গুরুপূর্ণিমার আদর্শই হল, বৈদিক মার্গে ফেরা

গুরুপূর্ণিমার আদর্শই হল, বৈদিক মার্গে ফেরা

আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিকে আমরা ব্যাসপূর্ণিমা ও গুরুপূর্ণিমা নামেই জানি। এ পবিত্র তিথিতেই জন্ম নিয়েছেন অখিল বেদবিদ্যার ধারক, বাহক এবং প্রচারক ভগবানের অবতার শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস। তাঁর প্রকৃত নাম শ্রীকৃষ্ণ। তিনি যমুনা নদীর কূলে এক দ্বীপে জন্মেছেন, তাই তাঁর নামের সাথে এসে যুক্ত হয় দ্বৈপায়ন এবং তিনি বেদকে সম্পাদনা করেছেন তাই তাঁর নামের সাথে একটি উপাধি যুক্ত হয় ‘বেদব্যাস’। শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস। ঋষি পরাশর এবং জেলে কন্যা সত্যবতীর পুত্র। যিনি পৃথিবীতে ‘ব্যাসদেব’ নামেই প্রাতঃস্মরণীয়। শ্রীমদ্ভাগবতে তাঁর সম্পর্কে বলা আছে:
ততঃ সপ্তদশো জাতঃ সত্যবত্যাং পরাশরাৎ।
চক্রে বেদতরোঃ শাখা দৃষ্ট্বা পুংসঃ অল্পমেধসঃ।।
(শ্রীমদ্ভাগবত: ০১.০৩.২১)
"এরপর তিনি সপ্তদশ অবতারে সত্যবতীর গর্ভে এবং পরাশর মুনির ঔরসে বেদব্যাসরূপে অবতীর্ণ হন। পৃথিবীর মানুষের মেধাশক্তি দিনদিন ক্ষীণ হয়ে আসছে দেখে অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানবের প্রতি কৃপাপূর্ণ হয়ে তিনি বেদরূপ বৃক্ষের শাখা বিভাজন করেন (তাই তাঁর নামের সাথে অনন্তকালের জন্যে একটি উপাধি যুক্ত হয় বেদব্যাস)।"

ব্যাসদেব চিন্তা করলেন অনন্ত এ বেদবিদ্যা একত্রে গ্রহণ করা মানবের পক্ষে দুঃসাধ্য। তাই তিনি বেদবিদ্যাকে চারভাগে বিভক্ত করে তাঁর প্রধান চার শিষ্যকে দান করলেন। পৈলকে দিলেন ঋগ্বেদ, জৈমিনিকে দিলেন সামবেদ, বৈশম্পায়নকে দিলেন যজুর্বেদ এবং পরিশেষে সুমন্তকে দিলেন অথর্ববেদ। ব্যাসদেবের প্রধান এ চার শিষ্য জগতে বেদবিদ্যার প্রচার করেন তাঁদের শিষ্য-প্রশিষ্যের মাধ্যমে। এভাবেই গুরুশিষ্য পরম্পরায় বেদজ্ঞান শত-সহস্র শাখায় বিকশিত হয়ে জগতে বেদবিদ্যার অমৃতধারাকে দিকে দিকে প্রবাহিত করে তোলে। বেদ কোন একটি গ্রন্থ নয়, অসংখ্য গ্রন্থের সমষ্টি।

এরপরেই ব্যাসদেবের অনন্য কীর্তি বৃহত্তর ভারতবর্ষের ইতিহাসের মহাগ্রন্থ মহাভারত রচনা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে গ্রন্থকে বলেছেন– ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস।একলক্ষ শ্লোকের এ মহাভারতের ভীষ্মপর্বের আঠারোটি অধ্যায় নিয়েই রচিত হয়েছে ‘শ্রীমদ্ভগবদগীতা’। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দার্শনিক গ্রন্থ, যাকে বেদান্ত দর্শনের স্মৃতিপ্রস্থান বলা হয়।
আঠারোটি পুরাণ এবং আঠারোটি উপ-পুরাণের সকলই ব্যাসদেবের রচনা বলে প্রচলিত। যদিও পুরাণগুলোর মধ্যে অনেক পরস্পর বিরোধী, অবাস্তব, কাল্পনিক, বালখিল্য জাতীয় কথা আছে; এ সত্যেও পুরাণগুলোর মধ্যে অনেক মণি-মুক্তা খচিত অমৃতময় কথাও বিদ্যমান। তাই আমাদের এ পুরাণগুলোকে গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমেই গ্রহণ করতে হবে।

ব্যাসদেবের আরেকটি সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি সম্পূর্ণ বৈদিক সিদ্ধান্তগুলোকে মাত্র ৫৫৫ টা সূত্রে প্রকাশিত করা; যার নাম ব্রহ্মসূত্র। এ ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যের মাধ্যমেই ভারতবর্ষের সকল মত-পথের উৎপত্তি। শ্রীশঙ্করাচার্য থেকে আমাদের যত আচার্যবৃন্দ আছেন তাঁরা সকলেই এ ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্য লিখে আপন আপন সম্প্রদায়ের প্রবর্তন করেছেন। এ কারনেই ব্যাসদেব গুরু পরম্পরায় সবার গুরু এবং তাই তাঁর জন্মতিথিকে গুরুপূর্ণিমা বলা হয়। এদিনে নিয়ম ব্যাসদেবের অর্চনার সাথে সাথে যার যার গুরুকেও সম্মান জানানো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যে আমরা যার যার গুরু নিয়েই ব্যতিব্যস্ত ; এ তিথিতে যে ব্যাসদেবের জন্ম হয়েছিল এবং এই কারণেই যে এ তিথিটি এত মাহাত্ম্যপূর্ণ তা আমরা অনেকেই হয়ত জানিনা। বা আমাদের গুরুরা হয়তো অনেকে শিষ্যদের জানতেও দেন না তিথিটির মাহাত্ম্য; পাছে তাদের ভাগে কম পরে যায়!

গুরুপূর্ণিমায় আধ্যাত্মিক গুরুদের সাথে সাথে আমাদের সকলেরই স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগুরুদেরও যথাযথ সম্মানিত করা বা শ্রদ্ধার্ঘ্য দেয়া প্রয়োজন। আমাদের বিদ্যা দুইপ্রকার -পরাবিদ্যা এবং অপরাবিদ্যা। পরাবিদ্যা হল অধ্যাত্মবিদ্যা বা ব্রহ্মবিদ্যা, যার গুরু ব্যাসদেব। কিন্তু অপরাবিদ্যা যা আমাদের স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা পড়াশোনা করে লব্ধ জ্ঞানে জীবন নির্বাহ করছি; সেই জাগতিক অপরাবিদ্যার যারা শিক্ষক তারাও গুরু, জাগতিক বিদ্যার গুরু। তাই তাদেরকেও এ দিনে যথাসাধ্য সম্মানিত করতে হয়। দক্ষিণ ভারত সহ বিভিন্ন স্থানে শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং সংগীতের শিক্ষাগুরুকে এদিনে তাদের ছাত্রদের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধার সাথে সম্মানিত করতে দেখা যায়। নেপালে এ দিনটি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়। গুরুপূর্ণিমা আসলে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা এই ভূখণ্ডের শিক্ষক দিবস।

অতি প্রাচীনকাল থেকেই চলে এসেছে এ গুরুপূর্ণিমা স্মরণের রীতি। তাইতো গৌতমবুদ্ধ এ দিনেই সারনাথের ঋষিপত্তন মৃগদাবে তাঁর পঞ্চবর্গীয় শিষ্য কৌন্ডন্য, বপ্প,ভদ্দীয়, মহানাম ও অসসজিতের কাছে তাঁর নবমত প্রচার করেন এবং ধর্ম রক্ষার্থে 'ধর্মচক্র' প্রবর্ত্তন করে ব্যাসদেবের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। বৌদ্ধদের মত জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছেও এ দিনটি অত্যন্ত পবিত্র ও মাহাত্ম্যপূর্ণ ।

শিখেরা যেমন তাদের দশম গুরু গোবিন্দ সিংহের পরে তাদের ধর্মগ্রন্থ গুরুগ্রন্থ সাহেবকেই অনন্তকালের জন্যে গুরুরূপে বরণ করে নিয়েছেন। ঠিক একইভাবে ভারতবর্ষের বহু আর্য হিন্দু, হিন্দুজাতির স্বাভিমানের প্রতীক বৈদিক গৈরিক ধ্বজাকে গুরুরূপে এবং সন্মার্গদর্শনকারী রূপে বরণ করে আজ গৈরিকধ্বজার গুরুরূপে বিশেষ পূজা করেন এক একতাবদ্ধ হিন্দু জাতির আকাঙ্ক্ষায়।এ দিনে দান করা অবশ্যকরণীয় কর্তব্য।
গুরুপূর্ণিমার পবিত্র দিন থেকেই সাধুসন্ত সহ সকলের জন্যে সাধনভজনের পথে আধ্যাত্মিক উন্নতিকল্পে বাৎসরিক অবশ্য পালনীয় চাতুর্মাস্য ব্রতানুষ্ঠান শুরু হয়।
প্রকৃত সৎগুরুর বিরোধী আমরা কেউ না। আমরা জানি মুক্তিলাভের জন্য সদগুরুর অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা আছে; কিন্তু তা বাধ্যতামূলক না। আপনার যদি ইচ্ছে হয় তবে আপনি একটি কেন দশটি গুরুরও শরণ নিতে পারেন। তাতে আমাদের কোন বাধা নেই। কিন্তু আপনি বলতে পারবেন না যে গুরু ছাড়া মুক্তিলাভ অসম্ভব। এ কথাটার প্রতিই আমাদের ঘোরতর আপত্তি আছে । অর্থাৎ আপনার ইচ্ছে হলে আপনি যেমন মানুষ গুরুর শরণ নিতে পারেন, আবার তেমনি কেউ যদি পাতঞ্জলদর্শন অনুসারে পরমেশ্বরকে এবং বেদাদি শাস্ত্রগ্রন্থকে গুরুরূপে মনে করে শিখদের ন্যায়, তবে তাকেও আপনি অস্বীকার করতে পারেন না।মহর্ষি পতঞ্জলি যোগসূত্রের সমাধিপাদে জগতের সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরকেই গুরু বলেছেন-
তত্র নিরতিশয়ং সর্বজ্ঞবীজম্।
স পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেন অনবচ্ছেদাৎ।
তস্য বাচকঃ প্রণবঃ।
(যোগসূত্র : ১.২৫-২৭)
"ঈশ্বরই নিরতিশয়ত্ব প্রাপ্ত সর্বজ্ঞবীজ।তিনি কালের দ্বারা অবিচ্ছিন্ন পূর্ব পূর্ববর্তী অনাদিকাল থেকেই গুরু। প্রণব বা ওঁকারই তাঁর বাচক।"
যোগদর্শনের মত বেদাদি শাস্ত্রের বহুস্থানেই ভগবানকে গুরু বা জগদগুরু বলা হয়েছে, কারণ সকল জ্ঞানের উৎস তিনি। জীবকে সৃষ্টি করেছেন তিনি, সকল জ্ঞানের উৎসও তিনি, তাই তাকে জগদগুরু বলা হয়। শ্রীমদ্ভাগবত সহ বিভিন্ন পুরাণ এবং দর্শনে ভগবানকে বারবার গুরু বা জগদগুরু বলে অবিহিত হতে আমরা দেখি।কিন্তু ইদানিং বিভিন্ন গুরুদের নামের সাথে জগদগুরু শব্দটি দেখা যায়। যা ঠিক নয়। যেহেতু শাস্ত্রে ভগবানকে জগদগুরু বলে অবিহিত করা হয়েছে, তাই অন্যের ক্ষেত্রে শব্দটি প্রয়োগ করা সমীচীন নয়। শ্রীশঙ্করাচার্য তাঁর রচিত কৃষ্ণাষ্টক নামক ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে সমর্পিত স্তোত্রটি শুরুই করেছেন বেদের একমাত্র প্রতিপাদ্য, বুদ্ধির সাক্ষীরূপ সর্বান্তর্যামী, অসুর বিনাশক চরাচর সকলের গুরুরূপ পরমেশ্বরকে স্মরণ করে।

শ্রিয়াশ্লিষ্টো বিষ্ণুঃ স্থিরচরগুরুর্বেদবিষয়ো
ধিয়াং সাক্ষী শুদ্ধো হরিরসুরহন্তাব্জনয়নঃ ।
গদী শঙ্খী চক্রী বিমলবনমালী স্থিররুচিঃ
শরণ্যো লোকেশো মম ভবতু কৃষ্ণোঽক্ষিবিষয়ঃ॥
" শক্তি স্বরূপা শ্রীকে আলিঙ্গিত করে অভেদমূর্তিতে আছেন যে বিষ্ণু, যিনি চরাচর সকলের গুরু, বেদের যিনিই একমাত্র প্রতিপাদ্য বিষয়, যিনি বুদ্ধির সাক্ষীরূপ সর্বান্তর্যামী, যিনি অসুর বিনাশক, পদ্মকমলের ন্যার রক্তিম যাঁর নয়ন। যিনি শঙ্খ,চক্র ও গদা ও বিমল বনমালা ধারণকারী। যাঁর দেহের উজ্জল দীপ্তি সর্বদা বিরাজমান।যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র শরণ্য ঈশ্বর, সেই কৃষ্ণচন্দ্র দয়া করে আমার নয়নগোচর হোন।"

গুরু যদি শ্রীবাল্মিকী, শ্রীবেদব্যাস, শ্রীশঙ্করাচার্য, শ্রীরামানুজাচার্য, শ্রীনিম্বার্কাচার্য, আচার্য শ্রীরামানন্দ, আচার্য শ্রীরবিদাস, শ্রীমাধবাচার্য, শ্রীচৈত্যন্যদেব, সমর্থ শ্রীরামদাস, শ্রীশঙ্করদেব, শ্রীরামকৃষ্ণ, শ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারী, শ্রীনিগমানন্দ এঁদের মতো জাজ্বল্যমান সদগুরু হয়, তবে তাদের শ্রীচরণে আশ্রয় নিতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু গুরু নামধারীরা, গুরু লেবাসধারীরা যদি রজনীশ, আসারাম, রামরহিম, রাধে মা, নির্মলা মায়ের মতো আত্মপ্রচারকামী, ভণ্ড, লোভী, দুশ্চরিত্র, পাষণ্ড হয়; তাহলে একবার হলেও আপনি চিন্তা করুন তো, তাদের চরণে আশ্রয় নিলে আপনার কি গতি হবে? একটা বৃক্ষে পূর্বে শ্রীফল দিত, কিন্তু বর্তমানে সেই বৃক্ষই দিচ্ছে বিষফল। আপনি কতদিন বা কতকাল এই গাছকে বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন? বিষে জর্জরিত হয়ে আপনারই বা কি গতি হবে ভাবতে পারেন একবার?

আজকে গুরু একটা ব্যবসাতে পরিণত হয়েছে। ব্যবসায় মত এখানেও লাভ লোকসানের আছে। ব্যবসায় প্রোডাক্টের মার্কেটিং এর জন্যে যেমন লোক নিয়োগ করা হয়; এখানেও তাই চলছে। গুরুরা বিভিন্ন এজেন্ট নিয়োগ করে, তারা আবার গুরুদের আয়ের কমিশন পায়। এই ভণ্ড গুরুরা বেদবেদান্তের প্রচার বাদ দিয়ে নিজের ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রচার নিয়েই অষ্টপ্রহর ব্যস্ত।সেজেগুজে রোডশোসহ ক্ষমতা প্রদর্শনের হেন পন্থা নেই, যা তারা তা ব্যবহার করে না। এ কারণেই অনেকে মজা করে বলে-
"সকল ব্যবসা বন্ধ হল,
খোলা রইলো গুরুর দ্বার,
গুরুর ব্যবসা চলে ভাল,
যদি থাকে ভাল ক্যানভাসার।"
সকল সাধুই সাধু না। সকল গুরুই গুরু না।সাধুত্ব এবং পাণ্ডিত্য সবার থাকে না; কিন্তু এরপরেও গেরুয়া বস্ত্র সর্বদা প্রণম্য। যে গুরু ঈশ্বরের বাণী বাদ দিয়ে শিষ্যদের শুধু নিজের প্রচার করতে বলবে; তাকেই দান করতে বলবে; মরে গেলে তার উত্তরপুরুষ বংশধরদের দান করতে বলবে; মন্দিরে দেবতার বিগ্রহাদি বাদ দিয়ে নিজের ছবি পূজা করতে বলবে; গ্রাফিক্স ডিজাইন করে, নিজের পদ্মের উপরে বসা ছবি পেছনে সূর্যের আলো - এই টাইপের আত্মপ্রচারকামী অশাস্ত্রীয় ছবি শিষ্যদের দিয়ে প্রচার করাবে; শিষ্যদের বেদবেদান্তের জ্ঞানের পথে যেতে বাধা দিবে; ব্যক্তিস্বার্থে শাস্ত্রহীন অশাস্ত্রীয় নির্দেশনা দিবে; সাধারণ মানুষ থেকে দূরত্বে থেকে রাজার মত বিলাসবহুল জীবনযাপন করবে; হিন্দুদের আপদে বিপদে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে; অকারণ সর্বধর্ম সমন্বয়ের নামে সাধারণ হিন্দুদের বিভ্রান্ত করবে; কোন স্টেজে অথবা রাজপথে অন্ধ শিষ্যদের দিয়ে শোডাউন করে ক্ষমতার প্রদর্শন করবে; এ সকল কাজ যে যে গুরুনামধারী ব্যক্তিরা করবে, বুঝতে হবে তিনি সদগুরু নন, তিনি আত্মপ্রচারকামী ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরু ব্যবসায়ী। একজন সদগুরু কখনই নিন্দনীয় এ সকল কাজ মরে গেলেও করবে না এবং তার শিষ্যদেরও করতে দিবে না।
ভাবতে অবাক লাগে গুরু যদি ঈশ্বরের পথদ্রষ্টা হয় তবে গুরুই কেন ঈশ্বর সেজে বসে যান পূজার আসনে? ঈশ্বরকে বাদ দিয়ে আমরা পরবর্তীতে তাকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পরি। আর এই সকল ভণ্ড গুরুরা শিষ্যদের পকেট মারতেই সদা ব্যস্তসমস্ত হয়ে পরেন। নিজের সাথেসাথে তার বউপোলাপান-নাতিপুতির সহ ভবিষ্যতের বংশধরদের জন্যে অন্নসংস্থানের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা করে যান।
শ্রীগোবিন্দাচার্যের মতো গুরু হলে আপনি শ্রীশঙ্করাচার্যের মতো শিষ্য পাবেন। সমর্থ শ্রীরামদাসের মতো গুরু পেলে আপনি ছত্রপতি শিবাজীর মতো রাজা পাবেন। শ্রীরামকৃষ্ণের মতো গুরু পেলে আপনি স্বামী বিবেকানন্দের মত বিশ্বদরবারে ভারতবর্ষ এবং সনাতন ধর্মের মুখ উজ্জ্বল করা বিশ্বজয়ী শিষ্য পাবেন। কিন্তু এই গুরু নামধারী ভণ্ডদের থেকে কি পাবেন আপনি?
আমাদের জন্ম হয়েছে বেদ বেদান্তের মূল রাজপথে ফেরার জন্যে। আমাদের সমস্যা হলে, আমরা সমাধান খুঁজব বেদাদি শাস্ত্রগ্রন্থের কাছে। কোন মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য বা বর্তমানকালের কোন বাবা-গুরুদের লেখা বাণীর সংকলন, চিঠির সংকলন, গানের বই, ছড়ার বই থেকে নয়।কারণ জগতে বেদবেদান্তই একমাত্র প্রমাণ।
বর্তমানে যেভাবে আমরা রাস্তা থেকে লোক ধরে ধরে এনে গুরু নামে মানুষ পূজা শুরু করে দিচ্ছি, এটা খুবই দুঃখজনক এবং যুগপৎ অশাস্ত্রীয়। গুরুর কাজ হলো বৈদিক সন্মার্গ দেখিয়ে মানুষকে মুক্তির পথে অগ্রসর করা। কিন্তু বর্তমানে অনেক ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরুরাই বেদ-বেদান্ত বাদ দিয়ে শিষ্যদের শুধুমাত্র নিজেদের এবং নিজের ছেলেমেয়ে বংশধরদের পূজা করাতেই ব্যস্ত।
এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক গুরুদের প্রধান লক্ষ্যই থাকে ধনী শিষ্যদের পকেটের দিকে। এই সকল গুরু নামধারী ধান্ধাবাজ ভাইরাসদের কারণেই অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা ধর্মের উপরে বিরক্ত হয়ে ধর্মান্তরিতের পথে পা বাড়াচ্ছে এবং এই ভণ্ডদের বিভিন্ন ছলাকলা যুক্ত ভণ্ডামির কারণে অনেক মানুষই প্রকৃত গুরুদের ভুল বুঝে অবজ্ঞা করছে।
সকলের কাছে আমার আহ্বান, ব্যাসদেব প্রচারিত এবং প্রদর্শিত পথে, পরমেশ্বরের নামে আমরা যে কুসংস্কার মুক্তভাবে বৈদিকরাজপথে ফিরতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি, এই ঐক্যের বন্ধন যেন আমাদের দিনেদিনে আরো দৃঢ় হয়। কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনাতো থাকবেই। এর মাধ্যমেই আমাদের সমাধানের পথের দিকে এগোতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সম্পদ শিক্ষিত একঝাক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া তরুণ সম্প্রদায়।আমাদের আশা এ তরুণেরাই আগামীতে জাতিকে সত্যিকার অর্থে কুসংস্কার মুক্ত মঙ্গলময় পথ দেখাবে।
বেদাদি শাস্ত্রানুসারে জাতপাত নির্বিশেষে সকলেই গুরু হতে পারে; শুধুমাত্র গুরুকে যোগ্য অধিকারী, নিষ্কাম এবং আত্মপ্রচার বিমুখ ব্রহ্মময় হতে হবে। এ প্রসঙ্গে শ্রীচৈতন্যদেবের একটি অত্যন্ত সুন্দর স্পষ্ট নির্দেশ আছে, তিনি ব্রাহ্মণ-শূদ্র নির্বেশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষকেই গুরু হবার, আচার্য্য হবার, তত্ত্ববেত্তা হবার অধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন-
কিবা বিপ্র কিবা ন্যাসী শূদ্র কেনে নয়।
যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা সেই গুরু হয়।।
(চৈতন্যচরিতামৃত : মধ্য, অষ্টম পরিচ্ছেদ)
বর্তমানে আমাদের প্রচণ্ড ছদ্মবেশী মানসিকতা দেখা যায়, আমরা যখন নিজের জীবন নিয়ে লিখি, তখন জীবনের সকল ঘটনাগুলোকে ধুয়েমুছে কালিমাকে গোপন করে লিখি। কিন্তু ব্যাসদেবের জীবনে দেখা যায় উল্টোটি, তিনি সর্বদা সত্যে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর লেখায় নিজের জীবন নিয়ে সকল বিষয়ে ছিল তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি। বাবা পরাশর এবং মা জেলেকন্যা সত্যবতীর হঠাৎ মিলনে কিভাবে তাঁর জন্ম হয়েছে, তা তিনি না লিখলেও পারতেন। বংশরক্ষায় মায়ের আদেশে কুরুবংশের ক্ষেত্রজ পুত্র পাণ্ডু, ধৃতরাষ্ট্র এবং বিদুরের কিভাবে জন্ম হয়েছে, তাও না লিখলেও পারতেন।

তিনি কি জানতেন না একথাগুলি আগামীতে তাঁকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, তবুও সত্যরক্ষার্থে তিনি লিখেছেন। অথচ বর্তমানে আমরা যখন ডাইরি সহ নিজের জীবন নিয়ে লিখি, তখন অধিকাংশই সাজানো-গোছানো মিথ্যা কথা লিখি। প্রাচীন রাজবংশগুলিতে নিয়ম ছিল, যদি কোন কারণে বংশের প্রদীপ নিভে যায়, তবে সকলের পরামর্শে এবং সম্মতিতে কোন জ্ঞানী পণ্ডিত ব্যক্তিকে দিয়ে সন্তান উৎপাদন করতে পারবে। যিনি ক্ষেত্রজ হয়ে আসবেন, তাঁর যৌনতা উপভোগের কোন বিষয় ছিল না। তাকে সারা শরীরে ঘি মেখে দেহকে তৈলাক্ত করে নিতে হত। রাজপরিবারের পুরুষরা মারা গেলে বা নপুংসক হলে তবেই ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনের রীতি ছিল।

রাজমহিষীদের গর্ভে ক্ষেত্রজ সন্তান যার থেকেই উৎপন্ন হোক না কেন সন্তান সেই রাজবংশের হোত। বর্তমানে যেমন ভাবে, আমরা নিজেরা যদি জমি চাষ করতে অপারগ হই, তবে ধানের জমিতে অন্যকে দিয়ে বর্গাচাষ করাই। বর্গাচাষি সকল শ্রম দিয়ে ধান উৎপাদন করলেও ধানের মালিক হয় জমির মালিক; বর্গাচাষি নয়, তিনি শুধু ভাগ পান। ক্ষেত্রজ বিষয়টি নিয়ে অনেকেই আমরা না বুঝেই কটুক্তি করি, কিন্তু একবার নিগূঢ়ভাবে ভেবে দেখলে দেখতে পাব চন্দ্রবংশের মত সুপ্রাচীণ বংশ যখন সন্তান না থাকার কারণে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন রাজমাতা সত্যবতীর চন্দ্রবংশের সন্তানধারাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে এটা ছাড়া আর কোন পথই তাঁর সামনে খোলা ছিল?

হিন্দুদের সাকার নিরাকার সকল মতপথের পক্ষেই লিখেছেন ব্যাসদেব। তাঁকে বা তাঁর চিন্তাকে খণ্ডিত করা যায় না। তখনও তাঁকে মনে হয় নিরাকার ব্রহ্মবাদী, কখনও বৈষ্ণব, কখনও শাক্ত, কখনও শৈব।অর্থাৎ তিনি সকল মতপথের সমন্বয়ের প্রতীক।পরবর্তীকালে এ সমন্বয় দেখা যায় শ্রীশঙ্করাচার্যের মধ্যে। তাই ব্যাসদেব শ্রীশঙ্করাচার্যের চিন্তাকে সংকীর্ণ করা যায় না। ব্যাসদেব যে পুরাণ লিখেছেন, সেই পুরাণের কেন্দ্রীয় উপাস্যকেই পরমেশ্বররূপে স্তোত্র করেছেন। যে কোনভাবে এবং যেকোন রূপেই যে তাঁকে পাওয়া যায় এ ব্রহ্মতত্ত্বটি বোঝাতে।

আজ আমরা অনেক সময় ব্যক্তিকে তাঁর সৌন্দর্য দিয়ে মূল্যায়ন করতে চাই, কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনন্য অদ্বিতীয় মেধাজগতের কাজ করা ব্যাসদেবের গায়ের বর্ণ ছিল কুচকুচে কাল। প্রচলিত অর্থে খুব একটা সুদর্শন ছিলেন না, কিন্তু এরপরেও তিনি তাঁর মেধা যোগ্যতাবলে সকল বিদ্যার আদিগুরু বলে আজও বিশ্বব্যাপী সম্মানিত পূজনীয়। রূপ নয়, কর্ম এবং যোগ্যতা যে মানুষকে মহান করে, এ আধুনিক মানবিক কথাগুলি আমরা তাঁর জীবনেই দেখি; যা আমাদের জন্যে শিক্ষনীয়।
কুরুবংশের ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদনে অম্বিকা এবং অম্বালিকা তাঁর কাছে যখন আসে তখন তাঁর চেহারা দেখে অম্বিকা সারাক্ষণ চোখ বন্ধ করে ছিলেন এবং অম্বালিকা ভয়ে ফ্যাকাসে বা পাণ্ডুবর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। কথাগুলো ব্যাসদেব নিজের সম্পর্কে নিজেই লিখেছেন। ভাবা যায়, নিজের লেখাতে নিজেকে নিয়েই কতটা সরল নিষ্কপট স্বীকারোক্তি। এরকম অসংখ্য কারণেই তিনি পূজনীয়, বরণীয় এবং মহান।
পরিশেষে গুরুপূর্ণিমার আদর্শে উদ্ভাসিত, উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা যেন ব্যাসদেব প্রচারিত বৈদিক আদর্শে উদীপ্ত হয়ে সর্বদা বৈদিক সন্মার্গী হতে পারি ; এ কামনায় সবাইকেই গুরুপূর্ণিমার শুভেচ্ছা।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক,সংস্কৃত বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ

দারুব্রহ্ম জগন্নাথদেব: পঞ্চমতের একত্বের প্রতীক।

জগন্নাথদেব, পুরীর রহস্য, জগন্নাথ মন্দির, রথযাত্রা, জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘর, jaganathdev, puri


জগন্নাথ অর্থাৎ জগতের নাথ। পরমেশ্বর ভগবানের করুণাঘন এক অপূর্ব রূপ। জগন্নাথধাম হিন্দুজাতির চার ধামের এক ধাম। দেবীর ৫১ পীঠের এক পীঠ। জগন্নাথদেবের বিগ্রহ দৃশ্যত অসম্পূর্ণ,কিন্তু তাঁর দৃশ্যমান হস্ত,পদ না থাকা সত্ত্বেও তিনি হস্ত-পদময়। কারণ , এ জগতে এবং সকল জীবের মাঝেই তাঁর প্রকাশ। আবার তিনি এ জগতের পারে, সকল ইন্দ্রিয়ের পারে, ইন্দ্রিয়, বাক্য, মনের অগোচর হয়ে সদা বিরাজিত হয়ে আছেন ।

সারা ভারতবর্ষে যতো প্রাচীন মন্দির আছে তার প্রত্যেকটি মন্দিরে বিগ্রহেরই কিছু স্বতন্ত্রতা আছে। তেমনি স্বতন্ত্রতা জগন্নাথ বিগ্রহের। অপরূপ করূণাঘন চখা-চখা চোখে তাকিয়ে আছেন ভগবান ভক্তের পানে। স্কন্ধপুরাণের উৎকল খণ্ডে জগন্নাথদেবের এ রূপের কারণ দেয়া আছে খুব সুন্দর করে, সেই মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন, রাণী গুণ্ডিচা এবং বৃদ্ধ কারিগরের এ ঘটনাটা আমরা সকলেই মোটামুটি জানি। তাই সেদিকে আর আমি যাচ্ছি না।

জগন্নাথদেব সনাতন হিন্দুর শাক্ত, শৈব,গাণপত্য, সৌর এবং বৈষ্ণব এ পঞ্চ মতেরই একত্বের প্রতীক। বলদেব শিবের, শুভদ্রা শক্তির, জগন্নাথ বিষ্ণু, আর সুদর্শন সূর্যের প্রতীক বলে উপাসনা করা হয়। পঞ্চমতের মধ্যে বাকি রইল একটি গাণপত্য। তাই স্নানযাত্রার দিনে জগন্নাথদেবকে গণেশরূপে উপাসনা করা হয়। আবার জগন্নাথদেবের যেহেতু দৃশ্যমান হস্ত-পদ নেই, তাই তিনি হস্ত-পদের পারে ব্রহ্মস্বরূপ। এবং তাঁর বিগ্রহকে বলা হয় দারুব্রহ্ম।তান্ত্রিকমতে জগন্নাথকে শক্তিপীঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বিমলার ভৈরব হিসেবে পূজা করা হয়। বৈদিক, তান্ত্রিক সকল মতেই জগন্নাথদেবকে পূজা করা হয়।

জগন্নাথদেবের মন্দির শুধুমাত্র হিন্দুদের সকল মত-পথের একতার প্রতীকই নয় ; হিন্দু জাতির একতা গঠনে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। জগন্নাথদেবের গর্ভগৃহে সকল হিন্দুদের সহ ভারতে উৎপন্ন বৌদ্ধ, জৈন,শিখসহ সকল ধর্মাবলম্বীদেরই প্রবেশের অধিকার । (শুধুমাত্র সেমেটিক ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশাধিকার নেই, কারণ তারা সুযোগের অসৎ ব্যবহার করে প্রচুর অসভ্যতা করেছে বিভিন্ন সময়।) জগন্নাথদেবের প্রসাদ ব্রাহ্মণ-শূদ্র (কথিত) নিবির্শেষে সকলে এক সাথে, এক পাতে বসে গ্রহণ করে।যেখানে জগন্নাথদেবের প্রসাদ পাওয়া যায়, সেই স্থানের নাম আনন্দবাজার। অপূর্ব নামকরণ! এ যেন একতার আনন্দবাজার। এ যেন জাত-পাতের রাজনীতিকে একপাশ রেখে হিন্দুত্বের মিলনের আনন্দবাজার।

জগন্নাথদেবের পূজা হয় দ্বৈতভাবে, ব্রাহ্মণ পাণ্ডাদের রীতিতে এবং শূদ্র শবরদের রীতিতে। সকলেই সমান সমান অংশগ্রহণকারী জগন্নাথদেবের উপাসনায়। জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার পরের ১৫ দিনকে বলা হয় অনসর-পিড়ি ; এ সময়ে শবর বিশ্বাবসুর বংশধর শূদ্র দয়িতাপতিরাই জগন্নাথদেবকে পূজা করেন।

সাধারণত দেবতা থাকে মন্দিরে আর ভক্তরা এসে বিগ্রহকে প্রণাম করে, উপাসনা করে। কিন্তু জগন্নাথদেব এর ব্যতিক্রম, তিঁনি সাধারণজনের মাঝে সাধারণজন হয়ে রাজপথে নেমে এসেছেন। তিঁনি তো রাজাধিরাজ তিঁনিই যখন নেমে এসেছেন রাজপথে, তখন দেশের রাজার তো সাধ্য নেই রাজসিংহাসনে বসে থাকার। তিনিও চলে এসেছেন রাজপথে সাধারনজনের কাছে। হাতে ঝাড়ু নিয়ে হয়েছেন জগন্নাথদেবের পথের ঝাড়ুদার।

পুরীর গজপতি রাজা স্বয়ং শোভাযাত্রা সহকারে জগন্নাথদেবের রথের চলার পথকে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করার পরেই তিনটি রথ চলতে শুরু করে। এ প্রথা রাজা অনঙ্গভীমদেবের সময় ( ১১৭৫-১২০২ খ্রিস্টাব্দ) থেকেই চলে আসছে। রাজা- প্রজা সকলেই আজ একাকার, সবারই পরিচয় তারা জগন্নাথদেবের সেবক ; অপূর্ব সাম্যবাদের শিক্ষা দেয়ার জন্যেই এ প্রথার আয়োজন।

বর্তমানে আমাদের যৌথ পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙে যাচ্ছে, পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে অশান্তি ঝগড়াঝাটি চলে আসছে, ভাইবোনের মধ্যে স্বার্থের বিরোধে কোর্টকাছারি পর্যন্ত যেতে হচ্ছে। কিন্তু একবার আমরা ভেবে দেখেছি কি, পুরীর জগন্নাথ মন্দির ভাইবোনের সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। জগন্নাথদেব শ্রীকৃষ্ণ, বড়ভাই বলরাম এবং আদরের ছোটবোন সুভদ্রা এ তিনভাইবোনকে একসাথে বসিয়ে সেখানে পূজা করা হচ্ছে।

আরেকটি বিষয় খুবই লক্ষ্যনীয়, রথযাত্রার সময়ে আগে বড়ভাই বলরামের রথ যায়, এরপরে ছোটবোন সুভদ্রার রথ এবং পরিশেষে যায় জগন্নাথদেবের রথ। আমাদের সংস্কৃতি অনুসারে জ্যেষ্ঠভাইকে আগে যেতে দিতে হয়। জ্যেষ্ঠকে অগ্রগামী করে,আদরের ছোটবোনের যাত্রা নির্বিঘ্ন করে, তবেই অবশেষে জগন্নাথদেবের রথ রাজপথে অগ্রসর হয়।

৪৫ ফুট উচ্চতার জগন্নাথদেবের রথের নাম নন্দীঘোষ, এর আরও কয়েকটি নাম আছে গরুড়ধ্বজ, চক্রধ্বজ এবং কপিধ্বজ। একইভাবে ৪৪ ফুট উচ্চতার বলভদ্রের রথের নাম তালধ্বজ এবং ৪৩ ফুট উচ্চতার সুভদ্রাদেবীর রথের নাম দর্পদলন।
শ্রীশঙ্করাচার্য, শ্রীরামানুজাচার্য,শ্রীচৈতন্যদেব তুলসীদাস সহ আমাদের প্রায় সকল আচার্যবৃন্দেরই উপাসনার, সাধনার স্থান ছিলো জগন্নাথ ধাম। তাই আমাদের প্রায় সকল আচার্যবৃন্দই শ্রীক্ষেত্র/পুরুষোত্তম ক্ষেত্র /শঙ্খক্ষেত্র /নীলাচল ক্ষেত্র /মুক্তিক্ষেত্র ইত্যাদি বিভিন্ন নামে অভিহিত জগন্নাথধামের মাহাত্ম্যকথা প্রচার করেছেন এবং জগন্নাথদেবের মাহাত্ম্যযুক্ত স্তোত্র রচনা করেছেন।
মধ্যযুগে উত্তর ভারতে ভক্তি আন্দোলনের যিনি পুরোধাপুরুষ শ্রীরামচরিতমানসের রচয়িতা তুলসীদাস গোস্বামীও পুরিতে এসে জগন্নাথদেবকে রঘুপতি রামরূপে উপাসনা করেছিলেন।
কালান্তরে জগন্নাথ ধামে কালযবনের অত্যাচারকালে মন্দিরের সেবায়েত পাণ্ডাগণ জগন্নাথ বিগ্রহের উদর প্রদেশ স্থিত রত্নপেটিকা চিল্কা হ্রদের তীরে ভূগর্ভে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় কালক্রমে উক্ত স্থানের লোকেরা ভুলে যান রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে। শ্রীশঙ্করাচার্য যোগবলে জগন্নাথের রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে নির্ধারণ করে দেন এবং জগন্নাথকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।
বদরিকাশ্রমে নারায়ণ বিগ্রহও তিনি অনুরূপভাবে প্রকাশিত করেন।উল্লেখ্য যে, আচার্যের জীবনের একটি প্রধান কীর্তিই হল শ্রেষ্ঠ পবিত্র মন্দিরগুলোতে ভগবদ্বিগ্রহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। যখন আচার্য শ্রীশঙ্কর যোগবলে জগন্নাথের রত্নপেটিকা রাখার স্থানটিকে নির্ধারণ করে দেন তখন ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি জগন্নাথদেবের উদ্দেশ্যে অসাধারণ একটা সংস্কৃত স্তোত্র তৈরি করেন। এ স্তোত্রটি আজও প্রতিনিয়ত ব্যবহৃত হয় এবং জগন্নাথদেবকে নিয়ে স্তোত্রের মধ্যে এ স্তোত্রটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলা হয়। শ্রীশঙ্করাচার্যের ভাষায়:
মহাম্ভোধেস্তীরে কনকরুচিরে নীলশিখরে,
বসন্ প্রাসাদান্তে সহযবলভদ্রেণ বলিনা।
সুভদ্রামধ্যস্থঃ সকলসুরসেবাবসরদো,
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।।
"যিনি মহাসমুদ্রের তীরে স্বর্ণময় নীলশিখর-প্রাসাদে মহাবলশালী বড়ভাই বলরাম এবং ভগ্নী সুভদ্রাদেবীকে নিয়ে অবস্থান করে, সকল দেবতাদেরই সেবা করার সুযোগ প্রদান করছেন; সেই জগন্নাথদেব তুমি আমার নয়নপথে আসো।"

জগন্নাথদেবের দৃশ্যমান হাত নেই, কিন্তু তিনি সকল দ্রব্যই গ্রহণ করেন। তাঁর দৃশ্যমান পা নেই, কিন্তু তিনি সর্বত্রই বিরাজমান।তিনি জগতের আদিপুরুষ। তিনিই বিশ্বাত্মা, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তাঁর রূপ নেই, আকার নেই। তিনি চিন্তার অতীত। বাক্য মনের অতীত। তিনি অচিন্ত্য, তাই তাঁর সম্পূর্ণ বিগ্রহ তৈরি করা আদৌ সম্ভব নয়, শুধু ভক্ত আকাঙ্ক্ষায় অসম্পূর্ণ দারুব্রহ্ম প্রতীকে তিনি প্রকাশিত।জগন্নাথদেবের কৃপাঘন, গোলাকার চখা-চখা কমল নয়ন এবং অসম্পূর্ণ বিগ্রহ দেখে, আমরা না বুঝে বলে ফেলি; জগন্নাথের হাত-পা নেই, তাই সে ঠুটোঁ জগন্নাথ। কথাটি বলতে বলতে আমরা তা বাংলা প্রবাদবাক্যই বানিয়ে ফেলেছি।
জগন্নাথের প্রতি না বুঝে তুচ্ছার্থে প্রতিনিয়ত ব্যবহারও করি কথাবার্তায়।হয়ত আমরা একবার ভেবেও দেখিনি বাক্যটির অর্থ কি হতে পারে। যিনি সর্বব্যাপী পরমেশ্বর তাকেই বলছি ঠুটোঁ! বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আমাদের প্রচলিত ঠুটোঁ জগন্নাথ বাক্যের স্থানে ব্যবহার করা উচিৎ, সর্বব্যাপী জগন্নাথ। তাহলেই ভাবটি শুদ্ধ হয়, সুন্দর হয়।
শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্তী
সহকারী অধ্যাপক,সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ

একাদশীর উপবাস কি শাস্ত্রে বাধ্যতামূলক?

Ekadashi, একাদশী,একাদশী মাহাত্ম্য, একাদশী কি, ভগবান বিষ্ণু, শ্রী কৃষ্ণ, পাপপুরুষ, পঞ্চশস্য,পাপ, ইস্কন, ISKCON, probupad,প্রভুপাদ
আমাদের যত Ritual আছে সবকিছুই আমাদের শাস্ত্রের বিশেষ করে বৈদিক শাস্ত্রের কোনো না কোনো টেক্সটের মধ্যে আছে, কিন্তু এরমধ্যে একাদশীকে কোনো বৈদিক টেক্সটের মধ্যে পাইনা আমরা।বেদের মধ্যে এত গৃহসূত্র আছে, এত ধর্মসূত্র আছে, এদের মধ্যে বা বেদের কোন অংশেই একাদশী সংক্রান্ত কিছু পাওয়া যায় না।
একটা যন্ত্রকে সপ্তাহে একদিন রেস্টে (Rest) রাখতে হয়।আমাদের শরীরটা একটা জটিল যন্ত্র, যতই নিরবচ্ছিন্ন কাজ করুক এর নিয়মিত বিশ্রাম বা রেস্টের প্রয়োজন।যদি নিত্যব্যবহার্য একটা যন্ত্রের রেস্টের প্রয়োজন হয়, তাহলে শরীর নামক এ জটিল যন্ত্রটির তো অবশ্যই রেস্টের প্রয়োজন আছে।কারন আমাদের পেটের অভ্যন্তরে খাদ্য পরিপাক করে যে যন্ত্রটি তার তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, তাকে আমরা জঠরাগ্নি বলি।

পেটের অভ্যন্তরে এ জঠরাগ্নির প্রচণ্ড তাপ খাদ্যকে পরিপাক করে। এটা এমন একটা মেশিন, যে মেশিনে খাদ্য দেওয়া মাত্র পরিপাক করে প্রয়োজনীয় অংশ রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে পৌঁছে দেয়। তাই নিরবচ্ছিন্ন খেটে মরা এই দেহযন্ত্রটিকে সপ্তাহে অন্ততপক্ষে একদিন রেস্ট দেওয়া উচিত।

সপ্তাহে যদি না পারি, তাহলে ১৫ দিনে অন্ততপক্ষে বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে পারি।১৫ দিন অন্তর যদি না খেয়ে জঠরাগ্নিকে বিশ্রাম দেয়া হয়, তবে তা শরীরের জন্য ভাল।কিন্তু একাদশীর উপবাসের নামে পেটভরে খেয়েদেয়ে বর্তমানে যা হচ্ছে এটাকে আমি একাদশী বলব নাকি পেটাদশী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। একাদশী দিনে অনেককেই দেখি যে, উপবাসের নামে গাজরের হালুয়া, গাজরের মিষ্টান্ন, সাগুর মিষ্টান্ন, প্লেটে প্লেটে সব্জি সহ নিরবচ্ছিন্ন অমুক-সমুক দিনভর খেয়েই যাচ্ছে।

এদের কাণ্ডে মনে হয়, এটা কি উপবাস না উপবাসের নামে প্রহসন। নিজের প্রতিই নিজের প্রশ্ন আসে।
একঝুড়ি ফল এটা সেটা খেয়ে বলে,"না না শরীরটা আজকে ঠিক ভাল না,আজকে একাদশী আছি!"তো আমি আপনাদের বলব,একাদশী আপনি করেন,অবশ্যই করেন।কিন্তু,একাদশী নিয়ে বিভিন্ন অর্বাচীন পুরাণে যে কাহিনীগুলি আছে এ কাহিনীগুলো মোটেই মানা সম্ভব না।একাদশীর কথা আছে পদ্মপুরাণে। আমাদের হিন্দুদের মধ্যে দুইটা পুরাণ পদ্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ একেবারে আজগুবি কাহিনী দিয়ে ভর্তি, বিষয়টি একজন সংস্কৃতের স্টুডেন্ট মাত্রই জানেন।

এই পুরাণদুটি প্রায় ভোগাস, যা পরবর্তীকালের বাংলার কোনো পণ্ডিতদের দ্বারা লিখিত।অনেকে বলেছেন নবদ্বীপ বা তত্র এলাকার কোন পণ্ডিতদের লেখা।
ব্রহ্মবৈবতপুরাণ এবং পদ্মপুরাণ,এ দুইটা পুরাণের মধ্যে প্রচুর বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব দেখা যায় ।দুটোর মধ্যে বারেবারেই কাঁচি চালানো হয়েছে এটা যেকোন পুরাণ গবেষক ব্যক্তিমাত্রই জানে।পদ্মপুরাণের মধ্যে যে কাহিনীটি আছে একাদশী সম্পর্কে, তার উপরে ভিত্তি করে একটি সংগঠন থেকে "একাদশী মাহাত্ম্য" নামে একটা বই ছাপানো রয়েছে।সেই বইটা পড়লে পরে আপনার মনে আতঙ্ক বাসা বাঁধবে। সেখানে লেখা আছে প্রতি ১৫ দিন পরপর একাদশীর দিনে পৃথিবীর সকল পাপ অন্নের মধ্যে প্রবেশ করে, পঞ্চশষ্যের মধ্যে প্রবেশ করে, তাই সেদিন অন্ন খাওয়া যাবে না। এখানে অন্ন বলতে তারা শুধু পঞ্চশস্যকেই বুঝছে।

বেদের মধ্যে বিশেষ করে বেদমন্ত্রের মধ্যে আছে যে, অন্নকে কখনো নিন্দা করবে না,অন্নকে কখনো অতিক্রম করবে না।"অন্নং ব্রহ্ম" অর্থাৎ অন্নকে ব্রহ্মস্বরূপ বলা হচ্ছে। যেই অন্নকে বেদে ব্রহ্ম বলা আছে,যেই অন্নকে নিন্দা করতে নিষেধ করা আছে, যেই অন্ন কখনো অশুদ্ধ হয় না; তাহলে আমি কি করে মানতে পারি যে প্রতি ১৫ দিন পরপর সকল পাপ এই অন্নের মধ্যে, এই পঞ্চশষ্যের মধ্যে এসে প্রবেশ করে? এ অযৌক্তিক কথাগুলো কি অন্নরূপ ব্রহ্মের নিন্দা নয়?

যা খেয়ে প্রত্যেকটি জীব বেঁচে থাকে তাকেই অন্ন বলে।এ অন্নতেই আমরা বেঁচে থাকি, সকল জীব বেঁচে থাকে। তাই আমাদের দেহকে বলা হয় অন্নময় কোষ। বর্তমানে অন্ন বলতে যা বোঝানো হচ্ছে সেখানেই রয়েছে একটা বড় ধরনের ঘাপলা।বর্তমানে অন্নপাপ অন্নপাপ বলতে বলতে যাদের জীবন যাচ্ছে, তারা অন্ন বলতে শুধু ভাতকেই বোঝাচ্ছে। কিন্তু আমাদের শাস্ত্রে, বেদান্তে অন্ন বলতে চার প্রকার খাদ্যকে বোঝানো হয়েছে।এই চার প্রকার অন্ন হচ্ছে:
১.চর্ব্য- যা চিবিয়ে চিবিয়ে খাওয়া হয়; ভাল, রুটি সহ অধিকাংশ খাবার।
২.চোষ্য- যা চুষে চুষে খেতে হয়; শিশু এবং বৃদ্ধদের উপযোগী বিভিন্ন খাবার।
৩.লেহ্য- যা চেটে চেটে খেতে হয়; চাটনি জাতীয় বিভিন্ন খাবার।
৪.পেয়- যা পান করা হয়; দুধ, জল, চা ইত্যাদি।
বেদান্ত দর্শনের স্মৃতি প্রস্থানের হিরন্ময় গ্রন্থ শ্রীমদভগবদগীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের ১৪ নং শ্লোকে উল্লেখ্য এ চারপ্রকার অন্নের কথা অত্যন্ত সুন্দর করে বলা আছে।
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ।
প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্।।
"অামিই প্রাণিগণের উদরে বৈশ্বানর অগ্নিরূপে স্থিত হয়ে প্রাণ ও অপান বায়ুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, এবং পেয় এ চতুর্বিধ অন্নকে পরিপাক করি।

জগতের সকল খাদ্যই এ চার প্রকার অন্নের মধ্যে পরে। অন্নে যদি প্রতি ১৫ দিন পরপর একাদশীর দিনে পাপ প্রবেশ করে, তাহলে তো একগ্লাস জলও খাওয়া যাবে না; কারণ গীতা বা বেদান্তের ভাষ্যানুসারে জলও চতুর্বিধ অন্নের মধ্যে পেয়রূপ অন্ন। জলের মধ্যেও পাপ প্রবেশ করবে। তাই আপনি পদ্মপুরাণ এবং নব বৈষ্ণবদের ভাষ্যানুসারে সেদিন জলও পান করতে পারবেন না। একাদশী করবেন, করুন; কিন্তু, মানুষকে ভয় দেখাবেন না। একাদশীর উপবাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শারীরিক দিক দিয়ে, কিন্তু তা বৈদিক শাস্ত্রে বাধ্যতামূলক নয়। এ কথাটিই আমি মূলত বলিতে চেয়েছি।

একাদশীর নামে পেটভরে খেয়েদেয়ে পেটাদশী থাকার দরকার নাই।অন্তত ১৫ দিনে একদিন শরীরের জঠরাগ্নি যন্ত্রটারে বিশ্রামে রাখুন, ভালো থাকতে পারবেন। সুস্থ থাকতে পারবেন।কিন্তু উপবাসের নামে পেট ভরে খেয়ে এই একাদশী ব্রতকে লোকদেখানো উৎসবে রূপান্তরিত করা এটা একটা নিছক মূর্খতা। পূর্ববর্তী বৈষ্ণব মহাজনেরা এভাবে খেয়েদেয়ে একাদশী পালন করেননি। তাঁরা ছিলেন দৈন্যতার মূর্ত প্রতীক।
শ্রীমদ্ভাগবতপুরাণ এবং বিষ্ণুপুরাণ হল বৈষ্ণব মতের প্রধান অবলম্বন। এ দুটি পুরাণের উপরে ভিত্তি করেই বৈষ্ণব মত প্রচারিত এবং সম্প্রসারিত। এ দুটি পুরাণের কোথাও একদশীর দিনে অন্নের মধ্যে পাপ প্রবেশ করে জাতীয় অলীক ভয় দেখানো কাহিনী নেই। এ কাহিনীটি আছে পদ্মপুরাণে এবং কিছু আছে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে। দুটি পুরাণই অর্বাচীনকালের, দুটিগ্রন্থের মধ্যে প্রচুর শ্লোক প্রক্ষিপ্ত হয়ে মূল অংশটিই প্রায় হারিয়ে গেছে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ একজন সচেতন হিন্দুর কখনই মানা সম্ভব না, কারণ এ গ্রন্থটির প্রকৃতিখণ্ডে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্কে অনেক কদর্য কথা বলা আছে এবং প্রচুর পরস্পরবিরোধিতা আছে।
বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, উপবাস অর্থাৎ নিকটে বাস,কার নিকটে বাস? ব্রহ্মের নিকটে বাস।মেডিক্যাল সাইন্সে এ উপবাসকেই বলে 'অটোফেজি’ ( অবশ্য বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে)। ২০১৬ সালে নোবেল কমিটি জাপানের ডাক্তার ‘ওশিনরি ওসুমি’-কে উপবাস বা অটোফেজি আবিষ্কারের জন্যে নোবেল পুরষ্কারে পুরষ্কৃত করে।
একাদশী অবৈদিক প্রথা হলেও, এটাকে বাদ দেয়া অপ্রয়োজনীয়, কারণ সমাজে প্রথাটি জনপ্রিয়। আমরা এই প্রথাটি থেকে শুধু ভয় দেখানো অংশটি এবং উপবাসের নামে ভরপেট খাওয়া অংশটি বাদ দিতে পারি।একাদশী তিথিতে ভগবানের দিব্য নাম জপ, কীর্তন, ধ্যান ইত্যাদি পারমার্থিক কাজে সারাদিন অতিবাহিত করুন।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছুই না খেয়ে, দিনব্যাপী নির্জলা উপবাস থেকে ; যদি নির্জলা সম্ভব না হয় তবে সামান্য জল খেয়ে সন্ধ্যার পরে ফলমূল সহ সামান্য খাবার খেয়ে একাদশী ব্রত পালন করুন।এতে স্বাস্থ্য ভাল থাকবে, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, সহসাই শরীরে কোন রোগ-ব্যাধি আক্রমণ করতে পারে না। এবং শরীরের সাথে সাথে আপনার মন সহ অন্তঃকরণও প্রফুল্লতা পাবে।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্তী
সহকারী অধ্যাপক,সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ

ধর্ম নির্ণয়ে বেদই একমাত্র প্রমাণ; পুরাণ এবং স্মৃতি সহায়ক মাত্র

ধর্ম নির্ণয়ে বেদই একমাত্র প্রমাণ; পুরাণ এবং স্মৃতি সহায়ক মাত্র


বর্তমানে সনাতন ধর্মাবলম্বী কিছু ব্যক্তি প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদকে পাশ কাটিয়ে শুধু পৌরাণিক গ্রন্থ অথবা বিভিন্ন বাবাগুরুদের লেখা ছড়ার বই, গানের বই, পাঁচালী, কথোপকথনের বই এবং চিঠিপত্রাদি সংকলনগ্রন্থকে যারযার ব্যক্তিগত বা সম্প্রদায়ের গুরুবাদী বিশ্বাস থেকে প্রধান ধর্মীয়গ্রন্থ মনে করেন। তারা নিজেরাও জানেন না যে, এ কাজের মাধ্যমে ধীরেধীরে তারা অজ্ঞাতসারে অজ্ঞানতার অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন । বেদবিদ্যা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় তাদের জ্ঞানের দরজা তালাবন্ধ জড়তাগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে।



বেদের পরে রামায়ণ, মহাভারত এবং অষ্টাদশ পুরাণ এবং অষ্টাদশ উপপুরাণ আমাদের ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু এ গ্রন্থগুলির একটিও প্রধান ধর্মগ্রন্থ নয়। বেদই আমাদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। পুরাণগুলিকে আমাদের গ্রহণ বর্জনের মাধ্যমেই গ্রহণ করতে হবে। পুরাণে যেমন অনেক অসাধারণ অসাধারণ কথা আছে, তেমনি কিছু কিছু স্থানে বালখিল্য কথাও আছে। আবার পুরাণের সামান্য দুইএকটা বালখিল্য অসার উদাহরণ দেখিয়ে কিছুকিছু তার্কিক বিশেষ করে দয়ানন্দ সরস্বতীর অনুগামীরা সকল পুরাণকেই বাদ দেয়ার ধৃষ্টতা করেন।

পুরাণের জগতে ভাগবত, মার্কণ্ডেয়, ব্রহ্ম, বিষ্ণু, অগ্নি, শিব, স্কন্ধ এই অসাধারণ পুরাণগুলি যেমন আছে, তেমনি ব্রহ্মবৈবর্ত, পদ্ম, ভবিষ্য এই পুরাণগুলিও আছে। ব্রহ্মবৈবর্ত, পদ্ম, ভবিষ্য সহ এমন আরো কিছু পুরাণ আছে, যেগুলি পড়লে সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় এই পুরাণগুলিতে বিভিন্ন সময়ে কিছু সাম্প্রদায়িক স্বার্থান্বেষী এবং তুর্কিশাসকদের সময়ে হাতের কাটাছেড়া হয়েছে। কাটাছেড়া হওয়ার পরেও, এ পুরাণগুলি সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে রাজহংস যেমন দুধেজলে মিশানো থাকলে



শুধুমাত্র জলের অংশকে পরিত্যাগ করে দুধটুকুই গ্রহণ করে; রাজহংসের মতো আমাদেরও পুরাণগুলি থেকে প্রয়োজনীয় সকল সারবস্তুগুলি নিয়ে অসার বস্তুগুলি পরিত্যাগ করতে হবে। একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না, ভারতবর্ষীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি পূর্ণতা পেয়েছে পুরাণগ্রন্থে। বৈদিক জ্ঞানই সাধারণের উপযোগী করে গল্পের ছলে পৌরাণিক কথাকাহিনীতে বোঝানো হয়েছে। তাই পুরাণ বর্ণাঢ্য হিন্দু সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
ইদানিং কিছু ভাগবত পাঠকেরা বিভিন্ন স্থানে ভাগবত পাঠ করতে এসে অযাচিতভাবে বলে, কলিযুগে বেদ নিষিদ্ধ। আমি ঠিক জানিনা, তারা এই কথাগুলি বুঝে বলে, নাকি নাবুঝে বলে? সেই সকল পণ্ডিতম্মন্য ব্যক্তিদের একটু শ্রীমদ্ভাগবতে বেদ সম্পর্কে কি কি বলা আছে তা একটু পড়ে দেখার অনুরোধ রইল:
"যে ব্যক্তি অকারণে বেদাচার ছেড়ে অনাচারে প্রবৃত্ত হয়, যমদূতেরা তাকে অসিপত্রবন নরকে নিয়ে গিয়ে কশা (চাবুক) দিয়ে মারতে থাকে। মার খেয়ে ছুটে পালাতে গেলে দুপাশে তালবনের অসিপত্রে ( তলোয়ারের মতো ধারাল পাতায়) সেই পাপির সর্বাঙ্গ ছিন্নভিন্ন হয় ; আর সে 'হা হতো অস্মি' ( আমি মরলাম) বলে দারুণ যন্ত্রণায় পদে পদে জ্ঞান হারায়। স্বধর্ম ত্যাগ করলে এমন শাস্তিই ভোগ করতে হয়।"
(শ্রীমদ্ভাগবত: ৫ম স্কন্ধ, ছাব্বিশ অধ্যায়)


"বেদে যা কর্তব্য বলে বলা আছে একমাত্র তাই ধর্ম, এর বিপরীত যা অর্থাৎ বেদে যা নিষিদ্ধ তা সকলই অধর্ম। বেদ সাক্ষাৎ নারায়ণের নিঃশ্বাস থেকে স্বয়ং উদ্ভূত হয়েছে, তাই বেদ সাক্ষাৎ নারায়ণ এবং স্বয়ম্ভু।"
(শ্রীমদ্ভাগবত : ৬ষ্ঠ স্কন্ধ, প্রথম অধ্যায়)
সামবেদীয় ছান্দোগ্য উপনিষদে নারদ সনৎকুমার সংবাদে (০৭.০১.০২) ইতিহাস পুরাণকে পঞ্চম বেদ বলা হয়েছে। মহাভারতকে ইতিহাস গ্রন্থ বলা হয়, তাই মহাভারতে মহাভারত নিজেকে পঞ্চমবেদ বলে পরিচয় দিয়েছে। শুধু মহাভারত এবং পুরাণই নয়, ভরতের নাট্যশাস্ত্রকেও পঞ্চম বেদ বলা হয়। বেদের বাইরে কাহিনী সর্বস্ব এ পঞ্চমবেদের দাবিদার অনেক গ্রন্থই।
বেদ গবেষক দয়ানন্দ সরস্বতী সহ অনেকেই পুরাণ বলতে বেদের ব্রাহ্মণ অংশকেই চিহ্নিত করেছেন। কারণ সেখানে মনুমৎস্য কথা সহ অসংখ্য শিক্ষামূলক গল্প আছে। তবে দয়ানন্দ সরস্বতীর মতবাদ বাদ দিলে, অধিকাংশ পণ্ডিতই পুরাণ বলতে ব্যাসদেব রচিত অষ্টাদশ পুরাণকেই বোঝে। এ অষ্টাদশ পুরাণের সাথে আছে আরো অষ্টাদশ উপপুরাণ। আপাতদৃষ্টিতে পুরাণের সংখ্যা (১৮+১৮) = ৩৬ টি হলেও, বর্তমানে পুরাণ নামে গ্রন্থ পাওয়া যায় ৩৬ সংখ্যাটির দ্বিগুণেরও বেশী।


এ পুরাণের অনেকগুলোই পরস্পর বিরোধী ভাব দ্বারা পূর্ণ। তাই লেখাগুলি একজনের লেখা কিনা, এটা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ। বিষ্ণুপুরাণে এবং দেবী ভাগবতে বিভিন্নকালে ২৮ জন পুরাণ রচয়িতা ব্যাসের কথা আছে। এ পুরাণগুলির মধ্যে পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ সহ কয়েকটির বঙ্গ সংস্করণের সাথে দক্ষিণ ভারত, উত্তর ভারতের সংস্করণ মেলে না। শ্লোক পর্যন্ত মেলে না।
পঞ্চদশ ষোড়শ শতাব্দীর বিখ্যাত স্মৃতিশাস্ত্রকাররা তাদের স্মৃতির বচনে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ থেকে যে সকল শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন এর অধিকাংশই বর্তমান গ্রন্থে নেই। উদাহরণ হিসেবে স্মৃতিচন্দ্রিকা গ্রন্থের কথা বলা যায়। এ গ্রন্থটি সহ তৎকালীন স্মৃতি নিবন্ধকারগণ তাদের গ্রন্থে প্রায় ১৫০০ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন।
কিন্তু নিবন্ধকারদের সে ১৫০০ শ্লোক থেকে বর্তমানে প্রাপ্ত ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে মাত্র ৩০ টি শ্লোক পাওয়া যায়। এতেই সুস্পষ্টভাবে বোঝা যায় গ্রন্থটির প্রাচীনরূপ এবং বর্তমান রূপের বিস্তর পার্থক্য। দক্ষিণভারতে গ্রন্থটির নাম পর্যন্ত আলাদা,সেখানে নাম ব্রহ্মকৈবর্তপুরাণ।
বিভিন্ন কালের প্রভাবে এবং বিদেশি শাসনে এ গ্রন্থগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই প্রবেশ করেছে। এ গ্রন্থগুলি ছিল হাতে লেখা পুঁথি। তাই লিপিকরদের দ্বারা সহজেই অনেক প্রক্ষেপণ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তাই মাঝেমধ্যেই শ্রুতি, স্মৃতি এবং পুরাণের বাক্যে বিরোধ দেখা যায়।
বিভিন্ন কারণে বেদ স্মৃতি এবং পুরাণের মধ্যে যদি আপাত কোন বাক্যে বিরোধ দেখা যায়। তবে এর সমাধানকল্পে শ্রীকৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাঁর রচিত ব্যাস সংহিতায় বলেছেন। তিনি বলেছেন, সকল শাস্ত্রের বিরোধে একমাত্র বেদবাক্যই মান্য।

শ্রুতিস্মৃতিপুরাণানাং বিরোধো যত্র দৃশ্যতে।
তত্র শ্রৌতং প্রমাণন্তু তয়োর্দ্বৈধে স্মৃতির্ব্বরা।।
( ব্যাস সংহিতা : অধ্যায়-১, শ্লোক-৪)
"শ্রুতি, স্মৃতি এবং পুরাণের মধ্যে যদি বিরোধ দেখা যায়, তবে শ্রুতি বা বেদের বাক্যটিই প্রমাণ এবং যেখানে স্মৃতি ও পুরাণের মধ্যে বিরোধ দেখা যায়, সেখানে স্মৃতির বিধানই মান্য।"

বিষয়টি সুন্দর একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যায়। যেমন বেদের মধ্যে বলা আছে, অন্নই ব্রহ্ম। বেদের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে তৈত্তিরীয় উপনিষদে সুস্পষ্টভাবে বিষয়টি আছে। সেখানে বলা আছে।

অন্নং ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। অন্নাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে। অন্নেন জাতানি জীবন্তি।
(তৈত্তিরীয় উপনিষদ, ভৃগুবল্লী, দ্বিতীয় অনুবাক)

"অন্নই ব্রহ্ম। অন্ন থেকেই সকল প্রাণীর উৎপত্তি এবং অন্নতেই সবাই বেঁচে থাকে।"

অন্নং ন পরিচক্ষীত। তদ্ ব্রতম্। আপো বা অন্নম্।
(তৈত্তিরীয় উপনিষদ, ভৃগুবল্লী, অষ্টম অনুবাক)
"অন্নের অবহেলা করবে না, পরিত্যাগ করবে না এটাই ব্রত। জলই অন্ন।"

অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্ঠম্। তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে। সবং বৈ তে অন্নমাপ্নুবন্তি যে অন্নং ব্রহ্মোপাসতে।
অন্নং হি ভূতানাং জ্যেষ্ঠম্। তস্মাৎ সর্বৌষধমুচ্যতে।
অন্নাদ্ভূতানি জায়ন্তে। জাতান্যন্নেন বর্ধন্তে
(তৈত্তিরীয় উপনিষদ:ব্রহ্মানন্দবল্লী, দ্বিতীয় অনুবাক)

"অন্ন সমস্ত জীবের জ্যেষ্ঠ। তাই তাকে সর্ব ঔষধরূপ বলা হয়। অন্নকে ব্রহ্মভাবে যারা উপাসনা করেন, তারা অবশ্যই অন্নরূপ ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হন।অন্নতেই জগতের সকল জীব জন্মগ্রহণ করে এবং অন্নতেই বর্ধিত হয়।"



অন্নকে ব্রহ্ম বলে, অন্নতেই সকল প্রাণী জীবিত থাকে, তাই অন্নের নিন্দা করতে নিষেধ করা হয়েছে মন্ত্রগুলিতে। অন্নকে পরিত্যাগ করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং অন্নের উপাসনা করতে বলা হয়েছে। কারণ অন্নতেই জগতের জীব জন্মগ্রহণ করে এবং অন্নতেই বর্ধিত হয়।
বৈদিক অন্ন সংক্রান্ত এ নির্দেশনা থাকার পরেও আমাদের কয়েকটি পুরাণে বিশেষ করে পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে প্রতি ১৫ দিনে একাদশীর দিনে পাপ সকল অন্নে বা খাদ্যে প্রবেশ করে। পুরাণকার এ কথাগুলো বলে, পাপপুরুষের একটি কাহিনী বর্ণনা করেছেন। পদ্মপুরাণের কাহিনীটি হয়ত নেই, কিন্তু এ ধরণের বাক্য আমরা স্কন্ধ পুরাণেও দেখি।স্কন্দ পুরাণ মহাভারতের মত বৃহৎ একটি গ্রন্থ। এটি একটি বৃহত্তম পুরাণ।
এতে সারা ভারতবর্ষের তীর্থক্ষেত্রের মাহাত্ম্য বর্ণিত আছে। দুইএকটা ব্যতিক্রমী শ্লোককে বাদ দিলে এ পুরাণটি অসাধারণ। এ পুরাণটিকে পবিত্র তীর্থ সমুহের পূর্ণাঙ্গ একটি কোষগ্রন্থ বলা চলে। পুরাণটির বিষ্ণুখণ্ডে একাদশী প্রসঙ্গে বলা আছে-
যানি কানি চ পাপানি ব্রহ্মহত্যাদিকানি চ।।
অন্নমাশ্রিত্য তিষ্ঠন্তি সম্প্রাপ্তে হরিবাসরে।
স কেবলমঘং ভুঙেক্ত যো ভুঙেক্ত হরিবাসরে।।
(স্কন্দ পুরাণ, বিষ্ণুখণ্ড, কার্তিকমাসমাহাত্ম্য,
অধ্যায় ৩৩, শ্লোক ৩২-৩৩)


"ব্রহ্মহত্যাদি যত পাপ আছে তা সকলই একাদশীর দিনে অন্নে আশ্রয় করে। সেদিন যারা অন্ন ভোজন করে তারা কেবল পাপই ভোজন করে।"
বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত একাদশী একটি শাস্ত্রীয় ব্রত। উপবাসই এর মুখ্যকর্ম। কিন্তু একাদশীকে কেন্দ্র করে এ পাপপুরুষের কাহিনী এবং তৎসংশ্লিষ্ট বাক্যগুলো প্রথমে শ্রুতি বাক্যকে লঙ্ঘন করেছে। এরপরে স্মৃতি প্রস্থান শ্রীমদ্ভগবদগীতাকে লঙ্ঘন করেছে। বেদে যেহেতু অন্নের নিন্দা করতে নিষেধ করা হয়েছে, অন্ন ব্রহ্মস্বরূপ। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ, পদ্মপুরাণের পাপ প্রবেশের কথা বলে শ্রুতির বাক্যের অবহেলা করেছে। শ্রুতি এবং পুরাণের এ দুইপ্রকার বাক্য একসাথে গ্রহণ করা আমাদের সম্ভব নয়। কারণ, বাক্য দুটি বিপরীতধর্মী। বাক্যটি স্মৃতিকেও লঙ্ঘন করেছে, কারণ শ্রীমদ্ভগবদগীতাতে জগতের সকল খাদ্যকেই চারপ্রকার অন্ন বলা হয়েছে।
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ।
প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্।।
( গীতা:১৫. ১৪)
"অামিই প্রাণিগণের উদরে বৈশ্বানর অগ্নিরূপে স্থিত হয়ে প্রাণ ও অপান বায়ুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, এবং পেয় এ চতুর্বিধ অন্নকে পরিপাক করি।"
জগতের সকল খাদ্যই এ চার প্রকার অন্নের মধ্যে পরে। অন্নে যদি প্রতি ১৫ দিন পরপর একাদশীর দিনে পাপ প্রবেশ করে, তাহলে একগ্লাস জলও খাওয়া যাবে না; কারণ গীতা বা বেদান্তের ভাষ্যানুসারে জলও চতুর্বিধ অন্নের মধ্যে পেয়রূপ অন্ন। জলের মধ্যেও পাপ প্রবেশ করবে। তাই ব্রহ্মবৈবর্ত, পদ্মপুরাণ, স্কন্দ পুরাণ অনুসারে সেদিন জলও পান করা যাবে না। সেক্ষেত্রে অন্ন বলতে উল্লেখ পুরাণগুলি জগতের সকল খাদ্যকে না বুঝিয়ে ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, সরিষা এ পঞ্চ রবিশস্যকে বুঝিয়েছে। এতেই গীতার সাথে বিরোধ হয়েছে। কিন্তু ব্যাসদেব বলেছেন, শ্রুতি, স্মৃতি এবং পুরাণের মধ্যে যদি বিরোধ দেখা গেলে শ্রুতি বাক্যটিই প্রমাণ। এরপরে স্মৃতি ও পুরাণের মধ্যে বিরোধে স্মৃতিই বিধানই প্রমাণ ।


আমরা স্বাভাবিক সেন্সেও বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবতে পারি, এই যে অন্নে প্রতি একাদশীর দিনে পাপপুরুষ প্রবেশ করে এই পাপ পৃথিবীর কোথা থেকে প্রবেশ শুরু করে? যদি আমাদের অপর গোলার্ধে আমেরিকার দিনেরবেলা প্রবেশ করে, তবে সময়টি আমাদের রাত্রিবেলা হয়ে যাবে; আর ভারতবর্ষের দিনেরবেলা প্রবেশ করলে আমেরিকার রাত্রিকাল হবে।পাপপুরুষ কতক্ষণ খাদ্যে থাকবেন, সুর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত, নাকি অষ্টপ্রহর ২৪ ঘন্টা? তিনি কি একজন না বহু? তিনি কি শুধু মানুষের খাবারেই প্রবেশ করে, নাকি মনুষ্যেতর জীবজন্তুর খাবারেও প্রবেশ করে? বিষয়গুলি উল্লেখ্য পুরাণগুলোতে ক্লিয়ার না।
শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত নির্ণয় সম্পর্কে গৌড়ীয় বৈষ্ণবদের প্রাণপুরুষ শ্রীচৈতন্যদেব বলেছেন,
প্রমাণের মধ্যে শ্রুতি প্রমাণ প্রধান।
শ্রুতি যেই অর্থ কহে সেই সে প্রমাণ।।
প্রণব সে মহাবাক্য ঈশ্বরের মূর্ত্তি।
প্রণব হইতে সর্ব্ববেদ জগৎ উৎপত্তি।।
(চৈতন্যচরিতামৃত : মধ্যলীলা, ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ)
অখিল ধর্মের মূল বেদই সনাতন ধর্মের মূল এবং বেদের উপরেই সনাতন ধর্ম ও সভ্যতা সংস্থাপিত। তাই সকল প্রকার শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত নির্ণয়ে বেদবাণীই যে একমাত্র প্রমাণ- এ শিক্ষা শ্রীচৈতন্যদেবই আমাদের দিয়েছেন। এবং যুগপৎ দেখিয়েছেন ওঙ্কার (ওঁ) এ মহাবাক্যই ঈশ্বরের মূর্তিস্বরূপ। সেই ওঙ্কার হতেই সকল বৈদিক জ্ঞান এবং জগতের উৎপত্তি।
এ জাজ্বল্যমান রেফারেন্স দেখেও কিছু লোক না বুঝে কলিযুগে বেদ নিষিদ্ধ, পুরাণই সব -এ জাতীয় আকডুম, বাকডুম বকে যাচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের প্রশ্ন, ভাই কলিযুগে যে বেদ নিষিদ্ধ এটা কি বেদে কোথাও ভগবান বলেছেন যে, আমার এ বৈদিক জ্ঞানটি সত্য, ত্রেতা এবং দ্বাপর যুগের জন্যে ; কলিযুগে তোমরা শুধুমাত্র তোমাদের যারযার কানে ফুশমন্ত্র দেয়া বাবা-গুরুদের গ্রন্থই একমাত্র পড়বে। পুরাণগুলিই পড়বে।না ভগবান এমন কথা বলেননি। তাহলে কলিযুগে বেদ নিষিদ্ধের কথাগুলি কোথায় আছে? আছে বিভিন্ন মানুষপূজারী বাবা,গুরু, তথাকথিত অবতার, ধর্মব্যবসায়ী এবং কিছু পেশাজীবী গীতা-ভাগবত পাঠকদের কথাবার্তা ও গ্রন্থে।


সনাতন ধর্ম একটি সুসংবদ্ধ ধর্ম। বেদের উপরেই এ ধর্মটি স্থাপিত। আপাতদৃষ্টিতে মত-পথের বিভিন্ন অলিগলি দেখে, হঠাৎ বিশৃঙ্খল মনে হয়। অনেকেই না বুঝে বিভ্রান্ত হয়ে যায়। ধৈর্য ধরে একটু চিন্তার অলিগলি পারি দিলেই পাওয়া যায় হিরন্ময় বৈদিক রাজপ্রাসাদ। নাটক-যাত্রাপালার কৃত্রিম রাজপ্রাসাদ দেখে মানুষ সাময়িক মুগ্ধ হলেও, তা ক্ষণস্থায়ী। এতে বসবাস করা যায় না।
শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ

ব্রহ্মবাদিনী গার্গী | বৈদিকযুগে নারী-পুরুষ সাম্যতার উজ্জল দৃষ্টান্ত

ব্রহ্মবাদিনী গার্গী | বৈদিকযুগে নারী-পুরুষ সাম্যতার উজ্জল দৃষ্টান্ত
প্রতীকী ছবি


বিদেহরাজ জনক রাজার সভাগৃহে আজ তিল ধারণের জায়গা নেই।। রাজা বহুদক্ষিণা যজ্ঞ শেষে আজ ব্রাহ্মণদের দান করবেন। কুরু-পাঞ্চালের সমস্ত বিদ্বান জ্ঞানীগুণী ব্রাহ্মণরা এখানে সমবেত। আজকের সেরা দান দশ দশ পাদ সোনা দিয়ে বাঁধানো শিং-ওয়ালা এক হাজার উত্তম গরু। রাজা ঘোষণা করলেন, ব্রাহ্মণা ভগবন্তো যো বো ব্রহ্মিষ্ঠঃ স এতা উদজাতামিতি - উপস্থিত ব্রাহ্মণদের মধ্যে যিনি সম্পূর্ণ ব্রহ্মজ্ঞানী, তিনি নিয়ে যান এই গরুগুলি।

ব্রাহ্মণগণ সকলে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছেন। কে নিজেকে ব্রহ্মিষ্ঠ বলে দাবী করবেন? কে নিয়ে যাবেন এই দক্ষিণা।

এমন সময় উঠে দাঁড়ালেন ব্রহ্মতেজদীপ্ত এক ঋষি। শান্ত গলায়, তাঁর প্রিয় শিষ্যকে বললেন, সৌম্য সামশ্রবঃ, আমার আশ্রমে নিয়ে যাও এই গরুগুলি। হিমালয়ের মতো আত্মবিশ্বাস, কিন্তু কণ্ঠস্বরে কি আশ্চর্য প্রশান্তি! রাজার কাছে কোনো প্রার্থনা, অনুমতি বা উপস্থিত ব্রাহ্মণগণকে তর্কযুদ্ধে আহ্বান, এসব কিছুই নয়। সোজা শিষ্যকে বললেন, গরুগুলি আশ্রমে নিয়ে যাও। ব্রাহ্মণগণ রেগে উঠলেন, যাজ্ঞবল্ক্য, আপনি কি নিজেকে শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিদ মনে করেন। যাজ্ঞবল্ক্য হেসে সরস উত্তর দিলেন, নমঃ বয়ং ব্রহ্মিষ্ঠায় কুর্মো, গোকামা এব বয়ং স্মঃ ইতি – বাপুরা, ব্রহ্মিষ্ঠকে নমস্কার করি, কিন্তু এই গরুগুলি আমার বিশেষ প্রয়োজন।


 কিন্তু বামুনের দল এই রসিকতায় মজলেন না। তাঁরা এত সহজে এতগুলি সোনা বাঁধানো শিংওয়ালা গরু ছেড়ে দেবেন! শুরু হল কঠিন প্রশ্নোত্তরের পালা। প্রথমে ঋষি অশ্বল প্রশ্ন করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য সমস্ত কিছুই যখন মৃত্যুর অধীন, তাহলে মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তির উপায় কি? যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন হোতা নামক ঋত্বিক, অগ্নি ও বাক্য দ্বারা, কারণ বাক্যই যজ্ঞের হোতা, বাক্যই অগ্নি, বাক্যই মুক্তির উপায়।

প্রশ্নোত্তর চলতে লাগল। অশ্বলের পর আর্তভাগ, ভুজ্যু, উষস্ত, কহোল প্রভৃতি একের পর এক ঋষিরা কঠিন কঠিন সব প্রশ্ন করতে লাগলেন যাজ্ঞবল্ক্যকে এবং যাজ্ঞবল্ক্যও অনায়াসে সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিয়ে চললেন ও প্রশ্নকর্তাদের মুখগুলি একের পর এক ম্লান হয়ে যেতে লাগল।
এবার প্রশ্নকর্তা একজন নতুন মানুষ। সকলে তাঁকে চেনেন, তাঁর অসামান্য ধীশক্তির জন্য। তিনি প্রশ্ন করলেন, ঋষিবর, আমাকে বলুন, যদি সবকিছু জলে ওতপ্রোতভাবে অধিষ্ঠিত আছে, তাহলে এই জল কিসে অধিষ্ঠিত?

ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য চেয়ে দেখলেন প্রশ্নকর্তাকে। তেজদীপ্ত ব্রহ্মবাদিনী এক মহিলা, বচক্লুর কন্যা গার্গী বাচক্লবী। উত্তর দিলেন,
- হে গার্গি, বায়ুতে
- বায়ু কিসে ওতপ্রোত?       - অন্তরীক্ষলোকে।       - অন্তরীক্ষলোক কিসে ওতপ্রোত?       - গন্ধর্বলোকে।



এইভাবে বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে, গন্ধর্বলোক, আদিত্যলোক, চন্দ্রলোক, দেবলোক সমস্ত কিছু পেরিয়ে ব্রহ্মলোক। গার্গী প্রশ্ন করলেন, ব্রহ্মলোক পেরিয়ে কোন লোক?



যাজ্ঞবল্ক্য থমকে গেলেন। তাঁর বিজয়রথ প্রথম বারের মতো গতিহীন হল। সত্যিই তো ব্রহ্মলোক কিসে অধিষ্ঠিত? এমন প্রশ্ন তো কেউ করে নি! কিন্তু হেরে গেলে তো চলবে না। সভাশুদ্ধু আর কেউ বুঝুক বা না বুঝুক ব্রহ্মবাদিনী গার্গী বুঝেছেন যাজ্ঞবল্ক্যর অবস্থা। মরিয়া হয়ে যাজ্ঞবল্ক্য উত্তর দিলেন, মা অতিপ্রাক্ষীঃ - অতিরিক্ত প্রশ্ন কোরো না গার্গী। যে দেবতাদের বিষয়ে বেশী প্রশ্ন করা উচিত নয় তুমি সেই বিষয়ে অতিপ্রশ্ন করছ। যাজ্ঞবল্ক্য সোজাসুজি সাবধানবাণী শোনালেন, আর প্রশ্ন করলে তোমার মাথা খসে পড়বে, গার্গী।


সেই যুগের অনেক মহিলা বেদজ্ঞ হতেন। উপবীত ধারণ করতেন, যজ্ঞে অংশ নিতেন।
অন্যান্য পণ্ডিতদের সাথে শাস্ত্র নিয়ে সমানতালে তর্ক-বিতর্ক করতেন। এঁদের বলা হত ব্রহ্মবাদিনী। এঁরা রাজা-প্রজা-পণ্ডিত আপামরচণ্ডাল মানুষের কাছে প্রচুর সম্মান পেতেন। গার্গী ছিলেন এই রকম একজন। তিনি সম্ভবত চিরকুমারী ছিলেন। গার্গীর সম্বন্ধে বেশি কিছু জানা যায় না। তাঁর চরিত্রের যে বিশেষত্বগুলি বৃহদারণ্যক উপনিষদে ফুটে উঠেছে - তিনি অসামান্য মেধাবী, আত্মবিশ্বাসী, নির্ভীক ও পূজ্যপাদে সম্মান জানাতে সদা প্রস্তুত।


প্রথম দফায় প্রশ্নোত্তর শেষ হলে গার্গী দ্বিতীয় দফায় যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করতে উঠলেন। কিন্তু সভার সমস্ত পণ্ডিতদের প্রথমেই বলে দিলেন, দ্বৌ প্রশ্নৌ প্রক্ষ্যামি, তৌ চেন্মে বক্ষ্যতি, ন জাতু যুষ্মাকং কশ্চিদ্‌ ব্রহ্মোদ্যং জেতেতি – দুটি প্রশ্ন করব, এই দুই প্রশ্নের উত্তর যদি ইনি দিতে পারেন, তাহলে আপনারা কেউ ব্রহ্মবিদ্যায় পরাস্ত করতে পারবেন না। নিজের ধীশক্তির ওপর কি অসাধারণ বিশ্বাস, সভার তাবড় তাবড় পণ্ডিতদের মুখের ওপর বলে দিলেন আপনারা যতই প্রশ্ন করুন না কেন, আমার প্রশ্নই শেষ প্রশ্ন। তার পরে আর প্রশ্ন নিরর্থক। এবার প্রশ্ন করার পদ্ধতিটা দেখুন।

গার্গী জিজ্ঞাসা করলেন, হে যাজ্ঞবল্ক্য, আমি কাশী বা বিদেহ দেশের বীরপুত্রের মতো ধনুকে শত্রু সন্তাপকারী দুই প্রশ্ন শর হাতে নিয়ে এসেছি। আমার প্রথম প্রশ্ন, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল কিসে অধিষ্ঠিত?

যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, এই সমস্তই আকাশে বা অনন্তে প্রতিষ্ঠিত।
সবাই তো এখানেই থেমে যায়, আকাশ বা অনন্তের ওপরে আর কি থাকতে পারে? কিন্তু গার্গী জানতেন এখানেই শেষ নয়। আবার প্রশ্ন করলেন, আকাশ কিসে অধিষ্ঠিত?
তার উত্তরে যাজ্ঞবল্ক্য শোনালেন, সমস্ত ব্রহ্মাণ্ড যাতে অধিষ্ঠিত, সেই অবাঙ্‌মানসগোচর অক্ষর ব্রহ্মের কথা। যার প্রশাসনে প্রতি নিমেষ, সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চলমান। এঁকে দেখা, শোনা বা জানা না গেলেও ইনি সমস্ত দেখতে পান, শুনতে পান ও জানতে পারেন। নান্যদতোহস্তি দ্রষ্টূ, নান্যদতোহস্তি বিজ্ঞাত্রেতাস্মিন্ – ইনি ভিন্ন কেউ দ্রষ্টা নেই, শ্রোতা নেই, বিজ্ঞাতা নেই।

এখানে যাজ্ঞবল্ক্যর উত্তর সমস্ত জ্ঞানের সীমানা অতিক্রম করে গেল। এই জ্ঞানই প্রকৃত অনন্ত বা ভূমা, যা ছান্দোগ্য উপনিষদের সপ্তম অধ্যায়ে উল্লেখিত। যাজ্ঞবল্ক্য যে প্রকৃত ব্রহ্মজ্ঞানের অধিকারী, এক প্রকৃষ্ট জ্ঞানযোগী, এই প্রশ্নের উত্তরে তা স্পষ্ট বোঝা গেল। এই উত্তর শোনার পর গার্গী সমবেত বিদ্বজনকে বললেন হে ব্রাহ্মণগণ, আপনারা যদি এঁকে খালি নমস্কার করেই পার পেয়ে যান তাহলেই যথেষ্ট মনে করবেন। ব্রহ্মবিদ্যায় এঁর সমকক্ষ কেউ নেই।

মনে রাখতে হবে একটু আগেই যাজ্ঞবল্ক্য গার্গীকে মাথা খসে পড়বে বলে সাবধান করেছিলেন। সেই তিক্ততা ভুলে গুণীর সমাদর ও শ্রদ্ধায় এতটুকু ভুল হয় নি গার্গীর। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো যে জনক রাজায় সভায় কেবলমাত্র গার্গী বাচক্লবী যাজ্ঞবল্ক্যর দার্শনিক মতবাদ বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন।
আজ থেকে দুই বা তিন হাজার বছর আগের ভারতবর্ষে এক রাজার সভায় এই গভীর দর্শনের প্রশ্ন ও উত্তরগুলি উচ্চারিত হয়েছিল, সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা ও বিনয়ের সাথে। কোনো কটু কথা, কোনো আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ পায় নি এঁদের বাকভঙ্গীতে। আজকের গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষে এই পারস্পরিক শ্রদ্ধাযুক্ত প্রশ্নোত্তর যে অসম্ভব সেটা বোঝা যায় গণতন্ত্রের পীঠস্থানগুলির চাল-চলন দেখলেই।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে যাজ্ঞবল্ক্য ও গার্গী তাঁদের সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদ পুরোনো উপনিষদগুলির মধ্যে একটি। যাজ্ঞবল্ক্যর দর্শন, যা ব্রহ্মবাদ ও অদ্বৈতবাদের পূর্বসূরি, পরবর্তী উপনিষদগুলিকেও প্রভাবিত করছে।
যাজ্ঞবল্ক্য যে জ্ঞানী ছিলেন, কিন্তু শুকনো জ্ঞানসর্বস্ব ঋষি ছিলেন না, তার পরিচয় আমরা আগেই পেয়েছি। তাঁর রসবোধের কথা শুনে মনে পড়ে বিগত শতাব্দীর আর এক মহাপুরুষের কথা, যিনি বলতেন, মা আমাকে রসেবসে রাখিস। যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর সরস মনটিকে আরো একবার মেলে ধরেন, জনক রাজার সঙ্গে অন্য এক সাক্ষাতকারের সময়।

জনক বসে আছেন রাজসভায়, এমন সময় যাজ্ঞবল্ক্য এসে হাজির। জনক জিজ্ঞাসা করলেন, কি ব্যাপার ঋষিবর, কি মনে করে? পশুলাভের ইচ্ছায় না ধর্মতত্ত্ব আলোচনার জন্য। যাজ্ঞবল্ক্য সোজা সাপটা উত্তর দিলেন - উভয়মেব সম্রাট, দুটোই চাই। তারপর অনেক উপদেশ-টুপদেশ দেবার পর যখন জনক বললেন, আপনার উপদেশের জন্য আমি আপনাকে এক হাজার গরু দান করছি। যাজ্ঞবল্ক্য সৎ ব্রাহ্মণ ছিলেন, বললেন, না সম্রাট, আমার শিক্ষাদান সম্পূর্ণ হয়নি আর আমার পিতা মনে করতেন যে শিক্ষা পুরো না হলে দান নেওয়া উচিত নয়।


মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য কেবল জ্ঞানীই ছিলেন না, তিনি সত্যকাম নির্লোভ পুরুষ ছিলেন, ঠিক গীতার বর্ণনার মতো - বীতরাগভয়ক্রোধ স্থিতধী মুনিরুচ্যতে (গীতা ২/৫৬)।


লেখা- ইন্টারনেট

বেদেই প্রথম আলোকবিদ্যার সঠিক উল্লেখ পাওয়া যায় | জানতে পড়ুন

বেদেই প্রথম আলোকবিদ্যার সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় | জানতে পড়ুন

আলো সম্পর্কে আমরা সবাই জানি? প্ল্যাঙ্ক এর কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে কিছু ফোটন কণা কোন উৎস হতে গুচ্ছ আকারে যখন প্রবাহ শুরু করে তাই আলো।

আজ হতে ১০২০ বছর পূর্বেও মানুষ মনে করতো, আমাদের চোখে এমন কোন বিশেষ শক্তি আছে,যার দ্বারা আমরা যেকোন বস্তু দেখতে পারি, হয়ত আমাদের চোখ হতেই কোন শক্তি বস্তুতে আঘাত করলে আমরা সেই বস্তু কে দেখতে পাই।


কিন্তু ইরাক এর বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ইবনে আল হেইথাম ১০১১ হতে ১০২১ অব্দি গবেষণার ফল স্বরুপ "Book Of Optics" এ সর্বপ্রথম সর্বজন স্বীকৃত ভাবেই আবিষ্কার করেন,কোন উৎস হতে আলো নিসৃত হয়ে,যখন কোন বস্তুতে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে প্রবেশ করে,তখনি আমরা সেই বস্তুকে দেখতে পাই। কিন্তু আধুনিক আলোকবিদ্যার সৃষ্টির অনেক আগের বেদ এর দিকে দৃষ্টি আরোপ করেন আপনার ভাবনা অনেক আগেই বদলে যেত!


তদ্বিষ্ণোঃ পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয়ঃ।
দিবীব চক্ষুরাততম্।। ঋগবেদ, ১/২২/২০


ভাবানুবাদ :- প্রাণীকূল যেমন সূর্য্যের তথা আলোর সাহায্যে শুদ্ধ নেত্র(চক্ষু) দ্বারা মূর্ত্তিমান পদার্থকে দর্শন করে,
ধার্মিক বিদ্বানেরা শুদ্ধ জ্ঞাননেত্র (জ্ঞানচক্ষু) দ্বারা তেমনই নিজের মধ্যেই ঈশ্বর তথা পরমাত্মার পরমপদ সন্দর্শন করেন।
হাজার বছর আগে যা ইবনে আল হেইথাম আবিষ্কার করে গেছেন তা লক্ষ বছর প্রাচীন পরম পবিত্র বেদ এই নিহীত আছে। আসুন আমরা বেদবিদ্যা অধ্যয়ন করি তবে আমরা সকলে সেই গুপ্তজ্ঞান জানতে পারব।


প্রকাশে- শ্রী দিব্য ভট্টাচার্য্য

রামায়ণ অনুসারে দাবা খেলার স্রষ্টা মন্দোদরী | জানুন প্রাচীন ইতিহাস

দাবা, দাবার ইতিহাস, ভারতীয় খেলা
গুজরাতের লোথাল থেকে খনন করে পাওয়া দাবার বোর্ড

চতুরঙ্গ বা দাবা একটি প্রাচীন ভারতীয় কৌশল-ভিত্তিক খেলা যার আধুনিক কিছু সংস্করণের মধ্যে বোর্ডভিত্তিক খেলা দাবা, সোগি, মাকরুক প্রভৃতি প্রধান। এটি 'চতুর' শব্দটি থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়, যার অর্থ বুদ্ধিমত্তাধারী / বুদ্ধিমান; আবার 'চার' থেকে 'চতুর' এবং 'দিক' থেকে 'অঙ্গ' যোগে 'চতুরঙ্গ' (চারদিকে গমন-যোগ্য) কথাটির উদ্ভব বলেও অনেকে মনে করেন।


চতুরঙ্গ বা দাবা শুরুর অবস্থায় 'রাজা'রা মুখোমুখি অবস্থানে থাকে না; সাদা রাজার অবস্থান থাকে e1 ঘরে এবং কালো রাজার অবস্থান থাকে d8 ঘরে। }}
দাবা, দাবার ইতিহাস, ভারতীয় খেলা
দাবা খেলারত শ্রীকৃষ্ণ ও রুক্মিণী (হস্তঅঙ্কিত চিত্র)



গুপ্ত শাসনামলে, ৬ষ্ঠ শতকের কাছাকাছি সময়ে, ভারতে চতুরঙ্গ খেলার উদ্ভব ঘটে। পারসিয়ান সসনিয়ন শাসনামলে, ৭ম শতকে, এটি শতরঞ্জী খেলা হিসাবে পরিবর্তিত হয়; যা মধ্যযুগে ইউরোপে গিয়ে বর্তমান 'দাবা' খেলায় পরিণত হয়। কিন্তু ভারতীয় মহাকাব্য রামায়ণ অনুসারে লঙ্কার রাক্ষস রাজা রাবণের রাজমহিষী বা স্ত্রী মন্দোদরীকে চতুরঙ্গ বা দাবা খেলার জনক বলা হয়েছে।


চতুরঙ্গ খেলার সঠিক নিয়ম-কানুন সম্পর্কে কিছু জানা যায় না; তবে দাবা খেলা বিষয়ক গবেষকগণ অনুমান করেন যে এটি মূলত: এর উত্তরাধিকারী খেলা শতরঞ্জীর মতো একই ধরনের নিয়মানুসারে খেলা হতো। তবে, সুনির্দিষ্টভাবে বললে, এর 'গজ' (হাতি)-এর চাল সমূহ ছিলো অনিশ্চিত ধরনের, যা আধুনিক দাবায় 'বিশপ'-এর চালের অগ্রদূত হিসাবে বিবেচনা করা যায়।



তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া

মানবজীবনের আদর্শ পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র

মানবজীবনের আদর্শ পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র


"ভগবন্‌, ত্রিভুবন তোমাদের প্রত্যক্ষে বিরাজে-
কহ মোরে কার নাম অমর বীণার ছন্দে বাজে।
কহ মোরে বীর্য কার ক্ষমারে করে না অতিক্রম,
কাহার চরিত্র ঘেরি সুকঠিন ধর্মের নিয়ম
ধরেছে সুন্দর কান্তি মাণিক্যের অঙ্গদের মতো,
মহৈশ্বর্যে আছে নম্র, মহাদৈন্যে কে হয় নি নত,
সম্পদে কে থাকে ভয়ে, বিপদে কে একান্ত নির্ভীক,
কে পেয়েছে সব চেয়ে, কে দিয়েছে তাহার অধিক,
কে লয়েছে নিজশিরে রাজভালে মুকুটের সম
সবিনয়ে সগৌরবে ধরামাঝে দুঃখ মহত্তম-
কহ মোরে, সর্বদর্শী হে দেবর্ষি, তাঁর পুণ্য নাম।
নারদ কহিলা ধীরে, অযোধ্যায় রঘুপতি রাম।"



বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভাষা এবং ছন্দ কবিতায় এভাবেই অসাধারণ পদলালিত্যে প্রকাশ করেছেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের শ্রেষ্ঠতম পুরুষোত্তমের বিভূতি। কবিগুরুর বাল্মীকি চরিত্রের মুখ দিয়ে কবিগুরুই যেন আমাদের বলছেন-
"জানি আমি জানি তাঁরে, শুনেছি তাঁহার কীর্তিকথা"-
কহিলা বাল্মীকি, তবু, নাহি জানি সমগ্র বারতা,
সকল ঘটনা তাঁর- ইতিবৃত্ত রচিব কেমনে।
পাছে সত্যভ্রষ্ট হই, এই ভয় জাগে মোর মনে।"


যেখানে মহাকবি বাল্মীকি বলেছেন, শ্রীরামচন্দ্র সম্পর্কে সকল কিছু জেনেও তিনি কিছুই জানতে পারেননি ; সেই মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের মাহাত্ম্যকথা আমরা সাধারণজন কি করে প্রকাশ করবো? কিন্তু বর্তমানে আমরা খুবই ব্যথিতচিত্তে লক্ষ্য করি অনেকেই হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে সফল, কিন্তু এর মানে এ নয় যে আমরা সকল বিষয়েই জ্ঞানী। স্কুল কলেজে তো রামায়ণ-মহাভারত বিষয়ে পড়াশুনার সুযোগ নেই ; এর পরেও রামায়ণ-মহাভারত সম্পর্কে সামান্য বিদ্যা নিয়েই, বা কদাচিৎ ক্ষেত্রে না পড়েই আমরা রামায়ণ-মহাভারতের পিণ্ডী চটকাতে চটকাতে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে শুরু করে দেই। মূল চব্বিশ হাজার শ্লোকের রামায়ণ, অথবা একলক্ষ শ্লোকের মহাভারত হয়তো আমরা কখনো চোখেই দেখিনি। আমরা ইউরোপীয় মুখস্থ তোতাপাখির বিদ্যা দিয়ে সকলকিছুই দেখতে যেয়ে অনেক সময় অনেক অমার্জনীয় ভুল করে ফেলি। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের উদ্দেশ্য করে অনেক আগেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে রামায়ণ-মহাভারত যে ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস এবং সত্য ইতিহাস সে কথা স্মরণ করে আমাদের পথের দিশা দিয়েছেন। কবিগুরু বলেছেন-


" শতাব্দীর পর শতাব্দী যাইতেছে কিন্তু রামায়ণ-মহাভারতের স্রোত ভারতবর্ষে আর লেশমাত্র শুষ্ক হইতেছে না। প্রতিদিন গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে তাহা পঠিত হইতেছে, মুদির দোকান হইতে রাজার প্রাসাদ পর্যন্ত সর্বত্রই তাহার সমান সমাদর। ধন্য সেই কবিযুগলকে, কালের মহাপ্রান্তরের মধ্যে যাঁহাদের নাম হারাইয়া গেছে, কিন্তু যাঁহাদের বাণী বহুকোটি নরনারীর দ্বারে দ্বারে আজিও অজস্রধারায় শক্তি ও শান্তি বহন করিতেছে, শত শত প্রাচীন শতাব্দীর পলিমৃত্তিকা অহরহ আনয়ন করিয়া ভারতবর্ষের চিত্তভূমিকে আজিও উর্বরা করিয়া রাখিতেছে।
এমন অবস্থায় রামায়ণ-মহাভারতকে কেবলমাত্র মহাকাব্য বলিলে চলিবে না, তাহা ইতিহাসও বটে; ঘটনাবলীর ইতিহাস নহে, কারণ সেরূপ ইতিহাস সময়বিশেষকে অবলম্বন করিয়া থাকে—রামায়ণ-মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস। অন্য ইতিহাস কালে কালে কতই পরিবর্তিত হইল, কিন্তু এ ইতিহাসের পরিবর্তন হয় নাই। ভারতবর্ষের যাহা সাধনা, যাহা আরাধনা, যাহা সংকল্প, তাহারই ইতিহাস এই দুই বিপুল কাব্যহর্ম্যের মধ্যে চিরকালের সিংহাসনে বিরাজমান।"
( দীনেশচন্দ্র সেন রচিত 'রামায়ণী কথা'র পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ভূমিকা )

সাহিত্য বিচারে, রামায়ণ পৃথিবীর প্রধান চারটি ক্লাসিক মহাকাব্যের প্রাচীনতম একটি মহাকাব্য। এবং
আধ্যাত্মিক, দার্শনিক এবং নীতিশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, রামায়ণ একটি সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন দর্শনের দীপ্তময় শাস্ত্র। প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভৌগলিকভাবে রামায়ণ একটি অভ্রান্ত গ্রন্থ । রামায়ণের অযোধ্যা, কিষ্কিন্ধ্যা, চিত্রকূট, লঙ্কা, সরজু নদী সহ সকল স্থানই ভৌগলিকভাবে বর্তমানে সেই সেই স্থানে অবস্থিত থেকে রামায়ণের কালের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য আজও বহন করে চলছে।
রামায়ণ শুধুমাত্র কাল্পনিক কাহিনী নয়, রামায়ণ হলো এই ভূখণ্ডের প্রাচীন ইতিহাস। এর অন্যতম পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ হলো রামসেতু, যা ভগবান শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কায় পৌঁছানোর জন্য বানরসেনার সহায়তায় তৈরি করেছিলেন ; আজও তাঁর পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রামসেতু অক্ষত আছে। NASA-এর বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন সেতু এটি এবং এটি কোন প্রাকৃতিক সেতু নয়, সর্বপ্রাচীন এবং সর্ববৃহৎ মানবসৃষ্ট সেতু
কি নেই রামায়ণে? এ যেন একটি বিশ্বকোষ। রামায়ণের এ বিশ্বকোষ নির্মিত হয়েছে এক মর্যাদা পুরুষোত্তম দেব চরিত্রের উদ্বোধনে ; সেই দেব চরিত্রের নাম শ্রীরামচন্দ্র। যিনি শ্রীভগবানের অবতার রূপ পরিগ্রহ করে আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন, আদর্শ পরিবার কেমন হবে? আদর্শ দাম্পত্যজীবন কেমন হবে? আদর্শ সমাজ কেমন হবে? আদর্শ ভ্রাতৃত্ব কেমন হবে? আদর্শ সন্তান কেমন হবে? আদর্শ বন্ধুত্ব কেমন হবে? এ সকল আদর্শের একমাত্র দীপ্তিময় আদর্শরূপ হলেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র।


আজ ভগবান রামচন্দ্র বা রামায়ণের প্রসঙ্গ আসলেই কিছু মানুষ রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের শম্বুক হত্যার প্রসঙ্গ নিয়ে এসে রামচন্দ্রের চরিত্রে কালিমালিপ্ত করতে থাকেন। তাদের উদ্দেশ্যে সংক্ষেপে বলতে চাই - বর্তমানে প্রাপ্ত রামায়ণে উত্তরকাণ্ডের অনেকটাই প্রক্ষিপ্ত। সেখানে শম্বুকবধের কাহিনীটি যে প্রক্ষিপ্ত, এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর সবচেয়ে বড় প্রমান হলো- রামায়ণের বালকাণ্ডে ১ম এবং ৩ য় সর্গে দুটি সূচিপত্র পাওয়া যায় ; প্রথম সূচিপত্রে নারদের মুখে সমগ্র রামচরিত সংক্ষেপে বর্ণিত, কিন্তু সেখানে উত্তরকাণ্ডের অথবা তার শম্বুকবধের কোন কথাই নেই। অর্থাৎ শম্বুকবধ পরবর্তীকালে কোন বর্ণবাদী দ্বারা সংযোজিত। যে রামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেন নিষাদরাজ গুহক, যিনি বর্তমান জাতপাতের পরিভাষায় হলেন শূদ্র। যেই রামচন্দ্র শূদ্র কুলোদ্ভূত শবরীর মুখের এঠো ফল খেয়েছেন ; সেই রামচন্দ্র কি করে শুধুমাত্র তপস্যার কারণে একজন শূদ্রকে হত্যা করবেন? এ কি বিশ্বাসযোগ্য? এরকম অসংখ্য মিথ্যাচার ছড়ানো আছে রামায়ণকে কেন্দ্র করে, যার সুফল নিচ্ছে ভারতবর্ষের বিরোধী, হিন্দুবিরোধী কিছু সাম্প্রদায়িক ইতিহাসবেত্তারা। তাই আমাদের নতুন প্রজন্মের উচিত এ সকল মিথ্যাচারকে অপনোদন করে প্রকৃত ইতিহাসের গতিপথকে অক্ষুণ্ণ রাখা।
বহু বছরের বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা আমাদের এদেশীয় সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোকে আমাদের মন থেকে মুছে দেয়ার অপচেষ্টা করেছে, যার ফলে শিক্ষিত শ্রেণীর আমরা অনেকেই আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে শিখেছি। এ ঘৃণা এবং অবজ্ঞাই আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাভিমানকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে৷ কিছু তথাকথিত বামপন্থী এবং সেকুলার নামধারী বুদ্ধিজীবীদের দ্বিচারিতা আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐক্যবদ্ধ চিন্তাকে বিভ্রান্ত করে চলছে৷ এ তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা শ্রীরামের অস্তিত্ব এবং কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও, রাবণ তাদের কাছে মহিমান্বিত মহান। রাম-রাবণের শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব তাদের তথাকথিত গবেষণার পরিভাষায় হলো, অনার্যদের উপরে আর্যদের আগ্রাসন! অাশ্চর্যের বিষয়, আজও এই দ্বিচারীদের বিভিন্নভাবে জ্ঞানত বা অজ্ঞানত সমর্থন যুগিয়ে চলেছে কিছু বোধশক্তিহীন, আত্মকেন্দ্রিক কুলাঙ্গার।
ভারতবর্ষের সকল ভাষাতে তো বটেই, তিব্বত, চীন, ফিলিপাইন, বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডীয়া, লাওস সহ এশিয়ার সকল জনপদে প্রচলিত আছে রামায়ণ বিভিন্ন নামে।


জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন ধর্ম, ন্যায় এবং কর্তব্য পালনের এক জাজ্বল্যমানতার পরাকাষ্ঠা। তাই তিনি সকল মানবের আদর্শ, মর্যাদা পুরুষোত্তম। তিনি পিতৃসত্য রক্ষার জন্যে চৌদ্দবছর বনবাস সহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধর্ম পালনে ছিলেন আপোষহীন। সাধু সজ্জনের কাছে তিনি ছিলেন কুসুমের মত কোমল, আবার দুর্জ্জন অধর্মের বিনাশে তিনি নির্মম বজ্রধর । রামায়ণের অসংখ্য স্থানে ধর্মের মাহাত্ম্য এবং অধর্মকে বিনাশ করে ধর্মের শরণে থাকার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
ধর্মাদর্থঃ প্রভবতি ধর্মাৎ প্রভবতে সুখম্।
ধর্মেণ লভতে সর্বং ধর্মসারমিদং জগৎ।।
(অরণ্যকাণ্ড : ৯.৩০)


"ধর্ম হতেই অর্থ এবং প্রভাব আসে, ধর্ম থেকেই সুখ উৎপন্ন হয়।ধর্মের দ্বারাই জগতে সকল অভীষ্ট বস্তুর লাভ হয় ; সুতরাং এ জগতে ধর্মই প্রকৃত সারবস্তু। তাই সকলেরই ধর্মের শরণে থাকার সর্বদা চেষ্টা করা উচিত।"
ভগবান শ্রীরামচন্দ্র আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ধর্মরক্ষার্থে শুধুমাত্র তথাকথিত ধর্ম পালন নয়; ধর্মরক্ষার জন্য অধর্ম, পাশবিক শক্তির সাথে নিরন্তর সংগ্রাম করাটাও আবশ্যক। তাই আজও ভগবান শ্রীরামচন্দ্রই সকল হিন্দুর আদর্শ, জীবনের ধ্রুবতারা। তাঁর আবির্ভাব তিথি শ্রীরামনবমী তাই আমাদের কাছে ক্ষাত্রশক্তি জাগরণের তিথি


আজ হিন্দু সাধুসন্ন্যাসী, ধর্মগুরু এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের সর্বাগ্রে কর্তব্য, ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের জীবনের ধর্মরক্ষার্থে অধর্ম বিনাশের শিক্ষাকে তাঁদের শিষ্য, অনুগামীদের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা৷ রামায়ণে বর্ণিত শ্রীরামচরিতের বর্তমান যুগোপযোগী প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা করে সমাজ জাগরণের নূতন পথের উন্মেষ এখন সময়ের দাবী৷ দেশে দেশে হিন্দু আজ অত্যাচারিত, নিপীড়িত৷ হিংস্র বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসনে স্বভূমিতেই হিন্দুর অস্তিত্ব আজ বিপন্ন৷
আমাদের সামনে আদর্শের প্রয়োজন, পরিবার, সমাজ, সংসারে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের মত আদর্শিক মানবের প্রয়োজন। তাইতো মহর্ষি বাল্মিকী রামায়ণের শুরুতেই ত্রিলোকদর্শী দেবর্ষি নারদের কাছে জানতে চান, "জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ ধার্মিক, গুণবান এবং ধর্মরক্ষক কে?" এ প্রশ্নটিকে উপলক্ষ করে নারদ বাল্মিকীকে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের প্রায় সকল গুণাবলি ব্যক্ত করেন। মহর্ষি নারদ বলেন:
"বাল্মিকী তুমি যে-সমস্ত গুণের কথা উলেখ করলে তা সামান্য মানুষের মধ্যে সুলভ না। এমন গুণবান মনুষ্য এ পৃথিবীতে কে আছেন, এক্ষণে আমি তা স্মরণ করছি, তুমি শ্রবণ কর। শ্রীরাম নামে ইক্ষ্বাকুবংশীয় সুবিখ্যাত এক নরপতি আছেন। তাঁর বাহুযুগল আজানুলম্বিত, স্কন্ধ অতি উন্নত, গ্রীবাদেশ রেখাত্রয়ে অঙ্কিত, বক্ষঃস্থল অতি বিশাল, মস্তক সুগঠিত, ললাট অতি সুন্দর, নেত্ৰ আকৰ্ণবিস্তৃত ও গাত্রবর্ণ স্নিগ্ধ। তিনি নাতিদীর্ঘ ও নাতিহ্রস্ব; তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রমাণানুরূপ ও বিরল। সেই সর্বসুলক্ষণসম্পন্ন সর্বাঙ্গসুন্দর মহাবীর শ্রীরাম অতিশয় বুদ্ধিমান ও সদ্বক্তা। তিনি ধর্মজ্ঞ, সত্যপ্রতিজ্ঞ, বিনীত ও নীতিপরায়ণ; তাঁর চরিত্র অতি পবিত্র; তিনি যশস্বী, জ্ঞানবান, সমাধিসম্পন্ন, সকল জীবের প্রতিপালক এবং সর্বোপরি স্বধর্মের রক্ষক। তিনি আত্মীয়স্বজন সকলকেই রক্ষা করছেন। তিনি প্রজাপতিসদৃশ ও শত্রুনাশক। তিনি শরণাপন্নদের সর্বদা আশ্রয় দেন। তিনি বেদ-বেদাঙ্গে পারদর্শী, ধনুর্বিদ্যাবিশারদ, মহাবীর্য্যশালী, ধৈর্যশীল ও জিতেন্দ্রিয়। তিনি বেদাদি সর্ব শাস্ত্ৰজ্ঞ, প্রতিভাসম্পন্ন ও স্মৃতিশক্তি-যুক্ত। সকলেই তাঁর প্রতি প্রীতি প্রদর্শন করে থাকে। তিনি অতি বিচক্ষণ, সদাশয় ও তেজস্বী। নদীসকল যেমন মহাসাগরকে সেবা করে, সেইরূপ সাধুগণ সততই তাঁর সেবা করে থাকে। তিনি শত্ৰু-মিত্রের প্রতি সমদর্শী এবং অতিশয় প্রিয়দর্শন। সেই কৌশল্যাগর্ভসম্ভূত লোকপূজিত রাম গাম্ভীর্য্যে সমুদ্রের ন্যায়, ধৈর্যে হিমাচলের ন্যায়, বলর্বীযে ভগবান বিষ্ণুর ন্যায়, সৌন্দর্যে চন্দ্রের ন্যায়, ক্ষমায় পৃথিবীর ন্যায়, ক্ৰোধে কালানলের ন্যায়, বদান্যতায় কুবেরের ন্যায় ও সত্যনিষ্ঠায় দ্বিতীয় ধর্মের ন্যায় কীর্তিত হয়ে থাকেন। এ সকল গুণের আধার যিনি, তিনিই হলেন অযোধ্যার রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ ও গুণ-শ্রেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামচন্দ্র ।"


(বাল্মীকি রামায়ণ:আদিকাণ্ড, প্রথম সর্গ, ৮-১৯)
রামায়ণের অসংখ্য শিক্ষার মধ্যে অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে দেশপ্রেম। রামায়ণে আমরা দেখি যখন রাবন বধের পরে লঙ্কা বিজিত হলো তখন লক্ষ্মণ রামচন্দ্রকে বললেন, - দাদা,এমন সুন্দর স্বর্ণময়ী লঙ্কা যখন বিজিত হয়েছে, তখন আমরা মাতৃভূমি অযোধ্যায় ফিরে না গিয়ে এখানেই রাজত্ব করতে পারি। তখন উত্তরে শ্রীরামচন্দ্র বলেন হীরকখচিত দীপ্তিময় এক উক্তি -
অপি স্বর্ণময়ী লঙ্কা ন মে রোচতে লক্ষণ।
জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।।

"লক্ষণ এই লঙ্কাপুরী যদিও স্বর্ণময়ী অতীব সুন্দরী, তবুও তা আমার কাছে রূচিকর নয়; কারণ জননী এবং জন্মভূমি স্বর্গ থেকেও অধিকতর শ্রেষ্ঠ।"
তাই আমরা শ্রীরামচন্দ্রের ধর্মরক্ষা এবং দেশপ্রেমের আদর্শকে প্রত্যেকের জীবনে বাস্তবায়িত করার মানসে ; পৃথিবীর সকল আসুরিক শক্তিকে বিনাশ এবং শুভশক্তি, দৈবশক্তির উদ্বোধনে আমরা যেন প্রত্যেকেই আমৃত্যু কাজ করে যেতে পারি সেই দীপ্ত প্রেরণায় আসুন আমরা সকলেই সংঘবদ্ধভাবে সংকল্পবদ্ধ হই।


ওঁ রাং শ্রীরামচন্দ্রায় নমঃ
দশরথায় বিদ্মহে সীতাবল্লভায় ধীমহি।
তন্নো রামঃ প্রচোদয়াৎ।।
রামায় রামভদ্রায় রামচন্দ্রায় বেধসে।
রঘুনাথায় নাথায় সীতায়াঃ পতয়ে নমঃ।।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ