এই সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কে ? আর ভগবান ও বা কে?

ঈশ্বর কে,এই সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কে ? আর ভগবান ও বা কে?


ঈশ্বর ও ভগবানের মধ্যে পার্থক্য কি?
ঈশ্বর কে তিনি কি জন্মগ্রহণ করেন?
বেদান্তদর্শনে ঈশ্বরের স্থান কোথায়?

তাহলে চলুন দেখা যাক 👉

ঈশ্বর ও ব্রহ্মঃ
ধর্মদর্শন ও সাধনাঃ

"ওম্।। ন ত্বাবাং অন্যো দিব্যো ন পার্থিবো ন জাতো
ন জনিষ্যতে অশ্বায়ন্তো মঘবন্নিন্দ্র বাজিনো গব্যন্তস্তা হবামহে।।" (সাম উত্তরাঃ ৬৮১)

অর্থ অনুবাদঃ— হে পরমেশ্বর! (ত্বাবান) অাপনার সমক্ষ এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে (অন্যঃ) অার অন্য কেহই (দিব্যঃ ন) দিব্য গুন কর্ম স্বভাব যুক্ত নেই (ন পার্থিবঃ) এবং অন্য কোন পার্থিব শক্তি, (নুজাতঃ) না তো হয়েছে, (ন জনিষ্যতে) অার না তো ভবিষ্যতে হবে। হে (মঘবন) ঐশ্বর্যশালী পরমেশ্বর! (বাজিনঃ) অাপনার বল শক্তি পরাক্রম দ্বারা (অশ্বায়ন্তঃ) মনোবলকে তীব্র শক্তিশালী করবার জন্য (গব্যন্তঃ) অভ্যান্তরীন বল বীর্য পরাক্রমকে আত্মা জ্ঞানের সঙ্গে (ত্বা) কেবল মাত্র অাপনাকেই (হবামহে) প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা উপসনাদি করিতেছি।

ঈশ্বর হলেন এই সমস্ত সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা- নিয়ন্ত্রক যাকে আমরা ইংরেজিতে গড বলে থাকি। আর ভগবান হলো যিনি সমস্ত ঐশ্বর্য, বীর্য্য, যশ, জ্ঞান, শ্রী, বৈরাগ্য আছেন তখন তিনি ভগবান। অনেকে মুনি ঋষিদের ও অবতার বলে আমরা ভগবান বলি। এটা আমাদের ভুল আর ঈশ্বর ও ভগবান এর পার্থক্য আছে।

ঈশ্বর সর্বব্যপী বিরাজিত তিনি উর্ধ্বে, চারপাশে সর্বদিকে বিদ্যমান সর্বব্যপী স্রষ্টা, যিনি আমাদের মধ্যেও ব্যক্তিত্বরূপে বিদ্যমান, আর এটি জেনেই একজন যোগী পুরুষ তাঁর সাথে একাত্ব হয়ে যান, যিনি তা জানেন তিনি ঈশ্বরকে সর্বব্যপী বলে বুঝতে পারেন, বুঝতে পারেন যে আমরাও তার অংশ।

ঈশ্বর সকল ব্যষ্টির সমষ্টি-স্বরূপ। তথাপি তিনি ‘ব্যক্তি-বিশেষ’, যেমন মনুষ্যদেহ একটি বস্তু, ইহার প্রত্যেক কোষ একটি ব্যষ্টি। সমষ্টি—ঈশ্বর, ব্যষ্টি—জীব। সুতরাং দেহ যেমন কোষের উপর নির্ভর করে, ঈশ্বরের অস্তিত্ব তেমনি জীবের অস্তিত্বের উপর নির্ভর করে। এর বিপরীতটিও ঠিক তেমনি এইরূপে জীব ও ঈশ্বর যেন সহ-অবস্থিত দুইটি সত্ত্বা— একটি থাকলে অপরটি থাকবেই। অধিকন্তু আমাদের এই ভূলোক ব্যতীত অন্যান্য উচ্চতর লোকে শুভের পরিমাণ অশুভের পরিমাণ অপেক্ষা বহুগুণ বেশী থাকায় সমষ্টি (ঈশ্বর)-কে সর্বমঙ্গল-স্বরূপ বলা যেতে পারে। সর্বশক্তিমত্তা ও সর্বজ্ঞত্ব ঈশ্বরের প্রত্যক্ষ গুণ, এবং সমষ্টির দিক্ হতেই ইহা প্রমাণ করবার জন্য কোন যুক্তির প্রয়োজন হয় না।

ব্রহ্ম এই উভয়ের ঊর্ধ্বে, এবং একটি সপ্রতিবন্ধ বা সাপেক্ষ অবস্থা নয়। ব্রহ্মই একমাত্র স্বয়ংপূর্ণ, যা বহু এককের দ্বারা গঠিত হয়নি। জীবকোষ হতে ঈশ্বর পর্যন্ত যে-তত্ত্ব অনুস্যূত, যা ব্যতীত কোন কিছুরই অস্তিত্ব থাকে না এবং যা কিছু সত্য, তাই সেই তত্ত্ব বা ব্রহ্ম। যখন চিন্তা করি— আমি ব্রহ্ম, তখন মাত্র আমিই থাকি; সকলের পক্ষেই এককথা প্রযোজ্য; সুতরাং প্রত্যেকেই সেই তত্ত্বের সামগ্রিক বিকাশ।


শাস্ত্রীয় রেফারেন্স


"অষ্ট চক্রা নব দ্বারা দেবানাং পুরুয়োধ্যা।
তস্যাং হিরণ্ময়ঃ কোশঃ স্বর্গো জ্যোতিষাবৃতঃ।।"
→(অথর্ববেদ, ১০/২/৩১)

অর্থঃ— এই শরীররূপ নগরী নব সূর্য্যাদি দেবের অধিষ্ঠানভূত। আট চক্র এবং নয় ইন্দ্রীয় দ্বারা বিশিষ্ট এইনগরী অজেয়। এই নগরীতর এক প্রকাশময় কোশ আছে (মনোময়কোষ) আনন্দময় জ্যােতি দ্বারা আবৃত।


(অথর্ববেদ ১০/২/৩১ মন্ত্রের বিশ্লেষণ)

দিব্য পুরী অর্থাৎ মনুষ্য শরীর অত্যন্ত বলশালী। ইহা দুই চক্ষু, দুই কর্ণ, দুই নাসিকা, এক মুখ, এক মলদ্বার ও এক মূত্রদ্বার এই নয়টি দ্বার যুক্ত এবং ত্বক রক্ত মাংস মেদ অস্থি মজ্জা বীর্য ও ওজঃ এই আটটি চক্রযুক্ত। ইহাতে জ্যোতিষ্মান কোষ আছে তাহাই আনন্দময়। কারণ ইহা জ্যোতিঃ স্বরূপ পরমাত্মা দ্বারা আবৃত।
                     
                                                           এখানে দুটো শব্দ আছে—

১। ঈশ্বর  ২। সর্বশ্রেষ্ঠ

ঈশ্বর নামক বাচক শব্দ। (বিশেষ্য পদ)

ঈশ্বর— ইষ্টে ঈশ বরচ ইতি ঈশ্বর। ঈশ ঐশ্বর্যে এই ধাতু হতে ঈশ—বর= ঈশ্বর। ঈশ শব্দের অর্থ ব্যাপক, শ্রেষ্ঠ এবং বর শব্দের অর্থ প্রধান। যিনি ব্যাপক এবং শ্রেষ্ঠরও প্রধান তিনিই ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়।


ঈশ্বরঃ কারণং পুরুষকর্মাফল্যদর্শনাৎ। (ন্যায়সূত্র-৪/১/১৯)।।

অর্থাৎঃ— কর্মফলমুক্ত পুরুষই ঈশ্বর।


কে এই পুরুষ?

পুরুষ হল চৈতন্যময় সত্ত্বা। যাকে ব্রহ্ম বলা হয়— ব্রহ্ম যিনি জগৎ সৃষ্টি ও রক্ষা করে আছেন, ব্রহ্ম এই অর্থে— অ। জগৎ যাঁর দ্বারা দীপ্ত হয় এই অর্থ— ব্রহ্ম।

এক, অদ্বিতীয় দেব সর্বভূতে প্রচ্ছন্নভাবে অবস্থিত আছেন। তিনি সর্বব্যাপী, সর্বভূতের অন্তরস্থিত আত্মা, কর্মাধ্যক্ষ, সর্বভূতের নিবাসস্থান, সর্বদ্রষ্টা, চেতয়িতা নিরুপাধিক ও নির্গুণ।
(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ, ১১।। তৃতীয় অধ্যায়)

এই জগতে তাহার কোনো প্রভু নাই, নিয়ন্তাও কেহ নাই। এমন কোনও লিঙ্গ বা চিহ্ন নাই, যাহা দ্বারা অনুমান করা চলে।
(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ।। ৯।। তৃতীয় অধ্যায়)

তিনি সর্বত্র গিয়াছেন, তিনি জ্যোতির্ময়, অশরীরী, ক্ষতরহিত, স্নায়ুহীন, শুদ্ধ ও অপাপবিদ্ধ। তিনি সর্বদর্শী, সর্বজ্ঞ, সর্বোপরি বিদ্যমান এবং স্বয়ম্ভূ। তিনি নিত্যকাল ব্যাপীয়া লোকের যথাযথ কর্মফল ও সাধনা অনুসারে বিষয়সমূহের বিধান করিয়াছেন। (ঈশ উপনিষদ।। ৮।।

ব্রহ্ম এক এবং গতিহীন হয়েও মন অপেক্ষা অধিকতর বেগবান, দেবতা বা ইন্দ্রিয়সকল এঁকে পান না, কারণ ইনি সবার আগে গমন করেন। ব্রহ্ম বা আত্মা সকল শক্তিকে অতিক্রম করে যান, এই ব্রহ্মে অধিষ্ঠিত থেকে প্রাণশক্তি জগতের সমস্ত শক্তিকে ধারণ করেন।
(ঈশ উপনিষদ।। ৪।।)


‘তত্র ঈশ্বরঃ সর্বজ্ঞঃ পরমাত্মা এক এব’। (ন্যায়)।
অর্থাৎ : নিত্য পরমাত্মা বা ঈশ্বর এক ও সর্বজ্ঞ।
ক্লেশকর্ম্মবিপাকাশয়ৈরপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষঈশ্বরঃ। (যোগসূত্র-১/২৪)।।

অর্থাৎঃ— যে পরমপুরুষকে ক্লেশ, কর্ম, বিপাক এবং আশয় অধীন করতে পারে না, যিনি সর্বাত্মা হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র, তিনিই ঈশ্বর। (যোগসূত্র-১/২৪)


তত্র নিরতিশয়ং সর্ব্বজ্ঞত্ববীজম্ ।
(যোগসূত্র-১/২৫)।।

অর্থাৎ যিনি ঈশ্বর, তিনি সর্বজ্ঞ। তাঁতে নিরতিশয় সর্বজ্ঞত্ব-বীজ নিহিত আছে।

(যোগসূত্র-১/২৫)।।
এক্ষণে বুঝা যাচ্ছে যে ঈশ্বর হলেন সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাশালী এবং সর্বশ্রেষ্ট । তাহর ঊদ্ধে আর কিছু নেই।

যেমন সূর্য্যঃ— যদিও বা আমরা বলি সূর্য্যদেবতা (পৌরানিক মতে) কিন্তু আদি জ্ঞান হতে জানা যায় সূর্য্য পরমাত্মা সেই সর্ব শ্রেষ্ট ঈশ্বরের গুনবাচক নামক। সূর্য্য আত্মা জগতস্তস্থুষশ্চ” জগৎ অর্থাৎ প্রাণী, চেতনা এবং চলনশীল পদার্থের এবং তস্থুল অর্থাৎ অপ্রাণী বা পৃথীবি আদি স্থাবর জড় পদার্থের আত্মা স্বরুপ হওয়ার এবং স্বপ্রকাশ স্বরুপ হইয়া সকলের প্রকাশ কারক হওয়াতে ঐ পরমেশ্বরের নাম “সূর্য্য” হইয়াছে। প্রাণী ও অপ্রানী সমস্ত ভূতের ইনি চালক এবং প্রকাশক। ভূাদিগণীয় পরষ্মেপদী সৃ ধাতু কত্ত্ববাচ্যে ক্যপ প্রত্যয়ে নিষ্পন্ন। সৃ ধাতু অর্থ গতি। সূর্য্যাবর্ত্তী জ্যোতিঃ ও তেজঃ সর্ব্বত্র গমনশীল। গতির তিনটি অর্থ জ্ঞান, গমন ও প্রাপ্তি।

এই সূর্য্য যেমন শুধু এই পৃথিবী না সারা বিশ্ব ব্রহ্মান্ড আলো আর তাপপ্রদান করে বিশ্ব শাসন করছে তাই বলা যায়তে পারে বিশ্বে সূর্য্য শ্রেষ্ট আবার এই সূর্য্য আবার কালের অধীনে সমগ্র ব্রহ্মান্ড কালের আবর্তন চক্রে বাধাঁ এইখান থেকে বের হবার সাধ্য কাহারো নেই। সে যত বড় মুল্লূক হোক তাহলে সেই সূত্র হতে বলা যায় এই কালই সর্বশ্রেষ্ট। আর এই কাল হলেন স্বয়ং মহাকাল সেই পরমাত্মা শিব যিনি মঙ্গলময় আর ইনি আছেন তার নিয়ম চক্রে যাহা শাসন করে কালকে তিনি হলেন কালী।
                       
ঈশ্বর পূর্ণরূপ চিত্র

ওঁ উচ্চারণ করতে গেলে আমরা তিনটি শব্দ পাই তা হলঃ— অ + উ + ম এই শব্দে পাওয়া যায় তিনটি মহাশক্তি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর।

ব্রহ্ম শক্তি অভেদ। এককে মানলে, আর একটিকেও মানতে হয়। যেমন অগ্নি আর তার দাহিকা শক্তি; - অগ্নি মানলেই দাহিকা শক্তি মানতে হয়, দাহিকা শক্তি ছাড়া অগ্নি ভাবা যায় না। সূর্যেকে বাদ দিয়ে সূর্যের রশ্মি ভাবা যায় না।"

তাই এই এক ব্রহ্ম এবং শক্তিকেই আমরা বিভিন্ন নামে অভিহিত করি—
▪ পুরুষ + প্রকৃতি
▪ ব্রহ্মা + ব্রহ্মাণী (সরস্বতী)
▪ বিষ্ণু + বৈষ্ণবী (লক্ষ্মী)
▪ মহেশ্বর + মাহেশ্বরী (কালী)

তিনি এক কিন্তু রুচির বৈচিত্র্যময়তার জন্যে প্রকাশ অনন্ত।
সনাতন ধর্মানুসারে চিন্তার অতীত পরমেশ্বর যে রূপে সৃষ্টি করেন সেই রূপের নাম ব্রহ্মা, যে রূপে জগৎ পালন করেন সেই রূপের নাম বিষ্ণু এবং যে রূপে লয় বা নাশ করেন সেই রূপের নাম শিব বা মহেশ্বর। এ সহজ  কথাটিই শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়ে খুব সুন্দর করে দেয়া আছে।

"প্রকৃতির তিনটি গুণ-সত্ত্ব, রজ এবং তম। পরমেশ্বর এক হলেও এই তিনটি গুণের প্রভাবে বিশ্বের সৃষ্টি -স্থিতি-লয়ের জন্যে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর রূপ ধারণ করেন।"

ওঁ এক  শক্তিকেই আমরা বিভিন্ন শাস্ত্রে বিভিন্ন নামে প্রকাশ পাই—
                                   ওঁ
               ব্রহ্মা + ব্রহ্মাণী + মহাসরস্বতী
                 বিষ্ণু + বৈষ্ণবী + মহালক্ষ্মী
                  শিব + শিবানী + মহাকালী
                             ব্রহ্ম + শক্তি
                           পুরুষ + প্রকৃতি

চন্দ্র ও চন্দ্রের কিরণ দুধ ও দুধের ধবলতার ন্যায় এক ও অভেদ।

ব্রহ্ম জগৎ সৃষ্টির এক মহাশক্তি বিষ্ণুকে জগতের সৃষ্টি পালনের। মহেশ্বরকে জগতের সৃষ্টি প্রলয়ের গুণ কর্ম অনুসারে এই তিন শক্তিকে এক সত্ত্বা পরমব্রহ্মকে এই জগতের মহাগুরু বলা হয়েছে যাকে আমরা ওঁ নামে জানি।

ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, এরাই পরব্রহ্ম স্বরূপ; সেই তিন গুণশক্তি ঈশ্বরকেই বুঝানো হয় সেই তিন শক্তিকে এক সত্ত্বা পরমব্রহ্মকে ধ্যানের মধ্যে উপাসন করি।

ব্রহ্ম শব্দের অর্থ সর্ব্ববৃহৎ। যাঁর থেকে বড় কেউ নেই যিনি সকল কিছুর স্রষ্টা এবং যাঁর মধ্যে সকল কিছুর অবস্থান ও বিলয় তিনিই ব্রহ্ম।

যে সকল কিছুই সৃষ্টি করেছেন ব্রহ্ম, সে সকল কিছুর পালন করেছেন আছেন, আর যে সবকিছুই প্রলয় করে থাকেন মহেশ্বর। ত্রিমূর্তির ভেতরে এক সত্ত্বাধিকারী পরমব্রহ্ম এই হলো চৈতন্যময় সত্ত্বা।


মহর্ষি_পতন্জলী_যোগদর্শনে


"ক্লেশকর্মবিপাকশৈয়রপরামৃষ্টঃ পুরুষবিশেষ ঈশ্বরঃ;
(যোগদর্শন, ১।২৪)

ভাবার্থঃ— ক্লেশ, কর্ম, বিপাক ও আশয় এই চারের সঙ্গে যার কোন সম্বন্ধ নেই যিনি সমস্ত পুরুষের মধ্যে উত্তম, তিনিই ঈশ্বর।

দেখুন এখানে,—
১) ক্লেশঃ— অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ, অভিনিবেশ।
২) কর্মঃ— পূণ্য, পাপ, পূণ্যও পাপমিশ্রিত এবং পাপ পূণ্যরহিত।
৩) বিপাকঃ— কর্মফলের নাম বিপাক।
৪) আশয়ঃ— যাবতীয় কর্ম সংস্কারের নাম আশয়।
এই চারের সাথে সমন্ধহীন উত্তম পুরুষই ঈশ্বর পদবাচ্য।

এজন্যই ঈশ্বরকে "আনন্দময় " বলা হয়েছে।
অর্থাৎ তিনি কখনো দুঃখ, ক্লেশ, কর্মফল ভোগ করেন না। তিনি সর্বদা আনন্দময় স্বরূপে স্থিত।

যদি এরূপ বলা হয় যে, ঈশ্বর পৃথিবীতে জন্মগ্রহন করেন তবে বলতে হবে তিনি তার আনন্দময় স্বরূপ থেকে বিচ্যুত হলেন। কারন জন্মগ্রহনকারীর গর্ভস্থ যন্ত্রনা, কর্মফল এবং ত্রিতাপ জ্বালা ভোগ করার প্রয়োজন পড়ে। যদি ঈশ্বর এক মুহুর্তের জন্যও তার আনন্দময় স্বরূপ থেকে বিচ্যুত হন। তবে তিনি ঈশ্বরের সঙ্গা কদাপি প্রাপ্ত হতে পারবেন না। অনেকে বলেন ঈশ্বর পৃথিবীতে জন্মগ্রহন করলেও তিনি তার স্বরূপ চ্যুত কখনো হন না। এটা অনেক বড় ভূল কথা কারণ পঞ্চভৌতিক দেহ ধারণ করলে সে দেহে জরা ব্যাধি, দুঃখ আসবেই। এমন কোন উদাহরন কেউ দিতে পারবেন না যিনি এই ভৌতিক দেহেকে এক মুহুর্তের জন্যও দুঃখ পাইনি।

ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয় তিনি এক সত্ত্বাধিকারী পরমব্রহ্ম এই হলো চৈতন্যময় সত্ত্বা আমাদের মধ্যে রয়েছেন সাকার ও নিরাকার দৃশ্যে।


    ব্রহ্মের_রূপ_কি

রূপং রূপং প্রতিরূপো বভুব তদস্য রূপং প্রতিচক্ষণায় ৷
ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে যুক্তা হস্য হরয়াঃ শতা দশ ৷।
                      (ঋগ্বেদ, ৬/৪৭/১৮)

অনুবাদঃ— “রূপে রূপে প্রতিরূপ (তাহার অনুরূপ) হইয়াছেন, সেই ইহার রূপকে প্রতিখ্যাপনের (জ্ঞাপনের) জন্য ইন্দ্র মায়াসমূহের দ্বারা বহুরূপ প্রাপ্ত হন। যুক্ত আছে ইহার অশ্ব শত দশ (অর্থাৎ সহস্র)৷”

পদার্থঃ— (ইন্দ্রঃ) জীবাত্মা (রূপং-রূপং প্রতিরূপ
বভুব) প্রত্যেক প্রানির রূপে তদাকার হয়ে বিরাজমান
হন। (তত্ অস্য রূপং প্রতি চক্ষনায়) তাহা এই রূপে
আধাত্ম দৃষ্টি দ্বারা দেখায় যোগ্য। এই জীবাত্মা (সায়াভি) নানা বুদ্ধি দ্বারাই (পুরু-রূপঃ ইয়তে) নানা রূপের জানা যায়। (অস্য ইহার শাসনে, দেহ মধ্যেই (দশ শতা হরয়ঃ) দশ শত প্রানগন অশ্ব বা ভূত্যের সমান (যুক্তাঃ) যুক্ত জ্ঞান তন্তু তথা শক্তিতন্তু রূপে কাজ করে।

ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!

আসুন, আমরা সবাই বেদের শুভ্র জ্ঞানের পথ অনুসরন করে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করি।

SVS
    চট্টগ্রাম বিভাগীয় এক্টিভ কর্মী
        শ্রী বাবলু মালাকার
             (সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, চট্টগ্রাম)

বি:দ্রঃ— পোস্ট কপি করতে পারেন অবশ্যই কিন্তু কার্টেসী গুলো কাটতে পারবেন না।

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের পবিত্রতম চিহ্ন স্বস্তিকা।

স্বস্তিকা,পবিত্রতম চিহ্ন স্বস্তিকা।

স্বস্তিকা প্রতীক শুধুমাত্র সনাতন ধর্মের নয়। বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মেরও প্রতীক। বৌদ্ধদের ধর্মচক্রের পর দ্বিতীয় প্রতীক। জৈন ধর্মাবলম্বীদের একমাত্র প্রতীক হলো স্বস্তিকা। আর হিন্দু সম্প্রদায়ের ওঙ্কারের ॐ পরে 卐 স্বস্তিকা দ্বিতীয় পবিত্র প্রতীক হিসাবে পূজিত। স্বস্তিকা মূলত সনাতন ধর্মের শুভমঙ্গল চিহ্ন। আমাদের ভারতবর্ষের প্রাচীনকাল থেকে শুভমঙ্গল চিহ্ন, সেবাময় প্রতীক, শান্তির প্রতীক এবং কল্যাণময় ঈশ্বরের প্রতীক বলে বিবেচিত হয়ে আসা এই— 卐 স্বস্তিকা পবিত্র বেদে স্বস্তি নামে আছে।


স্বস্তি শান্তিপাঠ

ওঁ ভদ্রং কর্ণেভিং শৃণুয়াম দেবাঃ।
ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্য জত্রাঃ
স্থিরৈঃ অঙ্গৈঃ তুষ্টু বাংসঃ তনুহভিঃ।
ব্যশেম দেবহিতং যৎ আয়ুঃ।
ওঁ স্বস্তি নো ইন্দ্রো বৃদ্ধশ্রবাঃ।
স্বস্তি নঃ পূষা বিশ্বদেবাঃ।
স্বস্তি নোস্তার্ক্ষ্যো অরিষ্টনেমিঃ।
স্বস্তি নো বৃহস্পতির্দধাতু।।
ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ ।।
(ঋগ্বেদ ১/৮৯/৮, ৬) [১]

অর্থাৎ— হে দেবগণ, আমরা যেন কান দিয়ে কল্যানবচন শুনি; হে যজনীয় দেবগণ, আমরা চোখ দিয়ে যেন সুন্দর বস্তু দেখি; সুস্থদেহের অধিকারী হয়ে আজীবন আমরা যেন তোমাদের স্তবগান করে দেবকর্মে নিয়োজিত থাকি। বৃদ্ধশ্রবা ইন্দ্র আমাদের মঙ্গল করুন; সকল জ্ঞানের আধার ও জগতের পোষক পূষা আমাদের মঙ্গল করুন; অহিংসার পালক তার্ক্ষ্য (গরুড়) আমাদের মঙ্গল করুন। ওঁ আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক - এই ত্রিবিধ বিঘ্নের বিনাশ হোক।


ওঁ ভদ্রং কর্ণেভিঃ শৃণুয়াম দেবা ভদ্রং পশ্যেমাক্ষভির্যজত্রাঃ।
স্থিরৈরঈি্মস্তষ্টুবাঁ্ সস্তনূভির্ব্যশেম দেবাহিতং যদায়ুঃ।।
স্বস্তি ন ইন্দ্রো বৃদ্ধশ্রবাঃ স্বস্তি নঃ পূষা বিশ্ববেদাঃ।
স্বস্তি নস্তার্ক্ষ্যো অরিষ্টনেমিঃ স্বস্তি নো বৃহস্পতির্দধাতু।।
                      (সামবেদ, ২৫/২১)

অনুবাদঃ— হে দেবগণ! অামরা ভগবানের অারাধনা করতে করতে কর্ণগুলি দ্বারা কল্যাণময় বচন শুনি নেএগুলির দ্বারা কল্যাণ  ই দেখি সুদৃঢ় অঙ্গগুলির এবং শরীররগুলির দ্বারা ভগবানের স্তুতি করতে করতে অামরা যে অায়ু অারাধ্যদেব পরমাত্মার কর্মে অাসে তার উপভোগ করি চতুর্দিকে প্রসারিত সুযশস্বী ইন্দ্র অামাদের জন্য কল্যাণ পোষণ করুন বিশ্ব-ব্রক্ষাণ্ডের জ্ঞাতা পূষা অামাদের জন্য কল্যাণ পোষণ করুন অরিষ্টসমূহকে সমাপ্ত করার জন্য চক্রসদৃশ শক্তিশালী গরুড়দেব অামাদের জন্য কল্যাণ পোষণ করুন তথা দেবগুরু বৃহস্পতিও অামাদের জন্য কল্যাণ করুন পরমাত্মন্! অামাদের ত্রিবিধ তাপ যেন শান্ত হয়।

ঋগ্বেদের পুষ্ট "বায়ু" সোম ও বৃহস্পতি "স্বস্তি" ঐশ্বর্য্য পন্থা—          (ঋগ্বেদ, ৫/৫১/১১-১৫)


ওঁ স্বস্তি নো মিমীতামশ্বিনা ভগঃ স্বস্তি দেব্য দিতিরন বর্ণঃ।
স্বস্তি পূষা অসুরো দধাতু নঃ স্বস্তি দ্যাবাপৃথিবী সুচেতুনা।।
                   (ঋগ্বেদ, ৫/৫১/১১)

অনুবাদঃ— উপাস্য প্রভু দিন ও রাত্রিকে আমাদের জন্য কল্যাণকারী করুন। প্রভুর অখণ্ডনীয় দিব্য শক্তি অলসদের অন্তরে উৎসাহের সঞ্চার করুক। পুষ্টিশক্তি সম্পন্ন বৃষ্টি কল্যাণকারিণী হউক। দ্যুলোক ও ভূলোক চেতন জীব দ্বারা আমাদের কল্যাণ সাধন করুক।


ওঁ স্বস্তয়ে বায়ুমুপ ব্রবামহৈ সোমং স্বস্তি ভুবনস্য যস্পতিঃ।
বৃহস্পতিং সর্বগণং স্বস্তয়ে স্বস্তয় আদিত্যাসো ভবন্তু নঃ।।
(ঋগ্বেদ, ৫/৫১/১২)

অনুবাদঃ— কল্যাণের জন্য আমরা বায়ুর কীর্ত্তি গান করি, ব্রক্ষ্মাণ্ডের পোষক চন্দ্রমার কীর্ত্তি গান করি, সকলে মিলিত হইয়া বৃহস্পতির কীর্ত্তি গান করি। অখণ্ড পরমাত্মা আমাদের কল্যাণ বিধান করুন।


ওঁ বিশ্ব দেবা নো অদ্যা স্বস্তয়ে বৈশ্বানরো বসুরগ্নিঃ স্বস্তয়ে।
দেবা অবন্ত্বৃ ভব স্বস্তয়ে স্বস্তিনো রুদ্রঃ পাত্বংহসঃ।।
                  (ঋগ্বেদ, ৫/৫১/১৩)

অনুবাদঃ— দিব্যগুণ সমূহ আমার প্রতি আজ মঙ্গল দায়ক হউক, সব মনুষ্যের মধ্যে বিরাজমান এবং সকলের অধিষ্ঠাতা অগ্নি কল্যাণদায়ক হউক, প্রকাশমান বিদ্বানেরা রক্ষা করুন, পরমাত্মা আমাদিগকে পাপ হইতে শান্তির জন্য রক্ষা করুন।


ওঁ স্বস্তি মিত্রাবরুণা স্বস্তি পথ্যে রেবতি।
স্বস্তি ন ইন্দ্রশ্চাগ্নিশ্চ স্বস্তিনো অদিতে কৃধি।।
                   (ঋগ্বেদ, ৫/৫১/১৪)

অনুবাদঃ— প্রাণ ও অপান কল্যাণময় হউক, ধনাগমের পথ কল্যাণময় হউক। ঐশ্বর্য্য ও অগ্নি কল্যাণময় হউক।হে পরমাত্মা আমাদের কল্যাণ সাধন কর।


ওঁ স্বস্তি পন্থামনুচরেম সূর্য্যাচন্দ্রমসাবিব।
পুর্নদদতাঘ্নতা জানতা সঙ্গমে মহি।।
                  (ঋগ্বেদ, ৫/৫১/১৫)

অনুবাদঃ— সূর্য্য ও চন্দ্রের ন্যায় আমার কল্যাণমার্গে চলিব এবং দানশীল অহিংসক বিদ্বান্ পুরুষের সঙ্গ লাভ করিব।

             
ওঙ্কার সর্বশ্রেষ্ঠ একমাত্র মহামন্ত্র

ওঁ প্রকৃতপক্ষে কি?

সনাতন ধর্মের মহামন্ত্র ওঁ যা আমাদের মৃত্যুর ভয় থেকে মুক্ত করে মোক্ষলাভ করাবে। যা আমাদের আত্মার উপলদ্ধি করাবে। কারণ সনাতন ধর্মে মোক্ষলাভই সর্বোচ্চ পদ তাই ওঁ ছাড়া কোনো গতি নেই।

তাহলে চলুন দেখা যাক— বেদ, উপনিষদ, মনুসংহিতা ও গীতায় ওঙ্কার কি


পবিত্র বেদ


বায়ুবনিলমমৃতমথেদং ভস্মান্তং শরীরম।
ওম ক্রতো স্মার ক্লিবে স্মর কৃতং স্মর।
                 (যর্জুবেদ, ৪০/১৫) 

অনুবাদঃ— হে কর্মশীল জীব। শরীর ত্যাগের সময় পরমাত্মার নাম ওঙ্কার স্মরণ কর। আধ্যাত্বিক সামর্থ্যকেকে স্মরণ কর। প্রথমে আধ্যাত্বিক প্রাণ, অধিদৈবিক প্রাণ এবং পুনরায় প্রাণ স্বরুপ পরমাত্মাকে (ওঁ) প্রাপ্ত হও।
                           
উপনিষদ

যদর্চিমদ্ যদণুভ্যোহণু চ, যস্মিঁল্লোকা নিহিতা লোকিনশ্চ
তদেতদক্ষরং ব্রহ্ম স প্রাণস্তদু বাঙমনঃ।
তদেতৎ সত্যং তদমৃতং তদ্বেদ্ধব্যং সোম্য বিদ্ধি।।
                  (মুণ্ডক উপনিষদ, ২/২/২)

অনুবাদঃ— যিনি দীপ্তিমান্, যিনি সূক্ষ্ম বস্তুসমূহে হইতে সূক্ষ্ম এবং যিনি স্থূল হইতে স্থূল, যাঁহাতে লোকসমূহ এবং লোকবাসিগণ অবস্থিত, তিনিই সর্বাস্পদ অক্ষর ব্রহ্ম। তিনিই প্রাণ, তিনিই আবার বাক্ ও মন। সেই ব্রহ্মই সত্য, সেই ব্রহ্মই অমৃত। হে সোম্য তাহাকেই ভেদ কর।


ধনুর্গৃহীত্বৌপনিষদং মহামন্ত্রং শরং হু্যপাসানিশিতংসন্ধয়ীত
আয়ম্য তদ্ভাবগতেন চেতসা লক্ষ্যং তদেবাক্ষরং সোম্য বিদ্ধি।।
            (মুণ্ডক উপনিষদ, ২/২/৩)

অনুবাদঃ— হে সোম্য, উপনিষদে প্রসিদ্ধ মহান্ত্র ধনু গ্রহণ করিয়া উহাতে সতত-চিন্তাদ্বারা তীক্ষ্ণীকৃত বাণসন্ধান করিবে, ধনু আকর্ষণপূর্বক লক্ষ্যে চিত্ত নিবিষ্ট করিয়া লক্ষ্য সেই অক্ষরকেই ভেদ কর।


প্রণবো ধনুঃ শরো হ্যাত্মা ব্রহ্ম তল্লক্ষ্যমুচ্যতে।
অপ্রমত্তেন বেদ্ধব্যং শরবত্তন্ময়ো ভবেৎ।
           (মুণ্ডক উপনিষদ, ২/২/৪)

অনুবাদঃ— ওঙ্কারই ধনু, জীবাত্মাই শর, ব্রহ্ম উক্ত শরের লক্ষ্য বলিয়া কথিত হন। প্রমাদহীন হইয়া লক্ষ্য ভেদ করিতে হইবে। অতঃপর শরের ন্যায় তন্ময় (লক্ষ্যের সহিত অভিন্ন) হইবে।


যস্মিন্ দৌঃ পৃথিবী চান্তরিক্ষম্ ওতং মনঃ সহপ্রাণৈশ্চ সর্বৈঃ তমেবৈকং
 জানথ আত্মানম্ অন্যা বাচো বিমুঞ্চথামৃতসৈ্যষ সেতুঃ।
          (মুণ্ডক উপনিষদ, ২/২/৫)

অনুবাদঃ— যাঁহাতে দ্যুলোক, পৃথিবী ও অন্তরিক্ষ এবং ইন্দ্রিয়বর্গসহ অন্তঃকরণ সমর্পিত আছে (মনুষ্য ও প্রাণীগণের)। সেই অদ্বিতীয় আত্মাকেই অবগত হও এবং অনন্তর অপর সকল বাক্য ত্যাগ কর। এই আত্মজ্ঞানই মোক্ষপ্রাপ্তির উপায়।


অরা ইব রথনাভৌ সংহতা যত্র নাড্যঃ স এষোহন্তশ্চরন্তে বহুধা জায়মানঃ।
ওমিত্যেবং ধ্যায়থ আত্মানং স্বস্তি বঃ পারায় তমসঃ পরস্তাৎ।।
           (মুণ্ডক উপনিষদ, ২/২/৬)

অনুবাদঃ— চক্রশলাকা যেরুপ রথচক্রের নাভিতে অবস্থিত থাকে সেইরুপ নাড়ীসমূহ যে হৃদয়ে সম্প্রবিষ্ট আছে, সেই হৃদয়মধ্যে উক্ত পুরুষ নানারুপে প্রতীত হইয়া বর্তমান আছেন। উক্ত আত্মাকে ওঙ্কার অবলম্বনপূর্বক ধ্যান কর। অজ্ঞানান্ধকারের অতীত পরপারে গমনের জন্য তোমাদের স্বস্তি হউক।
                       
  মনুসংহিতা

ওঙ্কারপূর্বিকাস্তিস্রো মহাব্যাহৃতয়েহিব্যায়াঃ
ত্রিপদা চৈব সাবিত্রী বিজ্ঞেয়ং ব্রহ্মণো মুখম।।
              (মনুসংহিতা, ২/৮১)

অর্থাৎ— পূর্বে ওঙ্কার এবং অবিনাশী মহাব্যাহৃতি (ভূঃ,ভুবঃ,স্বঃ) উচ্চারণপূর্বক ত্রিপদী গায়ত্রী হল ব্রহ্ম প্রাপ্তির একমাত্র উপায় বলে জানবে।


গীতায়

ওমিত্যেকাক্ষরং ব্রহ্ম ব্যাহরন্ মামনুস্মরন্ ।
যঃ প্রয়াতি ত্যজন্ দেহং স যাতি পরমাং গতিম্ ।।
                   (গীতা, ৮/১৩)

অর্থঃ— ॐ (ওঁ) এই একাক্ষর ব্রহ্ম উচ্চারণপূর্বক করতে করতে এবং তার অর্থস্বরূপ নির্গুণ ব্রহ্মরূপ আমাকে স্মরণ করতে করতে দেহত্যাগ করেন তিনি পরমগতি অর্থাৎ মোক্ষ প্রাপ্ত হন।

ॐ ওঙ্কার বেদ, উপনিষদ, মনুসংহিতা ও গীতা অনুযায়ী মহামন্ত্র হিসাবে পূজিত। ওঁ উচ্চারণ সবাই করতে পারে। ওঁ উচ্চারণ পারে না এমন কোন মানুষ নেই। তাই সনাতন ধর্মে একটাই মহামন্ত্র কেবল ওঙ্কার।

ॐ ওঙ্কার একটি মহামন্ত্র তাহাকে সকলে অবলম্বন কর।


ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ ওঁ শান্তিঃ

জয় শ্রীরাম
হর হর মহাদেব
 SVS
চট্টগ্রাম বিভাগীয় এক্টিভ কর্মী
শ্রী বাবলু মালাকার
(সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ, চট্টগ্রাম)

ভগবান বিষ্ণুর তপোভূমি বদ্রিনাথ মন্দির। জানুন সেই মন্দিরের পৌরাণিক কাহিনী।

ভগবান বিষ্ণুর তপোভূমি বদ্রিনাথ মন্দির। জানুন সেই মন্দিরের পৌরাণিক কাহিনী।

হিমালয়ের কোলে অবস্থিত বদ্রীনাথ মন্দির। ছ’মাস বন্ধ থাকার পর খুলে গেল সেই মন্দির। আগামী ছ’মাস এই মন্দির দর্শন করতে পারবেন ভক্তরা। হাজার হাজার মানুষ যাবেন প্রত্যেকদিন।
ভারতের উত্তরাখণ্ডের বদ্রীনাথ শহরে অবস্থিত এই মন্দিরটিতে বিষ্ণু দেবতার পূজা করা হয়৷ তিনিই এখানে বদ্রীনাথ হিসেবে পরিচিত। উত্তরাখণ্ডের চারধামের মধ্যে অন্যতম এটি। বাকি তিনটি হল কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী ও যমুনেত্রী।
শীতকালে এই মন্দিরটি ভক্তদের দর্শনের জন্য একেবারেই বন্ধ থাকে৷ শুক্রবার থেকে এই মন্দিরটি ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হল ।
কিন্তু কেন এত বিখ্যাত এই মন্দির?
কথিত আছে, এই মন্দিরটি খুবই জাগ্রত৷ দেশ বিদেশ থেকে ভক্তরা এই মন্দিরে আসেন মনষ্কামনা পূরণের উদ্দেশে৷ মে মাস থেকে নভেম্বর অবধি খোলা থাকে এই মন্দির৷ বদ্রীনাথ ভারতের জনপ্রিয় তীর্থগুলির মধ্যে এটি একটি৷ প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বিষ্ণুপুরাণে এই মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে৷
১) অলকানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত বদ্রীনাথে বসেই ঋষি বেদব্যাস মহাভারত মহাকাব্যটি লিখেছিলেন৷ প্রায় ১০ লক্ষ শব্দের এই মহাকাব্যটি হিন্দুদের প্রধান মহাকাব্য৷ এটিই বিশ্বের সবথেকে বড় মহাকাব্য৷ তাই বদ্রীনাথে গেলে আজও শোনা যাবে মহাভারতের নানা গল্প, বিভিন্ন ঘটনা যা বদ্রীনাথেই ঘটেছিল বলে কথিত আছে। দেখা যাবে পাণ্দবদের স্বর্গে যাওয়ার রাস্তাও।
২) বদ্রীনাথে শিব ব্রহ্মার মুন্ডচ্ছেদ করার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করেন৷ আর সেই প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যই তিনি এই মন্দিরটি তৈরি করার জন্য উদ্যোগ নেন৷ শিব পাঁচটির মধ্যে একটি মুণ্ডচ্ছেদ করার জন্যই এই মন্দিরটি তৈরি করেন৷ ব্রহ্মা কপাল নামেও তাই পরিচিত এই মন্দিরটি৷
৩) মন্দিরটি তিনটি পৃথক অংশে বিভক্ত৷ গর্ভগৃহ, দর্শন মণ্ডপ ও সভামণ্ডপ নামে পরিচিত৷ এই মন্দিরটির মাথায় সোনার রংয়ের একটি গম্বুজ রয়েছে৷ মন্দিরের সম্মুখ ভাগটি পাথরের তৈরি৷ চারপাশ পাহাড়ে ঘেরা। মাঝে উপত্যকায় এই মন্দির।
৪) পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, বিষ্ণু দেবতা এখানে বদ্রীনাথ রূপে পূজিত হন৷ ত্রেতা যুগেই একমাত্র মুনি ঋষিদের কাছে এই মন্দিরটির আসল চেহারা প্রকাশ্যে এসেছিল৷ তারপর থেকেই এই পুজো হয়ে আসছে।
৫) এই জায়গাটির নাম ছিল তপোভূমি ৷ এই জায়গাটিতেই বহু বছর ধরে ধ্যান করেছিলেন বিষ্ণু দেবতা৷ আর সেই সময়ই তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী তাঁকে ছায়া দেওয়ার জন্য গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তার উপরে৷ স্ত্রী’র উপর খুশি হয়ে এরপরই ওই জায়গাটির নাম দেন বিষ্ণু বদ্রীনাথ৷

By : Kolkata24x7

মরিশাসের মঙ্গল প্রদায়ক দেবাদিদেব মঙ্গল মহাদেব। জানুন বিস্তারিত।

SVSBD,মরিশাসের মঙ্গল প্রদায়ক দেবাদিদেব " মঙ্গল মহাদেব "। জানুন বিস্তারিত।


আফ্রিকার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মরিশাস । সেই মরিশাসের সাভান্নি জেলার গঙ্গা তালাও এর (গ্র্যান্ড ব্যাসিন) প্রবেশদ্বারে ত্রিশুল হাতে নিয়ে মরিশাসের মঙ্গল প্রদায়ক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে দেবাদিদেব মহাদেবের লম্বা ভাস্কর্য " মঙ্গল মহাদেব " (১০৮  ফুট) । এটা মরিশাসের সবচেয়ে লম্বা মূর্তি। মঙ্গল মহাদেবের একটি প্রতিরূপ মূর্তি আছে ভারতে গুজরাটের ভাদোদারায় সুরসাগর হ্রদে ।


উদ্বোধন
২০০৭ সালে মঙ্গল মহাদেব স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয় এবং "স্থাপন" ২০০৮ সালের মহা শিবরাত্রিতে হয়। এটি মরিশাসে সবচেয়ে পবিত্র তীর্থস্থান বলে মনে করা হয়। শিব মন্দিরের চারপাশে দুর্গা , হনুমান , লক্ষ্মী ও গণেশ এবং গ্র্যান্ড বাসিনের তীরে মঙ্গল মহাদেব মূর্তি সহ অন্যান্য দেবদেবীদের নিবেদিত মন্দির রয়েছে। শিবরাত্রি চলাকালীন, মরিশাসের অনেক তীর্থযাত্রীরা তাদের বাড়ি থেকে হ্রদ পর্যন্ত পায়ে হেঁটে আসে এবং ভাস্কর্যের পায়ে প্রার্থনা করে। 
By : Wikipedia

স্ট্যাচু অফ লিবার্টি কে হার মানানো গরুড় বিষ্ণু কাঞ্চনা স্ট্যাচু ।

SVSBD,স্ট্যাচু অফ লিবার্টি কে হার মানানো গরুড় বিষ্ণু কাঞ্চনা স্ট্যাচু ।

গরুড় বিষ্ণু কাঞ্চনা মূর্তি (অথবা জিডব্লিউকে মূর্তি ) হল ১২১ মিটার লম্বা মূর্তি ।যা গরুড় বিষ্ণু কাঞ্চনা কালচারাল পার্কে অবস্থিত। এটি নিওমান নুয়ারতা দ্বারা ডিজাইন কৃত ।২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে এর উদ্বোধন করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভের মোট উচ্চতা ১২১ মি (৩৯৭ ফু) , ৪৬ মিটার বেস স্তম্ভমূল সহ ।
মূর্তিটি স্ট্যাচু অফ লিবার্টির থেকে প্রায় ৩০ মিটার উঁচু, কিন্তু লিবার্টি লম্বা ও পাতলা এবং গরুড় প্রায় ততটাই চওড়া যতটা প্রশস্ত - এর পক্ষপ্রসার ৬৪ মি। এই মূর্তিটি ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে লম্বা মূর্তি হিসেবে নির্মিত হয়েছিল, যা অমৃত অনুসন্ধান সম্পর্কে হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
এই পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, গরুড় তাঁর ক্রীতদাসী মাকে মুক্ত করার জন্য অমৃত ব্যবহার করার বিনিময়ে বিষ্ণুর বাহন হতে সম্মত হন। ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই এই স্মৃতিস্তম্ভটি সমাপ্ত হয়েছিল । ২০১৮ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি জোকো উইডোডোও এর উদ্বোধন করেন।

ইতিহাস

মূর্তি নির্মাণের জন্য আঠারো বছর এবং প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার লেগেছিল। জিডব্লিউকে কে ১৯৯০ সালে নিওমান নুয়ারতা পর্যটন মন্ত্রী জোওপ আভে, বিদ্যুৎ মন্ত্রী আইবি সুদজানা ও বালির গভর্নর আইবি ওকাকার অধীনে এর পরিকল্পনা করেছিলেন। মূর্তি নির্মাণের যুগান্তকারী ঘটনা ১৯৯৭ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৯০ এর দশকের শেষের দিকে এই প্রকল্পটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের সংমিশ্রণ শক্তির দ্বারা হঠাৎ স্থগিত হয়েছিল।এর নির্মাণ কাজ ২০১৩ সালে ষোল বছরের বিরতির পরে পুনরায় শুরু হয়।যখন সম্পত্তি ডেভেলপার পিটি আলম সুতারা রয়্যালটি টিবিকে (এএসআর) মূর্তি ও প্রকল্প নির্মাণের জন্য অর্থায়ন করতে রাজি হয়। স্মৃতিস্তম্ভের ধারণাটি বিতর্ক ছাড়া ছিল না। দ্বীপের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে যে এর বিশাল আকার দ্বীপটির আধ্যাত্মিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করতে পারে এবং তার বাণিজ্যিক প্রকৃতি অনুপযুক্ত । তবে কিছু দল প্রকল্পটির সাথে একমত হয়। কারণ এটি নতুন পর্যটক আকর্ষণ করবে।
মূর্তিটি পশ্চিম জাভার ৭৫৪ বিচ্ছিন্ন মডিউল এ নির্মিত হয়েছিল এবং তারপর এটি বালির বানদুং এ স্থানান্তরিত হয়েছিল। ক্রেনের সর্বাধিক লোড মিটমাট করার জন্য মডিউলগুলি ১,৫০০ ছোট টুকরতে কেটে ফেলা হয়েছিল। বিস্ময়কর শিল্পকর্মের উপর স্থাপিত শেষ টুকরাটি তার লেজে ছিল। যা মূর্তির সর্বোচ্চ বিন্দুতে অবস্থিত। গরুড়ের আকৃতি এত জটিল যে প্রকৌশলীরা একে সমর্থনকারী কাঠামোর বিশেষ সংযোজকগুলিকে ডিজাইন করেন।যাতে একই সাথে ১১ টি বড় স্টিলের গার্ডার একসঙ্গে আছে। তবে স্বাভাবিক নির্মাণ জয়েন্টগুলিতে চার বা ছয়টি গার্ডার রয়েছে। গরুড় বিষ্ণু কাঞ্চনা মূর্তিটি ঝড় ও ভূমিকম্প প্রতিরোধের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং পরবর্তী ১০০ বছরের জন্য এটি টিকে থাকার আশা করা হচ্ছে।
সম্পূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভটি ২১ তলা ভবনের সমান লম্বা। এটি ইন্দোনেশিয়ার সবচেয়ে ভারী মূর্তি ।এর ওজন ৪০০০ টন । শিল্পকর্মটি তামা ও পিতল দিয়ে তৈরি হয়েছে ।এটি ২১,০০০ ইস্পাত বার এবং ১৭০,০০০ ব্ল‌োট দ্বারা সমর্থিত। মূর্তিটি তামা এবং পিতলের শিট দিয়ে তৈরি । যাতে একটি স্টেইনলেস স্টিলের ফ্রেম এবং কাঠামোর সাথে একটি ইস্পাত এবং কংক্রিট কোর কলাম আছে। বাইরের আচ্ছাদন ব্যবস্থা ২২০০ মি স্কয়ার ব্যবস্থা। বিষ্ণুর মুকুটটি সোনালি মোজাইক দিয়ে আচ্ছাদিত এবং মূর্তির একটি নিবেদিত আলোক ব্যবস্থা রয়েছে। ভাস্কর্যটি বিল্ডিং বেসের উপরে বসানো। যা একটি রেস্টুরেন্ট, যাদুঘর, এবং দেখার গ্যালারি হিসাবে কাজ করবে। 

By : Wikipedia

অমর বিপ্লবী প্রীতিলতা ।

অমর বিপ্লবী প্রীতিলতা । vedic sanatan hinduism

স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিতেও পারব, প্রাণ নিতেও মোটেও মায়া হবে না। কিন্তু নিরীহ জীব হত্যা করতে সত্যি মায়া হয়, পারব না- এই উক্তিটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মরণীয় নাম প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের।
প্রীতিলতার নাম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে অনেক বিপ্লবী পুরুষের নাম শোনা গেলেও নারী বিপ্লবীর নাম কমই শোনা যায়। তাদের মধ্যে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার নামটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে এবং থাকবে।
একজন নারী সেই সময়ের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে যেভাবে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন তা আজও মানুষের মনে অম্লান। তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। প্রীতিলতার জন্ম ১৯১১ সালের ৫ মে এবং মৃত্যু ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নায়ক মাস্টারদা সূর্যসেনের নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। দেশের জন্য, দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন প্রীতিলতা।
যে বছর তিনি শহীদ হন সে বছর পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব দখলের সময় তিনি ১৫ জনের একটি বিপ্লবী দল পরিচালনা করতেন। সেই ক্লাবের একটি সাইনবোর্ডের লেখা থেকে ভারতীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের ঘৃণা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়।
এ ক্লাবের একটি সাইনবোর্ডে লেখা ছিল ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’। এই একটি বাক্য থেকেই বোঝা যায় সাদা চামড়ার সাহেবরা ভারতীয়দের নিুশ্রেণীর কোনো প্রাণী থেকে ভিন্ন কিছু মনে করত না। এছাড়াও পদে পদে ভারতীয়দের অবমূল্যায়ন করা হতো। এসব অবমূল্যায়ন ক্রমেই মনে গভীরভাবে দাগ কাটতে শুরু করেছিল সমগ্র ভারতবাসীর মনে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে বহু নাম জড়িয়ে রয়েছে। বহু বিপ্লবীর রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে ভারত এবং পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। মাস্টারদার যোগ্য শিষ্য ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।
১৯৩২ সালের ১৩ জুন চট্রগ্রামের বিপ্লবীদের প্রধান কেন্দ্র ধলঘাটের ঘাঁটিতে মাস্টারদার সঙ্গে প্রথম দেখা করেন প্রীতিলতা। স্কুলজীবন থেকেই প্রীতিলতা মনে স্বাধীনতার ইচ্ছা পোষণ করতেন।
সেটা তার পড়া বইয়ের তালিকা থেকেই বোঝা যায়। প্রীতিলতা যখন দশম শ্রেণীর ছাত্রী তখন লুকিয়ে লুকিয়ে বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম, দেশের কথা আর কানাইলাল পড়তেন। এসব বই প্রীতিলতাকে বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। তিনি ভেতরে ভেতরে দেশকে শত্রুমুক্ত করার স্বপ্ন দেখতে থাকেন।
ব্রিটিশ শাসন থেকে দেশের মানুষকে বাঁচানোর চিন্তা করতে থাকেন।
ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পর পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে তিনি আত্মাহুতি দেন। কারণ তার কাছে জীবনের চেয়ে দেশ অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। তার কাছ থেকে যেন কোনো তথ্য ফাঁস না হয়ে যায় সে কারণেই তিনি তার কাছে থাকা বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। তার দেহে অবশ্য গুলিও লেগেছিল।
কিন্তু গুলি মৃত্যুর কারণ ছিল না বলে জানানো হয়। একদিন পর তার মৃতদেহ তল্লাশির পর তার কাছ থেকে বিপ্লবী লিফলেট, অপারেশনের পরিকল্পনা, রিভলভারের গুলি, রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ছবি এবং একটা হুইসেল পাওয়া যায়।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বিপ্লবী চেতনার যে বিশ্বাস জন্ম দিয়েছেন, তা যুগ যুগ ধরে স্বাধীনতাকামী মানুষকে প্রেরণা দিয়েছে, যা আজও প্রবহমান। কারণ বিপ্লবের মৃত্যু হয় না।
অলোক আচার্য্য : প্রাবন্ধিক, পাবনা
By : www.jugantor.com

তবে কি মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ সূত্রের জনক ভাস্করাচার্য ২।

তবে কি মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ সূত্রের জনক ভাস্করাচার্য ২। SVSBD

আধুনিক বিশ্বে সকলের ধারণা মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ শক্তি নিউটন প্রথম আবিষ্কার করেছেন | অনেকেই জানেন না যে, এ বিষয়ে  বেদে স্পষ্টভাবে আলোচনা করা হয়েছে | 


সবিতা যন্ত্রৈঃপৃথিবী মরভণাদস্কম্ভনে সবিতা দ্যামদৃংহৎ
অশ্বমিবাধুক্ষদ্ধু নিমন্তরিক্ষমতূর্তে বদ্ধং সবিতা সমুদ্রম
ঋগ্বেদ," ১০/১৪৯/১ 

অনুবাদ: "সূর্য রজ্জুবৎ আকর্ষণ দ্বারা পৃথিবীকে বাঁধিয়া রাখিয়াছে, নিরাধার আকাশে দ্যুলোকের অন্যান্য গ্রহকেও ইহা সুদৃঢ় রাখিয়াছে, অচ্ছেদ্য আকর্ষণ রর্জ্জুতে আবদ্ধ, গর্জনশীল গ্রহসমূহ নিরাধার আকাশে অশ্বের ন্যায় পরিভ্রমণ করিতেছে |" দেখুন, আকাশ যে ‘নিরাধার’ এবং ‘রজ্জুবৎ আকর্ষণ’ অর্থাৎ মহাকর্ষ শক্তির দ্বারাই যে সেই নিরাধার আকাশে সূর্য ও গ্রহসমূহ নিজ অক্ষরেখায় সুদৃঢ় রয়েছে -এখানে সেকথা বলা হয়েছে বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক ধর্মগ্রন্থে আকাশকে স্পষ্টভাবে ‘পৃথিবীর ছাদ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে অথচ এই সব ধর্মমতের জন্মেরও হাজার বছর পূর্বে বেদে আর্য ঋষিগণ আকাশকে ‘নিরাধার’ অর্থাৎ পৃথিবীকে ও গ্রহসমূহকে শূন্যে ভাসমান বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন | আরও লক্ষণীয়, মহাকর্ষ শক্তিতে আবদ্ধ গ্রহসমূহ যে নিরাধারে অর্থাৎ মহাশূন্যে স্থির নয়, বরং পরিভ্রমণ করছে নিজ কক্ষপথে -এই তত্ত্বও আবিষ্কার করেছিলেন বৈদিক ঋষিগণ , এমনকি সূর্য নিজেও যে তার নিজস্ব কক্ষপথে চলছে সেই অত্যাশ্চর্য গূঢ় বিজ্ঞানও আলোচিত হয়েছে নিম্নের মন্ত্রে : - 


"আকৃষ্ণেন রজসা বর্তমানো নিবেশয়ন্নমৃতং মর্তঞ্চ
হিরণ্ময়েন সবিতা রথেনা দেবো যাতি ভুবনানি পশ্যন্ 
ঋগ্বেদ," ১/৩৫/২ 

অনুবাদ: - "সূর্য আকর্ষণযুক্ত পৃথিব্যাদি লোক-লোকান্তরকে সঙ্গে রাখিয়া নশ্বর-অবিনশ্বর উভয় পদার্থকে নিজ নিজ কার্যে নিযুক্ত রাখিয়া এবং মাধ্যাকর্ষণ রূপে রথে চড়িয়া যেন সারা লোকান্তর দেখিতে দেখিতে গমন করিতেছে |" খুব অবাক হতে হয়, পৃথিবী যেমন চাঁদকে সঙ্গে নিয়ে সূর্যের চারপাশে প্রদক্ষিণ করছে, তদ্রুপ সূর্যও যে তার গ্রহ-উপগ্রহসমূহকে সঙ্গে নিয়ে নিজের কক্ষপথে গমন করছে -এই গভীর জ্ঞানও পবিত্র বেদে আলোচিত হয়েছে | মহাবিজ্ঞানী ভাস্করাচার্য (১১৫০ খ্রি: তাঁর ‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’ নামক জ্যোতিঃশাস্ত্রের গোলাধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন - 


“আকৃষ্টি শক্তিশ্চ মহী তয়া যৎ স্বস্থং স্বাভিমুখী করোতি
আকৃষ্যতে তৎ পততীব ভাতি সমে সমন্তাৎ কুবিয়ং প্রতীতিঃ” 

অর্থাৎ “সর্ব পদার্থের মধ্যে এক আকর্ষণ শক্তি বিদ্যমান রহিয়াছে, যে শক্তি দ্বারা পৃথিবী আকাশস্থ পদার্থকে নিজের দিকে লইয়া আসে যাহাকে ইহা আকর্ষণ করে তাহা পতিত হইল বলিয়া মনে হয়” অর্থাৎ প্রাচীন ঋগ্বেদ শাস্ত্রের পাশাপাশি ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করলেও  বিজ্ঞানী ভাস্করাচার্য (১১১৪-১১৮৫) বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটনের (১৬৪২-১৭২৭) জন্মেরও কমপক্ষে পাঁচশত বছর পূর্বে মহাকর্ষ শক্তি আবিষ্কার করে তাঁর গ্রন্থ ‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’তে আলোচনা করে গিয়েছেন |


By : Choturranga

ইতিহাসের সৃষ্টি প্রলয়ের সাক্ষী কালজয়ী দূর্গ কালিঞ্জর।

kalinjar-fort-an-indian-symbol-beyond-time

এই মথ জংলার অজ্ঞাতবাসে আমার গুপ্তশ্বাস —
ঘুর্নিজলে ​​গুলে খাচ্ছে লঘুপদ
এখন অগূড় চন্দনে মিশ্রিত শ্লোকের শুদ্ধস্বরে সংবর্ত হয়ে উঠেছে প্রশ্বাস —
বর্ধিত হচ্ছে প্রত্নদেশের চন্দ্রবর্ষে ।।
পৌরাণিক যুগে বিন্ধ্যপর্বত সমস্ত পর্বতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও মাননীয় ছিল।
মহর্ষি অগস্ত্যর শিষ্য বিন্ধ্যপর্বত নারদের অভিশাপে ক্রমশ দীর্ঘ হতে থাকলে দেবতারা প্রমাদ গোনেন। তাঁরা অগস্ত্যকে অনুরোধ করেন যথাবিহিত উপায়ের কিছু ব্যবস্থা করার। অগস্ত্য মুনি স্ত্রী লোপামুদ্রাকে নিয়ে দাক্ষিণাত্যের পথে অগ্রসর হন। বিন্ধ্য গুরু ও গুরুপত্নীকে মাথা নত করে অভিবাদন করেন। অগস্ত্য মুণি সেই অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং ‘তথাস্তু’ বলে আরও বলেন যে তিনি না ফেরা পর্যন্ত বিন্ধ্য পর্বত যেন সে ভাবেই অপেক্ষায় থাকেন। অগস্ত্য মুণি সে যাত্রায় আর ওই পথ দিয়ে ফেরেন না। সেই জন্য ‘অগস্ত্য যাত্রা’ বলে একটি শব্দবন্ধ চালু আছে। কবি শঙ্খ ঘোষের এই নিয়ে একটা অসামান্য কবিতা আছে।
সেই পর্বতে আছে এক যুগান্তরের দূর্গ। সেই বিন্ধ্য পর্বতে শৈল্যসুতা বিন্ধ্য বাসিনীর বাস।
ঋগ্বেদ থেকে মহাভারত ও অন্যান্য বিভিন্ন পুরানে দূর্গটির কথা সগৌরবে উল্লেখিত হয়েছে। ঋগ্বেদে এই দূর্গকে চেদি দেশের অঙ্গ বলে উল্লেখ করা করা হয়েছে।
যথা চিচ্চৈদ্যঃ কশুঃ শতমুষ্ট্রানাং দদত্সহস্রা দশ গোনাম্ ॥৩৭।।
যো মে হিরণ্যসংদৃশো দশ রাজ্ঞো অমংহত। অধস্পদা ইচ্চৈদ্যস্য কৃষ্টযশ্চর্মম্না অভিতো জনাঃ ॥৩৮॥
মাকিরেনা পথা গাদ্যেনেমে যন্তি চেদযঃ। অন্যো নেত্সূরিরোহতে ভূরিদাবত্তরো জনঃ ॥৩৯॥


উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের সীমান্ত বান্দা জেলা , সেখানে আছে বিন্ধ্য পর্বত , তার হৃদয়ে অবস্থিত একটি সুপ্রাচীন দূর্গ। সেই সুপ্রাচীন দূর্গ খাজুরাহ মন্দিররাজির থেকে ৭.৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পাহাড়ের বুকে গড়ে ওঠা এই দূর্গে ভারতের সামরিক তথা শৈল্পিক ইতিহাসে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সুবিশাল এই দূর্গ কে ভারতের অপরাজেয় দূর্গ গুলির মধ্যে একটি বলে মনে করা হয়। প্রাচীন মন্দির , মূর্তি ও শিল্পকলা সম্পদে পরিপূর্ণ এই দূর্গ।
হ্যাঁ আমি সেই সুপ্রাচীন কালিঞ্জর দূর্গে র কথা বলছি।
সুপ্রাচীন এই দূর্গের মধ্যস্থিত মন্দিরগুলির বেশিরভাগই তৃতীয় বা পঞ্চম শতাব্দী প্রাচীন , প্রায় গুপ্ত কালের সমসাময়িক।
বিষ্ণু পুরানে এই দূর্গকে বিন্ধ্য পর্বতের অন্তর্গত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহেন্দ্রো মলয় সহ্যঃ শুক্তিমানৃক্ষপর্বতঃ॥
বিন্ধ্যশ্চ পারিযাত্রশ্চ সপ্তাত্র কুলপর্বতাঃ ॥
ইতিহাসের উত্তরণ ও অবনমের প্রতিটি ঘটনার সাক্ষী কালিঞ্জর দূর্গ ও জনপদ যুগ থেকে যুগান্তরে বিদ্যমান। কেবল যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে নাম পরিবর্তন ঘটেছে। সত্যযুগে এই দূর্গ কীর্তিনগর , ত্রেতা যুগে মধ্যগড় , দ্বাপর যুগে সিংহলগড় নামে সুপরিচিত ছিল। যা কলিযুগে কালিঞ্জর নামে খ্যাতি লাভ করেছিল।
ইতিহাস অনুসারে প্রাচীন কালে এই অপরাজেয় দূর্গ জয়শক্তি চান্দেলের জেজাকভুক্তি সাম্রাজ্যের অধীন ছিল।
সাবেক রাজপুতানার অন্তর্গত ছিল বর্তমানের বুন্দেলখণ্ড ভূখণ্ডও। বুন্দেলখণ্ডের রাজপুতদের মধ্যে শৌর্য, বীরত্ব আর পরাক্রমে সবচেয়ে মহান ছিল চান্দেলা রাজপুতরা।
দশম শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত জেজাকাভুক্তি বংশের চান্দেলা রাজপুতরা মূলত কান্যকুব্জ্যের গুর্জর-প্রতিহার রাজবংশের সামন্ত রাজ ছিলেন। দশম শতকের মধ্যভাগে চান্দেল রাজ যশোবর্মণ সর্বপ্রথম নিজেকে একজন স্বাধীন নৃপতি হিসাবে ঘোষিত করে বুন্দেলখণ্ডের ঐতিহাসিক চান্দেল রাজবংশের সূচনা করেন। মাহোবার প্রাচীন শিলালিপি অনুযায়ী চান্দেল বংশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং শক্তিশালী নৃপতি ছিলেন সম্রাট বিদ্যাধর চান্দেল। তিন প্রাচীন কাব্যগ্রন্থ, বর্ণ রত্নাকর, কুমারপাল চরিত্র এবং পৃথ্বীরাজ রাসোতে চান্দেলদের প্রথমসারির ৩৬টি রাজপুত বংশের অন্যতম বলে উল্লেখিত করা হয়েছে।
বর্তমানে মূলত উত্তরপ্রদেশ এবং মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত সমগ্র বুন্দেলখণ্ড জুড়ে ছিল ক্ষত্রীয় জাত চান্দেল রাজপুতদের রাজ্যের সীমানা। তাঁদের সাম্রাজ্যের সবচেয়ে সুপ্রসিদ্ধ তিনটে ঐতিহাসিক স্থান হল খাজুরাহো, মাহোবা এবং কালিঞ্জার দুর্গ।
পরে দশম শতকে এটি যথাক্রমে চান্দেল রাজপুত এবং শোলাঙ্কি সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। এই রাজাদের শাসনকালে গজনীর মাহমুদ , কুতুবউদ্দিন আইবক , শের শাহ সুরি ও হুমায়ুন এই দূর্গ আক্রমন ও দখলের বহু চেষ্টা করেছিল কিন্তু প্রত্যেকেই পরাজিত হয়েছিল। জয়ী হয়েছিল সুপ্রাচীন দূর্গটি। এই দূর্গ আক্রমনের সময়ই কামানের গোলার আঘাতে শের শাহের মৃত্যু হয়। আকবর এই দূর্গ নিজের অধীনে আনলেও পরে এটি পুনরায় ছত্রশাল সাম্রাজ্যের অধীনে চলে যায়।
পরে এটি ইংরেজদের নিয়ন্ত্রণে আসে। ভারতের স্বাধীনতার পর, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বর্তমানে এই দূর্গটি ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তরের রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে।
চলুন ঘুরে আসি ইতিহাসে র সেই দূর্গে…
বিন্ধ্য পর্বত আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সগর্বে। একটা দীর্ঘ সময় তাকে অতিক্রম করে তার পরপারে বসবাসকারীদের উপর আক্রমনের কথা অনেকেই স্বপ্নেও চিন্তা করতেন না। সেখানে বাস করেন বিন্ধবাসিনী দেবী। আর তার দক্ষিণ পূর্ব অংশে অবস্থিত যুগান্তরের কালিঞ্জর দূর্গ।


এটি সমুদ্রতল থেকে ১২০৩ ফুট (৩৬৭ মিটার) উচ্চতায় ২১৩৩৬ বর্গ মিটার এলাকা গঠিত। পর্বতের এই অংশটি ১১৫০ মিটার প্রশস্ত এবং ৬ থেকে ৮ কিমি । এর পূর্ব দিকে অবস্থিত কালিন্জর পাহাড়টি আকারে ছোট হলেও উচ্চতা সমান।
এই স্থানের আবহাওয়া বন্ধুর প্রকৃতির। গ্রীষ্মের আবহাওয়া অতীব তপ্ত ও কষ্ট দায়ক থাকে। মাঝে মাঝে লু অর্থাৎ উত্তপ্ত বাতাস বয়। শীতকালের প্রচন্ড শীতলতা ও বর্ষায় হয় প্রবল বর্ষণ।
এখানের প্রধান নদী হল বাগে বা বাগাই । সারা বছর রুক্ষ শুষ্ক বাগে বর্ষায় ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। পর্বত থেকে অন্তত এক মাইল দূরে প্রবাহিত এই নদীটি পান্না জেলার কোহারীর নিকটস্থ বৃহস্পতি কুন্ড পর্বত থেকে উৎপত্তি লাভ করে দক্ষিণ-পশ্চিম বাহী হয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হতে হতে যমুনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এছাড়াও ছোট নদী বানগঙ্গাও যমুনা গামিনী হয়েছে।
সত্যযুগে কালিঞ্জর অর্থাৎ কীর্তিনগর চেদি নরপতি উপরিচরি বসুর সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। তাঁর রাজধানী ছিল শুক্তিমতি নগরী। ত্রেতা যুগে বাল্মীকি রামায়নুযায়ী শ্রী রাম এই কালিঞ্জর দূর্গ অর্থাৎ মধ্যগড় কোনো একটি বিশেষ কারনে ভরবংশীয় ব্রাহ্মন কে দান করেছিলেন। দ্বাপর যুগে পুনশ্চঃ চেদি বংশ কালিঞ্জর দুর্গটি অর্থাৎ সিংহলগড় নিজ সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসেন। এর রাজাই ছিলেন শিশুপাল। এর পর দূর্গ মধ্যভারতের বিরাট রাজার অধীনে আসে।
কালিঞ্জর দূর্গের কথা সর্বপ্রথম উল্লিখিত নাম আসে শকুন্তলা দুষ্মন্তর সন্তান সসাগড়া পৃথিবীর রাজা ভরতের। কর্নেল টডের বক্তব্য অনুসারে ভরত রাজা যে চারটি কেল্লা বানিয়েছিলেন বা সংস্কার করেছিলেন তার মধ্যে কালিঞ্জর ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
কালিঞ্জর অর্থাৎ যে কাল অর্থ সময়ের উপরে যে জয় অর্থ বিজয় প্রাপ্ত হয়েছে…


সেই যে যখন ত্রিলোক অমৃত কুম্ভের সন্ধানে অমরত্বের আশায় ছুটছিল, সেই যে যখন দুর্বাসার অভিশাপে সবাই হল শ্রী হীন, সেই যে যখন শ্রী চলে গেলেন সমুদ্রের তলায় , সেই যখন কত কোলকাহল হল দেব ,দানব ,দৈত্য র মধ্যে। তারা সবাই যেমন অমরত্ব চায় তেমনই শ্রীহীনতা কে ঘোচাতে চায়।
অমরত্ব, অমরত্বের জন্য তো দৈত্য গুরু শুকলাচার্য দেবাদিদেব মহাদেবের নিকট পেয়েছেন মৃতসঞ্জীবনী মন্ত্র। কিন্তু দেব কুল…তাদেরও কিছু লাগে বৈকি…
সুতরাং, তাদের সন্ধান হল অমৃত কুম্ভের। দৈত্য দানব কুলের রাজা বলি তখন স্বর্গের অধিকারী। একা দেবতাদের তাই সমুদ্র মন্থনের অধিকার নেই। দৈত্য দানব কুলও সেই কর্মের ভাগী হলেন। ব্রহ্মভা র আদেশে ত্রিলোকের যত ঔষদি বৃক্ষ এনে ফেলা হল সমুদ্রে। মন্দর পর্বত হল দন্ড। বিষ্ণু কূর্ম অবতারে সেই পর্বত ধারণ করলেন। বাসুকি নাগ হলেন রজ্জু। মনথিত হল সমুদ্র। বহু মহামূল্য বান বস্তু র সঙ্গে উঠেন শ্রী লক্ষী ।
আর কি উঠল? উঠল হলাহল…সব ভালোরই খারাপ থাকে…কিন্তু খারাপ , বিষকে কে নেবেন? নেবেন নেবেন…যিনি স্বয়ম্ভু সৃষ্টি স্থিতি লয় যার করে তিনিই নেবেন.. তিনি তো নিজেই অমৃত। তাঁর অমৃত , অমরত্ব লাগে না। বিষকেও তাই তিনি ধারণ করতে সক্ষম। দেবাদিদেব গ্রহণ করলেন সেই গরল। মহাদেব হলেন নীলকন্ঠ , বিশ্ব চরাচর রক্ষিত হল। আর কি হল? দেবী পার্বতী তারা রূপ ধারণ করে মহাদেবের কন্ঠের বিষ রোধ করে হলাহলের জ্বালা তাড়ন করলেন । এরপর দেবাদিদেব বিন্ধ্যাচলে এসে ধ্যান মগ্ন হলেন। কাল অর্থাৎ সময়ের উপর বিজয় প্রাপ্ত করলেন । সৃষ্টি হল কালিন্জর…তাই কালিন্জরের অধিকারী কেবলমাত্র নীলকন্ঠ। এখানের অবস্থিত মন্দিরটি নীলকন্ঠ শিবের মন্দির হিসাবে সুপরিচিত।


পদ্মপুরানে এই স্থানকে নবঊখল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি বিশ্বের প্রাচীনতম স্থান গুলির মধ্যে অন্যতম। মৎস পুরাণে এই স্থানকে অবন্তিকা ও অমরকন্টকের সঙ্গে অবিমুক্ত ক্ষেত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্মের নানা উপদেশ মূলক কাহিনী, গ্রন্থ ও জাতক মালায় এই দুর্গকে কালগিরি বলে উল্লেখ করা হয়েছে । ব্রহ্মপুরাণে কালিঞ্জর একটি পবিত্র তীর্থ ক্ষেত্র।
গরুড় পুরাণে কালিন্জর কে মহা তীর্থ বলা হয়েছে ,তথা সর্ব পাপহারি মোক্ষ ক্ষেত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
গৌবর্ণং পরমং তীর্থ, তীর্থ মাহিষ্মতী পুরী॥
কালংজর মহাতীর্থ, শুক্রতীর্থ মনুত্তমম্॥
কৃতে শোচে মুক্তিদশ্চ শাংর্গ্ংগধারীতন্দিকে॥
বিরজং সর্বদং তীর্থ স্বর্ণাক্ষংতীর্থমুতমম্॥
উপত্যকার খোলা সমভূমিতে, ঘন বন ও তৃণভূমি ও নাম না জানা ফুল দ্বারা বেষ্টিত। এই স্থানটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মহিমা এই স্থানটি আধ্যাত্মিকতা কে প্রস্ফুটিত করে।


আসলে এই দূর্গ ঠিক কবে নির্মিত হয়েছিল তার স্রোত বা সূত্র আজও অজ্ঞাত। অনেকেই মনে করেন বা জনশ্রুতি অনুসারে এই দূর্গের স্থাপনা চান্দেল বংশের রাজা চন্দ্র বর্মা করেছিলেন। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে , এই দুর্গের নির্মাণ কেদার বর্মা দ্বারা দ্বিতীয় ও চতুর্থ শতকে হয়েছিল।
১৬ শতাব্দীর ফার্সী ঐতিহাসিক ফরিস্তার বক্তব্য অনুসারে কালিঞ্জর নামক শহরের স্থাপনা কেদার নামক এক রাজা তৃতীয় শতকেই করেছিলেন কিন্তু চান্দেল শাসন কালে দূর্গ প্রচারে আসে। চান্দেল বংশের ইতিহাস পড়লে আবার দেখা যায় এটি চান্দেল রাজা নির্মাণ করেছিলেন । তবে যেই করুন তিনি অসামান্য ছিলেন…
চান্দেল শাসন কালে রাজাদের উক্তি বিশেষ উপাধি প্রচলিত ছিল…কালিঞ্জরাধিপতি…উপাধি থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে কালিঞ্জর চান্দেলদের নিকট কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও মহত্বপূর্ণ ছিল।
কালিঞ্জর প্রাচীন ইতিহাস লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাব এই দূর্গের ইতিহাস পৃষ্টভূমি নানা যুদ্ধ কেন্দ্রিক আক্রমণে পরিপূর্ণ। বিভিন্ন রাজা মহারাজা ও বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী ধর্মীয় শক্তি এই দূর্গকে অধিকার করার জন্য বড় বড় আক্রমন করেছিল। সেই জন্যই হয়ত দূর্গের অধিকারর এক সাম্রাজ্য থেকে অন্য সাম্রাজ্যের নিকট স্থানান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু খুব অদ্ভুত ঘটনা হল যে , একমাত্র চান্দেলরা ব্যতীত অন্য কেউ এই দূর্গে কে কেন্দ্র করে বেশিদিন শাসন কার্য চালাতে পারেনি।


প্রাচীন ভারতে কালিঞ্জরের উল্লেখ বেদ , পুরান , রামায়ন মহাভারত সহ বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যতে উল্লিখিত হয়েছে সে তথ্যঃ পূর্বেই পরিবেশিত হয়েছে। শাক্য সিংহ বুদ্ধদেবের যাত্রা পথে এই দূর্গের উল্লেখ আছে। গৌতম বুদ্ধের সময় এখানে চেদি বংশ রাজত্ব করতেন। এর পরে এটি মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। এই সময়ই এটি বিন্ধ্য আটবি নামে বিখ্যাত হয়েছিল। ইতিহাস বলে এখানে সেই রামায়ন মহাভারতের যুগে হৈহয় বংশের রাজা কৃষ্ণরাজ থেকে শুরু করে নাগ , পান্ডব ,শুনগ ও গুপ্ত বংশীয় শাসনাধীন ছিল।
সমুদ্রগুপ্তের প্রয়াগ প্রশস্তিতেও এই অঞ্চলকে বিন্ধ্য আটবি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর এটি বর্ধন সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। গুর্জ্জর প্রতিহার বংশের নাগভট্টের রাজত্ব কাল অবধি তাঁরা এই দুর্গের উপরে অধিকার ভোগ করেন। এরপর আসে চান্দেল বংশ। ইতিহাস অনুসারে চান্দেলগন গুর্জ্জর দেরই মান্ডলিক রাজা ছিলেন। ওই সময়ের প্রতিটি গ্রন্থ বা অভিলেখাতে এই দূর্গের নাম উল্লিখিত ছিল।
১০২৩ খ্রিস্টাব্দে কালিঞ্জরে আক্রমণ করল গজনীর মাহমুদ। স্বাভাবিক ভাবেই অন্য মন্দির ও হিন্দু সম্পত্তি লুন্ঠনের মতই সমান ভাবেই কালিঞ্জর দূর্গ লুণ্ঠিত হল। কিন্তু সুবিশাল দূর্গটিতে অধিকার স্থাপন করতে পারল।
মানুন বা না মানুন , এটি সত্য যে ভারতীয় সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থ সিদ্ধির নিমিত্ত কিছু চাটুকার ঐতিহাসিক বারংবার তাকে বিকৃত করেছে। তো সত্য ইতিহাস বলে যে , বাবরের মুঘল সেনাপতি হাসান খাঁ ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে মেবাতপতি থেকে প্রত্যাবর্তন কালে এই সুপ্রাচীন দূর্গ দখলের প্রচেষ্টা চালায় কিন্তু কিছুটা অধিকার করলেও তাকে ধরে রাখতে অক্ষম হয়।
শের শাহ সুরি কালিঞ্জর দূর্গ অধিকারের নিমিত্ত ২২ মে ১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দে চান্দেল সাম্রাজ্য আক্রমন করে।এই আক্রমন ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। উক্কা নামক এক ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র (তোপ ) দাগে দূর্গের দেওয়ালে। কিন্তু বিধিই সাহস হাঁসি হেঁসেছিলেন। তোপ দূর্গের দেওয়াল থেকে প্রতিহত হয়ে ফিরে এসেছিল শের শাহের নিকট। সেই প্রতিহত হত হওয়া তোপের আঘাতেই মৃত্যু হয় শেরশাহের।
আকবর নামার বিবরনানুযায়ী ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে আকবর দূর্গটি নাকি বীরবলকে উপহার দিয়েছিল এবং বীরবলের পর এই দূর্গ পুনরায় ছত্রশাল সম্রাজ্যের অধীনস্থ হয়। এর পর পান্নার শাসক হরদেব এই দূর্গের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।
১৮১২ খ্রিস্টাব্দ ইংরেজির মে মাসে কালিঞ্জর দূর্গ ব্রিটিশদের হস্তগত হয়। ব্রিটিশ সৈন্য বাহিনীর আক্রমন এই দূর্গের বেশ কিছু অংশ খুব বাজে ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে চিন্হ আজও এই সুপ্রাচীন দূর্গটি তার দেওয়াল ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গনে বহন করে চলেছে।১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের সময়ও এই দূর্গের কিছু অংশ ব্রিটিশ অধিকারে ছিল। ভারতের স্বাধীনতার অর্জনের সাথে এই দূর্গটি ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে।
এই কালিঞ্জর দূর্গ এবং একে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জনপদ ও নাগরিক জীবন উভয়ই ঐতিহাসিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বহু প্রাচীন মন্দির, মূর্তি , শীলালেখ এবং গুহার অবস্থিতি ইতিহাসের প্রবাহমান কালকে বহন করে নিয়েছিলেছে। এই দূর্গে কোটি তীর্থের নিকট প্রায় ২০ হাজার বছর পুরাতন শঙ্খ লিপি স্তিত আছে। যে লিপিতে রামায়নের যুগে শ্রী রামের কালিঞ্জর দূর্গে বনবাস কালে আগমনের কথা উল্লিখিত আছে। এই লিপি অনুসারে শ্রী রামচন্দ্র সীতা কুন্ডের নিকট সীতা সেজ যেখানে সেখানে অধিষ্ঠান করেছিলেন।
কালিঞ্জর সৌধ সংস্থানের তৎকালীন নির্দেশক শ্রী অরবিন্দ ছিরৌলিয়ার মন্তব্যনুসারে এই দূর্গের উল্লেখ যেমন বিভিন্ন প্রাচীন পৌরাণিক গ্রন্থে উল্লেখ আছে তেমনি বুড্ডা বুড্ডি সরোবরের নিকটস্থ নীলকন্ঠ মন্দিরের অভ্যন্তরে বহু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি সঞ্চিত আছে যাতে চান্দেল সাম্রাজ্যের সময়কালের বিভিন্ন বিবরণ রক্ষিত আছে।
সুপ্রাচীন কালিঞ্জর দূর্গ কিন্তু ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্যবাদী ধর্মীয় আগ্রাসন থেকে মুক্তি পায় নি। এই দূর্গের প্রথম দুয়ারে ভালো করলে লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন যে, সেখানে ১৬ শতকের সময়কালের ঔরঙ্গজেবের একটি প্রশস্তি আছে। যেটি ঔরঙ্গজেবের নির্দেশ অনুসারে বানানো হয়েছিল। এছাড়াও দুর্গের কাছেই কাফের ঘাঁটি বলে একটি স্থান আছে। ১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দে এই স্থানেই শেরশাহ সুরির ভাতুস্পুত্র ইসলাম শাহ এখানে একটি প্রশস্তি লাগিয়েছিল। শুধু তাই নয় , ইসলাম শাহ এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিল। কালিঞ্জর দূর্গের নাম পরিবর্তন করে তাকে শেরকোহ রাখাবার চেষ্টাও করে ছিল।
ডক্টর বিডি গুপ্ত ও অন্যান্য ঐতিহাসিক তথ্যঃ থেকে জানতে পারা যায় অসীম শক্তিময়ী রানী দূর্গাবতীর পিতা যস্বসী রাজা কীর্তিবমর্ন যখন
কালিঞ্জর দূর্গে রাজত্ব করতেন । শেরশাহ কালিঞ্জর আক্রমন করলে মহারাজ সহ তাঁর ৭২ জন সঙ্গীকে হত্যা করেছিল শেরশাহ সুরির ভাতুস্পুত্র ইসলাম শাহ ।
ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ কালিঞ্জর দূর্গ থেকে বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন শিল্প কর্ম , মূর্তির ধ্বংসাবশেষ ইত্যাদি একত্রিত করে সংগ্রহশালায় সংরক্ষন করতে সচেষ্ট হয়েছেন। এতে গুপ্ত যুগে থেকে মধ্যযুগীয় ভারতের অনেক অভিলেখ সম্পদ হিসাবে সঞ্চিত আছে। এখানে সাংখ্য লিপির তিনটি অভিলেখ পাওয়া যায়।

প্রতিদিন তিনবার রং পরিবর্তন করে এই রহস্যময় মন্দিরের শিবলিঙ্গটি।


ভারতের বহু মন্দিরকে কেন্দ্র করেই দানা বেঁধেছে নানা অমীমাংসিত রহস্য। তেম‌নই এক রহস্যমণ্ডিত মন্দির হল রাজস্থানের অচলেশ্বর মহাদেব মন্দির। এই শিব মন্দিরটিতে যে শিবলিঙ্গটি পূজিত হয় সেটি নাকি নিজে থেকেই দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রঙে রঞ্জিত হয়ে ওঠে।

রাজস্থানের সিরোহী জেলায় অচলগড় কেল্লার ঠিক বাইরেই এই মন্দিরের অবস্থান। কথিত আছে, মহাদেবের একটি পায়ের ছাপকে কেন্দ্র করে এই মন্দিরটি গড়ে ওঠে। আনুমানিক নবম শতকে তৈরি হয় এই মন্দির। চার টনের একটি নন্দীর মূর্তি রয়েছে এই মন্দিরে। মূর্তিটি পঞ্চধাতু দিয়ে তৈরি। কিংবদন্তি অনুসারে, নন্দীর এই মূর্তি মন্দিরের রক্ষাকর্তা। প্রাচীন কালে কোনও এক মুসলমান শাসকের নির্দেশে নাকি এই মন্দির ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন নন্দীর এই মূর্তির মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি। মৌমাছির তাড়নায় পালিয়ে যায় মন্দিরে আক্রমণকারীরা। মন্দিরের মধ্যে রয়েছে একটি স্তূপ। স্থানীয়দের বিশ্বাস এই স্তূপটি আদপে নরকের দক্ষিণ দ্বার। মন্দিরের অদূরে রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরের পাড়ে রয়েছে তিনটি ধাতব মহিষের মূর্তি। বলা হয়, এই তিনটি মূ্র্তি আসলে তিনটি রাক্ষসের প্রতিরূপ। এক সময়ে এই রাক্ষসত্রয় আক্রমণ করেছিল এই মন্দির। তখন রাজা আদি পাল তাদের হত্যা করেন।
এই মন্দিরকে ঘিরে রহস্যের যেন শেষ নেই। মন্দিরটির সংস্কারসাধন হয়েছে বহুবার। একবার গর্ভগৃহটি সংস্কারের সময় খোঁড়াখুঁড়ি করতে গিয়ে গর্ভগৃহ বেষ্টন করে থাকা একটি সুড়ঙ্গ আবিষ্কৃত হয়। সুড়ঙ্গের মধ্যে দু’টি কুলুঙ্গিতে পাওয়া যায় দেবী চামুণ্ডার দু’টি মূ্র্তি। দেখা যায়, মূর্তি দু’টিতে লেপা রয়েছে সিঁদুর। যেন সদ্য পূজিতা হয়েছেন দেবী। কিন্তু এমন গুপ্ত সুড়ঙ্গপথে কারা পুজো করে যেত দেবীর? সেই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি।
তবে এই মন্দিরের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুটি এর ভিতরে থাকা শিবলিঙ্গটি। দিনের বিভিন্ন সময়ে এর রং থাকে বিভিন্ন রকমের। দিনে অন্তত তিন বার রং বদলায় এই শিবলিঙ্গ। সকাল বেলা এর রং থাকে লাল, বিকেলে হয় জাফরান, আর রাত্রে এর রং হয় কালো।
সারা পৃথিবী থেকে অজস্র মানুষ এই অদ্ভুত শিবলিঙ্গ দর্শনের উদ্দেশ্যে ছুটে আসেন। ভক্তরা গোটা বিষয়টিকেই ঐশ্বরিক লীলা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা অবশ্য অন্যরকম। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মন্দিরের গায়ে যে অজস্র স্ফটিক লাগানো রয়েছে, তাতে দিনের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রং-এর সূর্যালোক প্রতিফলিত হয়েই তৈরি হয় এই রং-এর খেলা। ভক্তদের কাছে সেই ব্যাখ্যার মূল্য নেই। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে রহস্যময় এই মন্দির দিনে দিনে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। 
এইবেলাডটকম/এএস