরূপে উপাসনা করা হয়। আবার জগন্নাথদেবের যেহেতু দৃশ্যমান হস্ত-পদ নেই, তাই তিনি হস্ত-পদের পারে ব্রহ্মস্বরূপ। এবং তাঁর বিগ্রহকে বলা হয় দারুব্রহ্ম।তান্ত্রিকমতে জগন্নাথকে শক্তিপীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বিমলার ভৈরব হিসেবে পূজা করা হয়। বৈদিক, তান্ত্রিক সকল মতেই জগন্নাথদেবকে পূজা করা হয়।

জগন্নাথদেবের মন্দির শুধুমাত্র হিন্দুদের সকল মত-পথের একতার প্রতীকই নয় ; হিন্দু জাতির একতা গঠনে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। জগন্নাথদেবের গর্ভগৃহে সকল হিন্দুদের সহ ভারতে উৎপন্ন বৌদ্ধ, জৈন,শিখসহ সকল ধর্মাবলম্বীদেরই প্রবেশের অধিকার । (শুধুমাত্র সেমেটিক ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশাধিকার নেই, কারণ তারা সুযোগের অসৎ ব্যবহার করে প্রচুর অসভ্যতা করেছে বিভিন্ন সময়।) জগন্নাথদেবের প্রসাদ ব্রাহ্মণ-শূদ্র (কথিত) নিবির্শেষে সকলে এক সাথে, এক পাতে বসে গ্রহণ করে।যেখানে জগন্নাথদেবের প্রসাদ পাওয়া যায়, সেই স্থানের নাম আনন্দবাজার। অপূর্ব নামকরণ! এ যেন একতার আনন্দবাজার। এ যেন জাত-পাতের রাজনীতিকে একপাশ রেখে হিন্দুত্বের মিলনের আনন্দবাজার।

জগন্নাথদেবের পূজা হয় দ্বৈতভাবে, ব্রাহ্মণ পাণ্ডাদের রীতিতে এবং শূদ্র শবরদের রীতিতে। সকলেই সমান সমান অংশগ্রহণকারী জগন্নাথদেবের উপাসনায়। জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার পরের ১৫ দিনকে বলা হয় অনসর-পিড়ি ; এ সময়ে শবর বিশ্বাবসুর বংশধর শূদ্র দয়িতাপতিরাই জগন্নাথদেবকে পূজা করেন।

সাধারণত দেবতা থাকে মন্দিরে আর ভক্তরা এসে বিগ্রহকে প্রণাম করে, উপাসনা করে। কিন্তু জগন্নাথদেব এর ব্যতিক্রম, তিঁনি সাধারণজনের মাঝে সাধারণজন হয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন। তিঁনি তো রাজাধিরাজ তিঁনিই যখন নেমে এসেছেন রাজপথে, তখন দেশের রাজার তো সাধ্য নেই রাজসিংহাসনে বসে থাকার। তিনিও চলে এসেছেন রাজপথে সাধারনজনের কাছে। হাতে ঝাড়ু নিয়ে হয়েছেন জগন্নাথদেবের পথের ঝাড়ুদার।

পুরীর গজপতি রাজা স্বয়ং শোভাযাত্রা সহকারে জগন্নাথদেবের রথের চলার পথকে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করার পরেই তিনটি রথ চলতে শুরু করে। এ প্রথা রাজা অনঙ্গভীমদেবের সময় ( ১১৭৫-১২০২ খ্রিস্টাব্দ) থেকেই চলে আসছে। রাজা- প্রজা সকলেই আজ একাকার, সবারই পরিচয় তারা জগন্নাথদেবের সেবক ; অপূর্ব সাম্যবাদের শিক্ষা দেয়ার জন্যেই এ প্রথার আয়োজন।

বর্তমানে আমাদের যৌথ পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙে যাচ্ছে, পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে অশান্তি ঝগড়াঝাটি চলে আসছে, ভাইবোনের মধ্যে স্বার্থের বিরোধে কোর্টকাছারি পর্যন্ত যেতে হচ্ছে। কিন্তু একবার আমরা ভেবে দেখেছি কি, পুরীর জগন্নাথ মন্দির ভাইবোনের সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জগন্নাথদেব শ্রীকৃষ্ণ, বড়ভাই বলরাম এবং আদরের ছোটবোন সুভদ্রা এ তিনভাইবোনকে একসাথে বসিয়ে সেখানে পূজা করা হচ্ছে।

আরেকটি বিষয় খুবই লক্ষ্যনীয়, রথযাত্রার সময়ে আগে বড়ভাই বলরামের রথ যায়, এরপরে ছোটবোন সুভদ্রার রথ এবং পরিশেষে যায় জগন্নাথদেবের রথ। আমাদের সংস্কৃতি অনুসারে জ্যেষ্ঠভাইকে আগে যেতে দিতে হয়। জ্যেষ্ঠকে অগ্রগামী করে,আদরের ছোটবোনের যাত্রা নির্বিঘ্ন করে, তবেই অবশেষে জগন্নাথদেবের রথ রাজপথে অগ্রসর হয়।

৪৫ ফুট উচ্চতার জগন্নাথদেবের রথের নাম নন্দীঘোষ, এর আরও কয়েকটি নাম আছে গরুড়ধ্বজ, চক্রধ্বজ এবং কপিধ্বজ। একইভাবে ৪৪ ফুট উচ্চতার বলভদ্রের রথের নাম তালধ্বজ এবং ৪৩ ফুট উচ্চতার সুভদ্রাদেবীর রথের নাম দর্পদলন।
শ্রীশঙ্করাচার্য, শ্রীরামানুজাচার্য,শ্রীচৈতন্যদেব তুলসীদাস সহ আমাদের প্রায় সকল আচার্যবৃন্দেরই উপাসনার, সাধনার স্থান ছিলো জগন্নাথ ধাম। তাই আমাদের প্রায় সকল আচার্যবৃন্দই শ্রীক্ষেত্র/পুরুষোত্তম ক্ষেত্র /শঙ্খক্ষেত্র /নীলাচল ক্ষেত্র /মুক্তিক্ষেত্র ইত্যাদি বিভিন্ন নামে অভিহিত জগন্নাথধামের মাহাত্ম্যকথা প্রচার করেছেন এবং জগন্নাথদেবের মাহাত্ম্যযুক্ত স্তোত্র রচনা করেছেন।
মধ্যযুগে উত্তর ভারতে ভক্তি আন্দোলনের যিনি পুরোধাপুরুষ শ্রীরামচরিতমানসের রচয়িতা তুলসীদাস গোস্বামীও পুরিতে এসে জগন্নাথদেবকে রঘুপতি রামরূপে উপাসনা করেছিলেন।
কালান্তরে জগন্নাথ ধামে কালযবনের অত্যাচারকালে মন্দিরের সেবায়েত পাণ্ডাগণ জগন্নাথ বিগ্রহের উদর প্রদেশ স্থিত রত্নপেটিকা চিল্কা হ্রদের তীরে ভূগর্ভে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় কালক্রমে উক্ত স্থানের লোকেরা ভুলে যান রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে। শ্রীশঙ্করাচার্য যোগবলে জগন্নাথের রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে নির্ধারণ করে দেন এবং জগন্নাথকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।
বদরিকাশ্রমে নারায়ণ বিগ্রহও তিনি অনুরূপভাবে প্রকাশিত করেন।উল্লেখ্য যে, আচার্যের জীবনের একটি প্রধান কীর্তিই হল শ্রেষ্ঠ পবিত্র মন্দিরগুলোতে ভগবদ্বিগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যখন আচার্য শ্রীশঙ্কর যোগবলে জগন্নাথের রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে নির্ধারণ করে দেন তখন ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি জগন্নাথদেবের উদ্দেশ্যে অসাধারণ একটা সংস্কৃত স্তোত্র তৈরি করেন। এ স্তোত্রটি আজও প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হয় এবং জগন্নাথদেবকে নিয়ে স্তোত্রের মধ্যে এ স্তোত্রটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়। শ্রীশঙ্করাচার্যের ভাষায়:
মহাম্ভোধেস্তীরে কনকরুচিরে নীলশিখরে,
বসন্ প্রাসাদান্তে সহযবলভদ্রেণ বলিনা।
সুভদ্রামধ্যস্থঃ সকলসুরসেবাবসরদো,
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।।
"যিনি মহাসমুদ্রের তীরে স্বর্ণময় নীলশিখর-প্রাসাদে মহাবলশালী বড়ভাই বলরাম এবং ভগ্নী সুভদ্রাদেবীকে নিয়ে অবস্থান করে, সকল দেবতাদেরই সেবা করার সুযোগ প্রদান করছেন; সেই জগন্নাথদেব তুমি আমার নয়নপথে আসো।"

জগন্নাথদেবের দৃশ্যমান হাত নেই, কিন্তু তিনি সকল দ্রব্যই গ্রহণ করেন। তাঁর দৃশ্যমান পা নেই, কিন্তু তিনি সর্বত্রই বিরাজমান।তিনি জগতের আদিপুরুষ। তিনিই বিশ্বাত্মা, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তাঁর রূপ নেই, আকার নেই। তিনি চিন্তার অতীত। বাক্য মনের অতীত। তিনি অচিন্ত্য, তাই তাঁর সম্পূর্ণ বিগ্রহ তৈরি করা আদৌ সম্ভব নয়, শুধু ভক্ত আকাঙ্ক্ষায় অসম্পূর্ণ দারুব্রহ্ম প্রতীকে তিনি প্রকাশিত।জগন্নাথদেবের কৃপাঘন, গোলাকার চখা-চখা কমল নয়ন এবং অসম্পূর্ণ বিগ্রহ দেখে, আমরা না বুঝে বলে ফেলি; জগন্নাথের হাত-পা নেই, তাই সে ঠুটোঁ জগন্নাথ। কথাটি বলতে বলতে আমরা তা বাংলা প্রবাদবাক্যই বানিয়ে ফেলেছি।
জগন্নাথের প্রতি না বুঝে তুচ্ছার্থে প্রতিনিয়ত ব্যবহারও করি কথাবার্তায়।হয়ত আমরা একবার ভেবেও দেখিনি বাক্যটির অর্থ কি হতে পারে। যিনি সর্বব্যাপী পরমেশ্বর তাকেই বলছি ঠুটোঁ! বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আমাদের প্রচলিত ঠুটোঁ জগন্নাথ বাক্যের স্থানে ব্যবহার করা উচিৎ, সর্বব্যাপী জগন্নাথ। তাহলেই ভাবটি শুদ্ধ হয়, সুন্দর হয়।
শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্তী
সহকারী অধ্যাপক,সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ

একাদশীর উপবাস কি শাস্ত্রে বাধ্যতামূলক?

Ekadashi, একাদশী,একাদশী মাহাত্ম্য, একাদশী কি, ভগবান বিষ্ণু, শ্রী কৃষ্ণ, পাপপুরুষ, পঞ্চশস্য,পাপ, ইস্কন, ISKCON, probupad,প্রভুপাদ
আমাদের যত Ritual আছে সবকিছুই আমাদের শাস্ত্রের বিশেষ করে বৈদিক শাস্ত্রের কোনো না কোনো টেক্সটের মধ্যে আছে, কিন্তু এরমধ্যে একাদশীকে কোনো বৈদিক টেক্সটের মধ্যে পাইনা আমরা।বেদের মধ্যে এত গৃহসূত্র আছে, এত ধর্মসূত্র আছে, এদের মধ্যে বা বেদের কোন অংশেই একাদশী সংক্রান্ত কিছু পাওয়া যায় না।
একটা যন্ত্রকে সপ্তাহে একদিন রেস্টে (Rest) রাখতে হয়।আমাদের শরীরটা একটা জটিল যন্ত্র, যতই নিরবচ্ছিন্ন কাজ করুক এর নিয়মিত বিশ্রাম বা রেস্টের প্রয়োজন।যদি নিত্যব্যবহার্য একটা যন্ত্রের রেস্টের প্রয়োজন হয়, তাহলে শরীর নামক এ জটিল যন্ত্রটির তো অবশ্যই রেস্টের প্রয়োজন আছে।কারন আমাদের পেটের অভ্যন্তরে খাদ্য পরিপাক করে যে যন্ত্রটি তার তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, তাকে আমরা জঠরাগ্নি বলি।

পেটের অভ্যন্তরে এ জঠরাগ্নির প্রচণ্ড তাপ খাদ্যকে পরিপাক করে। এটা এমন একটা মেশিন, যে মেশিনে খাদ্য দেওয়া মাত্র পরিপাক করে প্রয়োজনীয় অংশ রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে পৌঁছে দেয়। তাই নিরবচ্ছিন্ন খেটে মরা এই দেহযন্ত্রটিকে সপ্তাহে অন্ততপক্ষে একদিন রেস্ট দেওয়া উচিত।

সপ্তাহে যদি না পারি, তাহলে ১৫ দিনে অন্ততপক্ষে বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে পারি।১৫ দিন অন্তর যদি না খেয়ে জঠরাগ্নিকে বিশ্রাম দেয়া হয়, তবে তা শরীরের জন্য ভাল।কিন্তু একাদশীর উপবাসের নামে পেটভরে খেয়েদেয়ে বর্তমানে যা হচ্ছে এটাকে আমি একাদশী বলব নাকি পেটাদশী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। একাদশী দিনে অনেককেই দেখি যে, উপবাসের নামে গাজরের হালুয়া, গাজরের মিষ্টান্ন, সাগুর মিষ্টান্ন, প্লেটে প্লেটে সব্জি সহ নিরবচ্ছিন্ন অমুক-সমুক দিনভর খেয়েই যাচ্ছে।

এদের কাণ্ডে মনে হয়, এটা কি উপবাস না উপবাসের নামে প্রহসন। নিজের প্রতিই নিজের প্রশ্ন আসে।
একঝুড়ি ফল এটা সেটা খেয়ে বলে,"না না শরীরটা আজকে ঠিক ভাল না,আজকে একাদশী আছি!"তো আমি আপনাদের বলব,একাদশী আপনি করেন,অবশ্যই করেন।কিন্তু,একাদশী নিয়ে বিভিন্ন অর্বাচীন পুরাণে যে কাহিনীগুলি আছে এ কাহিনীগুলো মোটেই মানা সম্ভব না।একাদশীর কথা আছে পদ্মপুরাণে। আমাদের হিন্দুদের মধ্যে দুইটা পুরাণ পদ্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ একেবারে আজগুবি কাহিনী দিয়ে ভর্তি, বিষয়টি একজন সংস্কৃতের স্টুডেন্ট মাত্রই জানেন।

এই পুরাণদুটি প্রায় ভোগাস, যা পরবর্তীকালের বাংলার কোনো পণ্ডিতদের দ্বারা লিখিত।অনেকে বলেছেন নবদ্বীপ বা তত্র এলাকার কোন পণ্ডিতদের লেখা।
ব্রহ্মবৈবতপুরাণ এবং পদ্মপুরাণ,এ দুইটা পুরাণের মধ্যে প্রচুর বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব দেখা যায় ।দুটোর মধ্যে বারেবারেই কাঁচি চালানো হয়েছে এটা যেকোন পুরাণ গবেষক ব্যক্তিমাত্রই জানে।পদ্মপুরাণের মধ্যে যে কাহিনীটি আছে একাদশী সম্পর্কে, তার উপরে ভিত্তি করে একটি সংগঠন থেকে "একাদশী মাহাত্ম্য" নামে একটা বই ছাপানো রয়েছে।সেই বইটা পড়লে পরে আপনার মনে আতঙ্ক বাসা বাঁধবে। সেখানে লেখা আছে প্রতি ১৫ দিন পরপর একাদশীর দিনে পৃথিবীর সকল পাপ অন্নের মধ্যে প্রবেশ করে, পঞ্চশষ্যের মধ্যে প্রবেশ করে, তাই সেদিন অন্ন খাওয়া যাবে না। এখানে অন্ন বলতে তারা শুধু পঞ্চশস্যকেই বুঝছে।

বেদের মধ্যে বিশেষ করে বেদমন্ত্রের মধ্যে আছে যে, অন্নকে কখনো নিন্দা করবে না,অন্নকে কখনো অতিক্রম করবে না।"অন্নং ব্রহ্ম" অর্থাৎ অন্নকে ব্রহ্মস্বরূপ বলা হচ্ছে। যেই অন্নকে বেদে ব্রহ্ম বলা আছে,যেই অন্নকে নিন্দা করতে নিষেধ করা আছে, যেই অন্ন কখনো অশুদ্ধ হয় না; তাহলে আমি কি করে মানতে পারি যে প্রতি ১৫ দিন পরপর সকল পাপ এই অন্নের মধ্যে, এই পঞ্চশষ্যের মধ্যে এসে প্রবেশ করে? এ অযৌক্তিক কথাগুলো কি অন্নরূপ ব্রহ্মের নিন্দা নয়?

যা খেয়ে প্রত্যেকটি জীব বেঁচে থাকে তাকেই অন্ন বলে।এ অন্নতেই আমরা বেঁচে থাকি, সকল জীব বেঁচে থাকে। তাই আমাদের দেহকে বলা হয় অন্নময় কোষ। বর্তমানে অন্ন বলতে যা বোঝানো হচ্ছে সেখানেই রয়েছে একটা বড় ধরনের ঘাপলা।বর্তমানে অন্নপাপ অন্নপাপ বলতে বলতে যাদের জীবন যাচ্ছে, তারা অন্ন বলতে শুধু ভাতকেই বোঝাচ্ছে। কিন্তু আমাদের শাস্ত্রে, বেদান্তে অন্ন বলতে চার প্রকার খাদ্যকে বোঝানো হয়েছে।এই চার প্রকার অন্ন হচ্ছে:
১.চর্ব্য- যা চিবিয়ে চিবিয়ে খাওয়া হয়; ভাল, রুটি সহ অধিকাংশ খাবার।
২.চোষ্য- যা চুষে চুষে খেতে হয়; শিশু এবং বৃদ্ধদের উপযোগী বিভিন্ন খাবার।
৩.লেহ্য- যা চেটে চেটে খেতে হয়; চাটনি জাতীয় বিভিন্ন খাবার।
৪.পেয়- যা পান করা হয়; দুধ, জল, চা ইত্যাদি।
বেদান্ত দর্শনের স্মৃতি প্রস্থানের হিরন্ময় গ্রন্থ শ্রীমদভগবদগীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের ১৪ নং শ্লোকে উল্লেখ্য এ চারপ্রকার অন্নের কথা অত্যন্ত সুন্দর করে বলা আছে।
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ।
প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্।।
"অামিই প্রাণিগণের উদরে বৈশ্বানর অগ্নিরূপে স্থিত হয়ে প্রাণ ও অপান বায়ুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, এবং পেয় এ চতুর্বিধ অন্নকে পরিপাক করি।

জগতের সকল খাদ্যই এ চার প্রকার অন্নের মধ্যে পরে। অন্নে যদি প্রতি ১৫ দিন পরপর একাদশীর দিনে পাপ প্রবেশ করে, তাহলে তো একগ্লাস জলও খাওয়া যাবে না; কারণ গীতা বা বেদান্তের ভাষ্যানুসারে জলও চতুর্বিধ অন্নের মধ্যে পেয়রূপ অন্ন। জলের মধ্যেও পাপ প্রবেশ করবে। তাই আপনি পদ্মপুরাণ এবং নব বৈষ্ণবদের ভাষ্যানুসারে সেদিন জলও পান করতে পারবেন না। একাদশী করবেন, করুন; কিন্তু, মানুষকে ভয় দেখাবেন না। একাদশীর উপবাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শারীরিক দিক দিয়ে, কিন্তু তা বৈদিক শাস্ত্রে বাধ্যতামূলক নয়। এ কথাটিই আমি মূলত বলিতে চেয়েছি।

একাদশীর নামে পেটভরে খেয়েদেয়ে পেটাদশী থাকার দরকার নাই।অন্তত ১৫ দিনে একদিন শরীরের জঠরাগ্নি যন্ত্রটারে বিশ্রামে রাখুন, ভালো থাকতে পারবেন। সুস্থ থাকতে পারবেন।কিন্তু উপবাসের নামে পেট ভরে খেয়ে এই একাদশী ব্রতকে লোকদেখানো উৎসবে রূপান্তরিত করা এটা একটা নিছক মূর্খতা। পূর্ববর্তী বৈষ্ণব মহাজনেরা এভাবে খেয়েদেয়ে একাদশী পালন করেননি। তাঁরা ছিলেন দৈন্যতার মূর্ত প্রতীক।
শ্রীমদ্ভাগবতপুরাণ এবং বিষ্ণুপুরাণ হল বৈষ্ণব মতের প্রধান অবলম্বন। এ দুটি পুরাণের উপরে ভিত্তি করেই বৈষ্ণব মত প্রচারিত এবং সম্প্রসারিত। এ দুটি পুরাণের কোথাও একদশীর দিনে অন্নের মধ্যে পাপ প্রবেশ করে জাতীয় অলীক ভয় দেখানো কাহিনী নেই। এ কাহিনীটি আছে পদ্মপুরাণে এবং কিছু আছে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে। দুটি পুরাণই অর্বাচীনকালের, দুটিগ্রন্থের মধ্যে প্রচুর শ্লোক প্রক্ষিপ্ত হয়ে মূল অংশটিই প্রায় হারিয়ে গেছে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ একজন সচেতন হিন্দুর কখনই মানা সম্ভব না, কারণ এ গ্রন্থটির প্রকৃতিখণ্ডে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্কে অনেক কদর্য কথা বলা আছে এবং প্রচুর পরস্পরবিরোধিতা আছে।
বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, উপবাস অর্থাৎ নিকটে বাস,কার নিকটে বাস? ব্রহ্মের নিকটে বাস।মেডিক্যাল সাইন্সে এ উপবাসকেই বলে 'অটোফেজি’ ( অবশ্য বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে)। ২০১৬ সালে নোবেল কমিটি জাপানের ডাক্তার ‘ওশিনরি ওসুমি’-কে উপবাস বা অটোফেজি আবিষ্কারের জন্যে নোবেল পুরষ্কারে পুরষ্কৃত করে।
একাদশী অবৈদিক প্রথা হলেও, এটাকে বাদ দেয়া অপ্রয়োজনীয়, কারণ সমাজে প্রথাটি জনপ্রিয়। আমরা এই প্রথাটি থেকে শুধু ভয় দেখানো অংশটি এবং উপবাসের নামে ভরপেট খাওয়া অংশটি বাদ দিতে পারি।একাদশী তিথিতে ভগবানের দিব্য নাম জপ, কীর্তন, ধ্যান ইত্যাদি পারমার্থিক কাজে সারাদিন অতিবাহিত করুন।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছুই না খেয়ে, দিনব্যাপী নির্জলা উপবাস থেকে ; যদি নির্জলা সম্ভব না হয় তবে সামান্য জল খেয়ে সন্ধ্যার পরে ফলমূল সহ সামান্য খাবার খেয়ে একাদশী ব্রত পালন করুন।এতে স্বাস্থ্য ভাল থাকবে, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, সহসাই শরীরে কোন রোগ-ব্যাধি আক্রমণ করতে পারে না। এবং শরীরের সাথে সাথে আপনার মন সহ অন্তঃকরণও প্রফুল্লতা পাবে।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্তী
সহকারী অধ্যাপক,সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ

ধর্ম নির্ণয়ে বেদই একমাত্র প্রমাণ; পুরাণ এবং স্মৃতি সহায়ক মাত্র

ধর্ম নির্ণয়ে বেদই একমাত্র প্রমাণ; পুরাণ এবং স্মৃতি সহায়ক মাত্র


বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলম্বী কিছু ব্যক্তি প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদকে পাশ কাটিয়ে শুধু পৌরাণিক গ্রন্থ অথবা বিভিন্ন বাবাগুরুদের লেখা ছড়ার বই, গানের বই, পাঁচালী, কথোপকথনের বই এবং চিঠিপত্রাদি সংকলনগ্রন্থকে যারযার ব্যক্তিগত বা সম্প্রদায়ের গুরুবাদী বিশ্বাস থেকে প্রধান ধর্মীয়গ্রন্থ মনে করেন। তারা নিজেরাও জানেন না যে, এ কাজের মাধ্যমে ধীরেধীরে তারা অজ্ঞাতসারে অজ্ঞানতার অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন । বেদবিদ্যা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় তাদের জ্ঞানের দরজা তালাবন্ধ জড়তাগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে।



বেদের পরে রামায়ণ, মহাভারত এবং অষ্টাদশ পুরাণ এবং অষ্টাদশ উপপুরাণ আমাদের ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু এ গ্রন্থগুলির একটিও প্রধান ধর্মগ্রন্থ নয়। বেদই আমাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। পুরাণগুলিকে আমাদের গ্রহণ বর্জনের মাধ্যমেই গ্রহণ করতে হবে। পুরাণে যেমন অনেক অসাধারণ অসাধারণ কথা আছে, তেমনি কিছু কিছু স্থানে বালখিল্য কথাও আছে। আবার পুরাণের সামান্য দুইএকটা বালখিল্য অসার উদাহরণ দেখিয়ে কিছুকিছু তার্কিক বিশেষ করে দয়ানন্দ সরস্বতীর অনুগামীরা সকল পুরাণকেই বাদ দেয়ার ধৃষ্টতা করেন।

পুরাণের জগতে ভাগবত, মার্কণ্ডেয়, ব্রহ্ম, বিষ্ণু, অগ্নি, শিব, স্কন্ধ এই অসাধারণ পুরাণগুলি যেমন আছে, তেমনি ব্রহ্মবৈবর্ত, পদ্ম, ভবিষ্য এই পুরাণগুলিও আছে। ব্রহ্মবৈবর্ত, পদ্ম, ভবিষ্য সহ এমন আরো কিছু পুরাণ আছে, যেগুলি পড়লে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় এই পুরাণগুলিতে বিভিন্ন সময়ে কিছু সাম্প্রদায়িক স্বার্থান্বেষী এবং তুর্কিশাসকদের সময়ে হাতের কাটাছেড়া হয়েছে। কাটাছেড়া হওয়ার পরেও, এ পুরাণগুলি সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে রাজহংস যেমন দুধেজলে মিশানো থাকলে



শুধুমাত্র জলের অংশকে পরিত্যাগ করে দুধটুকুই গ্রহণ করে; রাজহংসের মতো আমাদেরও পুরাণগুলি থেকে প্রয়োজনীয় সকল সারবস্তুগুলি নিয়ে অসার বস্তুগুলি পরিত্যাগ করতে হবে। একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না, ভারতবর্ষীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি পূর্ণতা পেয়েছে পুরাণগ্রন্থে। বৈদিক জ্ঞানই সাধারণের উপযোগী করে গল্পের ছলে পৌরাণিক কথাকাহিনীতে বোঝানো হয়েছে। তাই পুরাণ বর্ণাঢ্য হিন্দু সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
ইদানিং কিছু ভাগবত পাঠকেরা বিভিন্ন স্থানে ভাগবত পাঠ করতে এসে অযাচিতভাবে বলে, কলিযুগে বেদ নিষিদ্ধ। আমি ঠিক জানিনা, তারা এই কথাগুলি বুঝে বলে, নাকি নাবুঝে বলে? সেই সকল পণ্ডিতম্মন্য ব্যক্তিদের একটু শ্রীমদ্ভাগবতে বেদ সম্পর্কে কি কি বলা আছে তা একটু পড়ে দেখার অনুরোধ রইল:
"যে ব্যক্তি অকারণে বেদাচার ছেড়ে অনাচারে প্রবৃত্ত হয়, যমদূতেরা তাকে অসিপত্রবন নরকে নিয়ে গিয়ে কশা (চাবুক) দিয়ে মারতে থাকে। মার খেয়ে ছুটে পালাতে গেলে দুপাশে তালবনের অসিপত্রে ( তলোয়ারের মতো ধারাল পাতায়) সেই পাপির সর্বাঙ্গ ছিন্নভিন্ন হয় ; আর সে 'হা হতো অস্মি' ( আমি মরলাম) বলে দারুণ যন্ত্রণায় পদে পদে জ্ঞান হারায়। স্বধর্ম ত্যাগ করলে এমন শাস্তিই ভোগ করতে হয়।"
(শ্রীমদ্ভাগবত: ৫ম স্কন্ধ, ছাব্বিশ অধ্যায়)


"বেদে যা কর্তব্য বলে বলা আছে একমাত্র তাই ধর্ম, এর বিপরীত যা অর্থাৎ বেদে যা নিষিদ্ধ তা সকলই অধর্ম। বেদ সাক্ষাৎ নারায়ণের নিঃশ্বাস থেকে স্বয়ং উদ্ভূত হয়েছে, তাই বেদ সাক্ষাৎ নারায়ণ এবং স্বয়ম্ভু।"
(শ্রীমদ্ভাগবত : ৬ষ্ঠ স্কন্ধ, প্রথম অধ্যায়)
সামবেদীয় ছান্দোগ্য উপনিষদে নারদ সনৎকুমার সংবাদে (০৭.০১.০২) ইতিহাস পুরাণকে পঞ্চম বেদ বলা হয়েছে। মহাভারতকে ইতিহাস গ্রন্থ বলা হয়, তাই মহাভারতে মহাভারত নিজেকে পঞ্চমবেদ বলে পরিচয় দিয়েছে। শুধু মহাভারত এবং পুরাণই নয়, ভরতের নাট্যশাস্ত্রকেও পঞ্চম বেদ বলা হয়। বেদের বাইরে কাহিনী সর্বস্ব এ পঞ্চমবেদের দাবিদার অনেক গ্রন্থই।
বেদ গবেষক দয়ানন্দ সরস্বতী সহ অনেকেই পুরাণ বলতে বেদের ব্রাহ্মণ অংশকেই চিহ্নিত করেছেন। কারণ সেখানে মনুমৎস্য কথা সহ অসংখ্য শিক্ষামূলক গল্প আছে। তবে দয়ানন্দ সরস্বতীর মতবাদ বাদ দিলে, অধিকাংশ পণ্ডিতই পুরাণ বলতে ব্যাসদেব রচিত অষ্টাদশ পুরাণকেই বোঝে। এ অষ্টাদশ পুরাণের সাথে আছে আরো অষ্টাদশ উপপুরাণ। আপাতদৃষ্টিতে পুরাণের সংখ্যা (১৮+১৮) = ৩৬ টি হলেও, বর্তমানে পুরাণ নামে গ্রন্থ পাওয়া যায় ৩৬ সংখ্যাটির দ্বিগুণেরও বেশী।


এ পুরাণের অনেকগুলোই পরস্পর বিরোধী ভাব দ্বারা পূর্ণ। তাই লেখাগুলি একজনের লেখা কিনা, এটা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ। বিষ্ণুপুরাণে এবং দেবী ভাগবতে বিভিন্নকালে ২৮ জন পুরাণ রচয়িতা ব্যাসের কথা আছে। এ পুরাণগুলির মধ্যে পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ সহ কয়েকটির বঙ্গ সংস্করণের সাথে দক্ষিণ ভারত, উত্তর ভারতের সংস্করণ মেলে না। শ্লোক পর্যন্ত মেলে না।
পঞ্চদশ ষোড়শ শতাব্দীর বিখ্যাত স্মৃতিশাস্ত্রকাররা তাদের স্মৃতির বচনে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ থেকে যে সকল শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন এর অধিকাংশই বর্তমান গ্রন্থে নেই। উদাহরণ হিসেবে স্মৃতিচন্দ্রিকা গ্রন্থের কথা বলা যায়। এ গ্রন্থটি সহ তৎকালীন স্মৃতি নিবন্ধকারগণ তাদের গ্রন্থে প্রায় ১৫০০ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন।
কিন্তু নিবন্ধকারদের সে ১৫০০ শ্লোক থেকে বর্তমানে প্রাপ্ত ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে মাত্র ৩০ টি শ্লোক পাওয়া যায়। এতেই সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় গ্রন্থটির প্রাচীনরূপ এবং বর্তমান রূপের বিস্তর পার্থক্য। দক্ষিণভারতে গ্রন্থটির নাম পর্যন্ত আলাদা,সেখানে নাম ব্রহ্মকৈবর্তপুরাণ।
বিভিন্ন কালের প্রভাবে এবং বিদেশি শাসনে এ গ্রন্থগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই প্রবেশ করেছে। এ গ্রন্থগুলি ছিল হাতে লেখা পুঁথি। তাই লিপিকরদের দ্বারা সহজেই অনেক প্রক্ষেপণ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তাই মাঝেমধ্যেই শ্রুতি, স্মৃতি এবং পুরাণের বাক্যে বিরোধ দেখা যায়।
বিভিন্ন কারণে বেদ স্মৃতি এবং পুরাণের মধ্যে যদি আপাত কোন বাক্যে বিরোধ দেখা যায়। তবে এর সমাধানকল্পে শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর রচিত ব্যাস সংহিতায় বলেছেন। তিনি বলেছেন, সকল শাস্ত্রের বিরোধে একমাত্র বেদবাক্যই মান্য।

শ্রুতিস্মৃতিপুরাণানাং বিরোধো যত্র দৃশ্যতে।
তত্র শ্রৌতং প্রমাণন্তু তয়োর্দ্বৈধে স্মৃতির্ব্বরা।।
( ব্যাস সংহিতা : অধ্যায়-১, শ্লোক-৪)
"শ্রুতি, স্মৃতি এবং পুরাণের মধ্যে যদি বিরোধ দেখা যায়, তবে শ্রুতি বা বেদের বাক্যটিই প্রমাণ এবং যেখানে স্মৃতি ও পুরাণের মধ্যে বিরোধ দেখা যায়, সেখানে স্মৃতির বিধানই মান্য।"

বিষয়টি সুন্দর একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়। যেমন বেদের মধ্যে বলা আছে, অন্নই ব্রহ্ম। বেদের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে তৈত্তিরীয় উপনিষদে সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি আছে। সেখানে বলা আছে।

অন্নং ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। অন্নাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। অন্নেন জাতানি জীবন্তি।
(তৈত্তিরীয় উপনিষদ, ভৃগুবল্লী, দ্বিতীয় অনুবাক)

"অন্নই ব্রহ্ম। অন্ন থেকেই সকল প্রাণীর উৎপত্তি এবং অন্নতেই সবাই বেঁচে থাকে।"

অন্নং ন পরিচক্ষীত। তদ্ ব্রতম্। আপো বা অন্নম্।
(তৈত্তিরীয় উপনিষদ, ভৃগুবল্লী, অষ্টম অনুবাক)
"অন্নের অবহেলা করবে না, পরিত্যাগ করবে না এটাই ব্রত। জলই অন্ন।"

অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্ঠম্। তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে। সবং বৈ তে অন্নমাপ্নুবন্তি যে অন্নং ব্রহ্মোপাসতে।
অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্ঠম্। তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে।
অন্নাদ্ভূতানি জায়ন্তে। জাতান্যন্নেন বর্ধন্তে
(তৈত্তিরীয় উপনিষদ:ব্রহ্মানন্দবল্লী, দ্বিতীয় অনুবাক)

"অন্ন সমস্ত জীবের জ্যেষ্ঠ। তাই তাকে সর্ব ঔষধরূপ বলা হয়। অন্নকে ব্রহ্মভাবে যারা উপাসনা করেন, তারা অবশ্যই অন্নরূপ ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন।অন্নতেই জগতের সকল জীব জন্মগ্রহণ করে এবং অন্নতেই বর্ধিত হয়।"



অন্নকে ব্রহ্ম বলে, অন্নতেই সকল প্রাণী জীবিত থাকে, তাই অন্নের নিন্দা করতে নিষেধ করা হয়েছে মন্ত্রগুলিতে। অন্নকে পরিত্যাগ করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং অন্নের উপাসনা করতে বলা হয়েছে। কারণ অন্নতেই জগতের জীব জন্মগ্রহণ করে এবং অন্নতেই বর্ধিত হয়।
বৈদিক অন্ন সংক্রান্ত এ নির্দেশনা থাকার পরেও আমাদের কয়েকটি পুরাণে বিশেষ করে পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে প্রতি ১৫ দিনে একাদশীর দিনে পাপ সকল অন্নে বা খাদ্যে প্রবেশ করে। পুরাণকার এ কথাগুলো বলে, পাপপুরুষের একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন। পদ্মপুরাণের কাহিনীটি হয়ত নেই, কিন্তু এ ধরণের বাক্য আমরা স্কন্ধ পুরাণেও দেখি।স্কন্দ পুরাণ মহাভারতের মত বৃহৎ একটি গ্রন্থ। এটি একটি বৃহত্তম পুরাণ।
এতে সারা ভারতবর্ষের তীর্থক্ষেত্রের মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে। দুইএকটা ব্যতিক্রমী শ্লোককে বাদ দিলে এ পুরাণটি অসাধারণ। এ পুরাণটিকে পবিত্র তীর্থ সমুহের পূর্ণাঙ্গ একটি কোষগ্রন্থ বলা চলে। পুরাণটির বিষ্ণুখণ্ডে একাদশী প্রসঙ্গে বলা আছে-
যানি কানি চ পাপানি ব্রহ্মহত্যাদিকানি চ।।
অন্নমাশ্রিত্য তিষ্ঠন্তি সম্প্রাপ্তে হরিবাসরে।
স কেবলমঘং ভুঙেক্ত যো ভুঙেক্ত হরিবাসরে।।
(স্কন্দ পুরাণ, বিষ্ণুখণ্ড, কার্তিকমাসমাহাত্ম্য,
অধ্যায় ৩৩, শ্লোক ৩২-৩৩)


"ব্রহ্মহত্যাদি যত পাপ আছে তা সকলই একাদশীর দিনে অন্নে আশ্রয় করে। সেদিন যারা অন্ন ভোজন করে তারা কেবল পাপই ভোজন করে।"
বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত একাদশী একটি শাস্ত্রীয় ব্রত। উপবাসই এর মুখ্যকর্ম। কিন্তু একাদশীকে কেন্দ্র করে এ পাপপুরুষের কাহিনী এবং তৎসংশ্লিষ্ট বাক্যগুলো প্রথমে শ্রুতি বাক্যকে লঙ্ঘন করেছে। এরপরে স্মৃতি প্রস্থান শ্রীমদ্ভগবদগীতাকে লঙ্ঘন করেছে। বেদে যেহেতু অন্নের নিন্দা করতে নিষেধ করা হয়েছে, অন্ন ব্রহ্মস্বরূপ। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ, পদ্মপুরাণের পাপ প্রবেশের কথা বলে শ্রুতির বাক্যের অবহেলা করেছে। শ্রুতি এবং পুরাণের এ দুইপ্রকার বাক্য একসাথে গ্রহণ করা আমাদের সম্ভব নয়। কারণ, বাক্য দুটি বিপরীতধর্মী। বাক্যটি স্মৃতিকেও লঙ্ঘন করেছে, কারণ শ্রীমদ্ভগবদগীতাতে জগতের সকল খাদ্যকেই চারপ্রকার অন্ন বলা হয়েছে।
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ।
প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্।।
( গীতা:১৫. ১৪)
"অামিই প্রাণিগণের উদরে বৈশ্বানর অগ্নিরূপে স্থিত হয়ে প্রাণ ও অপান বায়ুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, এবং পেয় এ চতুর্বিধ অন্নকে পরিপাক করি।"
জগতের সকল খাদ্যই এ চার প্রকার অন্নের মধ্যে পরে। অন্নে যদি প্রতি ১৫ দিন পরপর একাদশীর দিনে পাপ প্রবেশ করে, তাহলে একগ্লাস জলও খাওয়া যাবে না; কারণ গীতা বা বেদান্তের ভাষ্যানুসারে জলও চতুর্বিধ অন্নের মধ্যে পেয়রূপ অন্ন। জলের মধ্যেও পাপ প্রবেশ করবে। তাই ব্রহ্মবৈবর্ত, পদ্মপুরাণ, স্কন্দ পুরাণ অনুসারে সেদিন জলও পান করা যাবে না। সেক্ষেত্রে অন্ন বলতে উল্লেখ পুরাণগুলি জগতের সকল খাদ্যকে না বুঝিয়ে ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, সরিষা এ পঞ্চ রবিশস্যকে বুঝিয়েছে। এতেই গীতার সাথে বিরোধ হয়েছে। কিন্তু ব্যাসদেব বলেছেন, শ্রুতি, স্মৃতি এবং পুরাণের মধ্যে যদি বিরোধ দেখা গেলে শ্রুতি বাক্যটিই প্রমাণ। এরপরে স্মৃতি ও পুরাণের মধ্যে বিরোধে স্মৃতিই বিধানই প্রমাণ ।


আমরা স্বাভাবিক সেন্সেও বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবতে পারি, এই যে অন্নে প্রতি একাদশীর দিনে পাপপুরুষ প্রবেশ করে এই পাপ পৃথিবীর কোথা থেকে প্রবেশ শুরু করে? যদি আমাদের অপর গোলার্ধে আমেরিকার দিনেরবেলা প্রবেশ করে, তবে সময়টি আমাদের রাত্রিবেলা হয়ে যাবে; আর ভারতবর্ষের দিনেরবেলা প্রবেশ করলে আমেরিকার রাত্রিকাল হবে।পাপপুরুষ কতক্ষণ খাদ্যে থাকবেন, সুর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত, নাকি অষ্টপ্রহর ২৪ ঘন্টা? তিনি কি একজন না বহু? তিনি কি শুধু মানুষের খাবারেই প্রবেশ করে, নাকি মনুষ্যেতর জীবজন্তুর খাবারেও প্রবেশ করে? বিষয়গুলি উল্লেখ্য পুরাণগুলোতে ক্লিয়ার না।
শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত নির্ণয় সম্পর্কে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের প্রাণপুরুষ শ্রীচৈতন্যদেব বলেছেন,
প্রমাণের মধ্যে শ্রুতি প্রমাণ প্রধান।
শ্রুতি যেই অর্থ কহে সেই সে প্রমাণ।।
প্রণব সে মহাবাক্য ঈশ্বরের মূর্ত্তি।
প্রণব হইতে সর্ব্ববেদ জগৎ উৎপত্তি।।
(চৈতন্যচরিতামৃত : মধ্যলীলা, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ)
অখিল ধর্মের মূল বেদই সনাতন ধর্মের মূল এবং বেদের উপরেই সনাতন ধর্ম ও সভ্যতা সংস্থাপিত। তাই সকল প্রকার শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত নির্ণয়ে বেদবাণীই যে একমাত্র প্রমাণ- এ শিক্ষা শ্রীচৈতন্যদেবই আমাদের দিয়েছেন। এবং যুগপৎ দেখিয়েছেন ওঙ্কার (ওঁ) এ মহাবাক্যই ঈশ্বরের মূর্তিস্বরূপ। সেই ওঙ্কার হতেই সকল বৈদিক জ্ঞান এবং জগতের উৎপত্তি।
এ জাজ্বল্যমান রেফারেন্স দেখেও কিছু লোক না বুঝে কলিযুগে বেদ নিষিদ্ধ, পুরাণই সব -এ জাতীয় আকডুম, বাকডুম বকে যাচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের প্রশ্ন, ভাই কলিযুগে যে বেদ নিষিদ্ধ এটা কি বেদে কোথাও ভগবান বলেছেন যে, আমার এ বৈদিক জ্ঞানটি সত্য, ত্রেতা এবং দ্বাপর যুগের জন্যে ; কলিযুগে তোমরা শুধুমাত্র তোমাদের যারযার কানে ফুশমন্ত্র দেয়া বাবা-গুরুদের গ্রন্থই একমাত্র পড়বে। পুরাণগুলিই পড়বে।না ভগবান এমন কথা বলেননি। তাহলে কলিযুগে বেদ নিষিদ্ধের কথাগুলি কোথায় আছে? আছে বিভিন্ন মানুষপূজারী বাবা,গুরু, তথাকথিত অবতার, ধর্মব্যবসায়ী এবং কিছু পেশাজীবী গীতা-ভাগবত পাঠকদের কথাবার্তা ও গ্রন্থে।


সনাতন ধর্ম একটি সুসংবদ্ধ ধর্ম। বেদের উপরেই এ ধর্মটি স্থাপিত। আপাতদৃষ্টিতে মত-পথের বিভিন্ন অলিগলি দেখে, হঠাৎ বিশৃঙ্খল মনে হয়। অনেকেই না বুঝে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। ধৈর্য ধরে একটু চিন্তার অলিগলি পারি দিলেই পাওয়া যায় হিরন্ময় বৈদিক রাজপ্রাসাদ। নাটক-যাত্রাপালার কৃত্রিম রাজপ্রাসাদ দেখে মানুষ সাময়িক মুগ্ধ হলেও, তা ক্ষণস্থায়ী। এতে বসবাস করা যায় না।
শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ