বৈদিক শাস্ত্রের জন্ম ও মৃত্যুযোগের অশৌচতা। কুসংস্কারের ইতি টানুন।


জন্ম ও মৃত্যুযোগ অশৌচতা

সনাতন ধর্মের বৈদিক শাস্ত্রে জন্ম ও মৃত্যুযোগ অশৌচ কি?


 অশৌচ দুই প্রকার যেমনঃ—


১৷ জননাশৌচঃ— পরিবারে কেউ জন্মগ্রহণ করলে যে অশৌচ হয়৷ তবে এটার প্রচলন ততটা নেই ৷ কারণ জন্ম হওয়াটা আনন্দদায়ক।

২৷ মরণাশৌচঃ— পরিবারে আপন জন কেউ মৃত্যুতে যে অশৌচ পালন করতে হয়৷ কারণ এটা দুঃখবোধ ও বেদনাদায়ক।

অন্তোষ্টিক্রিয়াতে অংশগ্রহণ করা বৈদিক কর্তব্য বৃহদারন্যক উপনিষদ এ বলা হয়েছেঃ—

এতদ বৈ পরমং তপো যত্

প্রেতমপ্লবভ্যা দধতি।।

"মৃতদেহ বহন করে দাহস্থলে নিয়ে যাওয়া এবং দাহ করা পরম তপস্যা।
(বৃহদারন্যক উপনিষদ ৫.১১.১)

আমাদের মাঝে এখনো কুসংস্কার একটি কথা আছে যা আমাদের মাঝে বিরাজমান করে বলে থাকে তাই মৃতদেহ স্পর্শ করলে অপবিত্র বা অশৌচ হয়। কিন্তু আমাদের বৈদিক শাস্ত্রে কি আছে তা কি জানেন?

আসুন জেনেনিঃ— 


মহর্ষি গৌতম তাঁর ন্যায় সুত্রে

"শরীর দাহে পাতকাভাবাৎ"
"অর্থাৎ- মৃতদেহ দাহ করলে শরীরে কোন পাপ বা অশৌচ দোষ লাগেনা।"
(ন্যয়সুত্র ৩/১/৪)

বলে রাখা ভালো দাহ করে বা দাহস্থানে গিয়ে শরীরে ময়লা লাগে তাই স্নান করা উচিত। কিন্তু শরীর অপবিত্র হয়েছে ভেবে স্নান করা উচিত নয়।

দেখুন কেন এই অশৌচ মানা হয়ঃ—

অশৌচ হলো হিন্দু রীতি মতে, সংস্কার অশৌচ শব্দের অর্থ হল শুচিতা বা পবিত্রতার অভাব। মাতা পিতা বা জ্ঞাতিবর্গের মৃত্যুতে হিন্দুরা অশৌচ করে৷ অর্থ্যৎ প্রিয়জনের মৃত্যুতে কঠোর ব্রহ্মচর্য পালন করে শ্রাদ্ধের উপযুক্ততা অর্জনই অশৌচ ৷ অশৌচ হিন্দুসমাজের একটি প্রচীন রীতিতে সংস্কার বলা হয়৷

পিতা মাতা বা আত্মিয় পরিজন মারা গেলে বা পরিবারে নতুন কেউ জন্ম নিলে অশৌচ পালন করা হয়। এই অশৌচ প্রজন্ম বা পুরুষ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের জন্য কার্যকর হয়। প্রথম পুরুষ থেকে সপ্তম পুরুষ পর্যন্ত কার্যকর থাকে। অষ্টম পুরুষ থেকে অশৌচ্য কার্যকর থাকে না।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে কেন এই অশৌচঃ—

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সম উপযোগী নিয়ম এটা—

যখন একটি শিশু জন্ম হয় তখন একটি শিশুকে দেখা শুনা করতে হয়। সামান্য অযত্নের কারণে একটি নতুন প্রাণ অকালে ঝরে যেতে পারে। তাই নিত্য কর্ম থেকে বিরত থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের যত্ন নিতে বলা হয়েছে। মানুষ নিত্য কর্মে ব্যস্ত থাকলে নতুন প্রজন্মের যন্তে অন্তরায় হতে পারে। অর্থাৎ নতুন প্রাণ ও নতুন প্রজন্মকে অনেক অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পরিবারের কেউ মৃত্যু বরণ করলে তখন মানুষকে পারলোকিক কাজ গুলি করতে হয়। মন বিক্ষিপ্ত থাকে। শোকাগ্রস্থ মন নিয়ে নিত্য কর্ম করা কঠিন হয়। এইখেত্রেও পারলোকিক কাজকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শোকাগ্রস্থ পরিবার নিত্য কর্ম থেকে একেবারে মুক্ত থেকে একা থাকলে বা কোন কাজ ছাড়া থাকলে শোক আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। সেই সময় মৃত ব্যাক্তির সন্তানদের ব্রহ্মচার্য পালন করতে হয়। পারলোকিক কাজ ও ব্রহ্মচার্য পালন করতে করতে কোন দিকে সময় গড়িয়ে যায় সেটা বুঝা যায় না। পারলোকিক কাজ ও ব্রহ্মচার্য পালন করতে করতে বিক্ষিপ্ত ও শোকাগ্রস্থ মন শান্ত হতে থাকে। এই সময় আত্মিয় পরিজনকে অশোচ্য পালন করতে হয় এবং নিত্য কর্ম বন্ধ রাখতে হয়।

অশৌচ্যের কারণে বিয়ে, জন্মদিন, অন্নপ্রাশন, পৌতা সহ নানা অনুষ্ঠান করতে পারে না। এমনকি দুর্গা পুজা বা যে কোন ধরণের পুজা করতেও পারে না।

এখন আলোচনা করছি ভিন্ন একটা বিষয় নিয়ে ---
অশোচ্য নিয়ম গুলি যখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তখন মানুষ যৌথ পারিবারিক প্রথায় বিশ্বাসী ছিলেন। তারা সাত প্রজন্ম এক সাথে থাকতেন। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জটিলতার কারণে মানুষকে একক পরিবার নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে। দেখা যায় ৩ সন্তান হলে। একজন থাকেন চট্টগ্রামে অন্যজন ঢাকায় আরেকজন হয়তো দেশের বাইরে। তাহলে যে সন্তান দেশের বাইরে আছেন তাঁর সন্তান হবার কারণে দেশে যে সন্তান আছেন তাঁদের ঘরের পুজা বা অন্নপ্রাশন, পৌতা, বিয়ে, আশীর্বাদ এই সব শুভ কাজকে কেন বাদ দিতে হবে? এই পরিবার গুলি তো বিদেশে থাকা ভাই বা বোনের ছেলে মেয়ের যত্ন নিতে যেতে পারবেন না বা কোন ভাবে অংশ নিতে পারবেন না এই কাজে। এই সব বিষয়ে কি এই নিয়ম গুলি কার্যকর হওয়া উচিৎ?

মৃত্যু সব সময় দুঃখের তাই সন্তান বা পরিবার পরিজন পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন মৃত্যু জনিত অশৌচ অবশ্যই সবাইকে মেনে চলতে হবে।

আগমনে শিথিলতা থাকতে পারে কিন্তু প্রয়াণে কোন ভাবেই নয়।

বৈদিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কিঃ—

মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি ও সদ্গতি জন্য শ্রাদ্ধ ক্রিয়াযোগ করা হয়। হিন্দুধর্ম অনুসারে পারমার্থিক মাঙ্গলিক ক্রিয়া যোগকে বিবেচনা করা হয় এক একটা ব্রত হিসেবে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শ্রাদ্ধ হল ব্যক্তির কল্যাণের উদ্দেশ্যে এক মাঙ্গলিক ক্রিয়া। 'অন্ত অর্থ শেষ এবং ইষ্টি অর্থ যজ্ঞ বা সংস্কার। জীবন শেষে কোন ব্যক্তির অন্তিম যজ্ঞ বা সংস্কারই হল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া।

 বৈদিক শ্রাদ্ধ কিঃ—

শ্রাদ্ধ হিন্দু শাস্ত্রানুযায়ী পিতৃপুরুষের আত্মার শান্তির উদ্দেশে এবং তাদের আশীর্বাদ কামনায় দান-ধ্যান ও অতিন অনুষ্ঠান। সাধারণত মৃত ব্যক্তির সন্তান কিংবা আত্যীয়-স্বজনরা এ অনুষ্ঠান পালন করে থাকে।

শ্রাদ্ধের প্রকারভেদ প্রধানত তিন প্রকারঃ—

আদ্যশ্রাদ্ধ, আভু্যদয়িক বা বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ ও সপিণ্ডীকরণ। আদ্যশ্রাদ্ধ অশৌচান্তে মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে করণীয়। বর্ণভেদে ব্যক্তির মৃত্যুদিবসের ১০, ১২, ১৫ অথবা ৩০ দিন পরে এটি অনুষ্ঠিত হয়। মৃত ব্যক্তির পরিবারের লোকজন এ-কদিন ফলমূল, নিরামিষ এবং লবণ ছাড়া আতপ চালের ভাত খায়। শ্রাদ্ধের আগের দিন মৃত ব্যক্তির পুত্ররা মাথার চুল ফেলে দেয় এবং শাস্ত্রীয় নিয়ম-কানুনসমূহ পালন করে। শ্রাদ্ধের দিন সামর্থ্য অনুযায়ী আত্মীয়-স্বজনসহ পাড়া-প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়ায়। বর্তমানে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের কারণে সেই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে। শ্রাদ্ধ উপলক্ষে ব্রাহ্মণ ও আত্মীয়-স্বজনদের নানারকম দান-ধ্যানও করা হয়।

উপনয়ন, বিবাহ ইত্যাদি শুভ কাজের পূর্বে পিতৃপুরুষের আশীর্বাদ কামনায় যে শ্রাদ্ধ করা হয়, তার নাম আভু্যদয়িক বা বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ। আর সপিণ্ডীকরণ শ্রাদ্ধ হলো যা ব্যক্তির মৃত্যুর এক বছর পরে করা হয়। এ তিনটি ছাড়া আরও কয়েক প্রকার শ্রাদ্ধ আছে। যেমন, মহালয়া প্রভৃতি বিশেষ হিন্দু আচার উপলক্ষে এবং বিশেষ তিথিতে কারও মৃত্যু হলে তার উদ্দেশে যে শ্রাদ্ধ করা হয় তার নাম পার্বণশ্রাদ্ধ। পার্বণশ্রাদ্ধে সাধারণত পিতৃপক্ষের তিন পুরুষ ও মাতৃপক্ষের তিন পুরুষের উদ্দেশ্যে পিণ্ড দান করা হয়। এক সঙ্গে একজন মৃত ব্যক্তির উদ্দেশে যে শ্রাদ্ধ করা হয় তার নাম একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ। অম্বষ্টকা নামেও এক প্রকার শ্রাদ্ধ আছে; তবে এর প্রচলন কম। হিন্দুদের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান গয়ায় বিষ্ণুপাদপদ্ম শ্রাদ্ধ করা প্রশস্ত। অনেক ধনী ব্যক্তি পিতা-মাতার শ্রাদ্ধ গয়াধামে গিয়ে করে থাকেন। শ্রাদ্ধ বিষয়ে শূলপাণির শ্রাদ্ধবিবেক ও রঘুনন্দনের শ্রাদ্ধতত্ত্ব বঙ্গদেশে অতি প্রামাণ্য গ্রন্থরূপে বিবেচিত হয়।

শরীক, সগোত্র, সপিণ্ড মানে কি এবং এর মধ্যে পার্থক্য কিঃ— 

শরীক— শরীক কথাটা ব্যবহার হয় স্থায়ী সম্পদের অংশীদার বোঝাতে। অর্থাৎ জমি বাড়ির অংশীদার হলো শরীক।

সগোত্র— একই বংশের পুরুষানুক্রমের লোক। অর্থাৎ একই রক্তবাহী পুরুষ আত্মীয়। যেমন বাবা, জ্যেঠা, কাকা তাদের পুত্রগণ, পৌত্রগণ ইত্যাদি।

সপিণ্ড— সপিণ্ড মানে হলো নিজ বংশ। মাতা এবং পিতা সম্পর্কিত ব্যক্তিগণ যাদের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান করা হয়। একই সাথে রক্তবাহী বলে সগোত্রে।

মানবদেহে পুরুষানুক্রমে সপ্তমপুরুষ (সাতপুরুষ) পর্যন্ত একই রক্ত প্রবাহিত হয় বলে। কিন্ত এক রক্তের কন্যার অন্যত্র বিবাহ হলে পুরুষানুক্রমিক রক্তের ভেদ সৃষ্টি হয়। তাই রক্তের দোষ না থাকলেও আত্মীয় সম্পর্কিত দোষ থাকে। তবে কন্যার বংশের তিনপুরুষ ও পাঁচপুরুষ চলে গেলে বিবাহ চলতে পারে।

বৈদিক যুগে স্বগোত্রীয় এবং ভিন্ন গোত্রীয় উভয় প্রকার কাণ্ব শাখায় শতপথব্রাহ্মণ, গৌতম, বোধায়ন, এবং বশিষ্ঠ সগোত্রে অর্থাৎ ঘনিষ্ঠ রক্তসম্পর্কে বিশেষত পিতৃকুলে সাতপুরুষ এবং মাতৃকুলে পাঁচপুরুষের রক্তের সম্পর্ক নিয়ে তথ্য আছে। এবং ঋগবেদ ১০ম মন্ডলের ১০ সূক্তের সপিণ্ডে ও রক্তের সম্পর্ক নিয়ে অনেক তথ্য আছে। মনুসংহিতা—  মনু ৩/৪, মনু ৩/৫, মনু ৩/৬, এর মধ্যে রক্তের সম্পর্কে অনেক তথ্য দেওয়া হয়েছে।

সময়কাল সামাজিক ভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে আমাদের সনাতনী হিন্দু সমাজের চার বর্ণ এই অশৌচান্ত পালন করেন তাকে যেমনঃ—

ব্রাহ্মণ— সর্বোচ্চ ১০ দিন পালন করেন।
ক্ষত্রিয়— সর্বোচ্চ ১২ দিন পালন করেন
বৈশ্য— সর্বোচ্চ ১৫ দিন পালন করেন।
শূদ্র— সর্বোচ্চ ৩০ দিন পালন করেন।

শ্রাদ্ধের গুরুত্বঃ—

পিতৃপক্ষে পুত্র কর্তৃক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হিন্দুধর্মে অবশ্য করণীয় একটি অনুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানের ফলেই মৃতের আত্মা স্বর্গে প্রবেশাধিকার পান। এই প্রসঙ্গে গরুড় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, "পুত্র বিনা মুক্তি নাই। ধর্মগ্রন্থে গৃহস্থদের দেব, ভূত ও অতিথিদের সঙ্গে পিতৃতর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন।

বাৎসরিক শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যাঁরা অপারগ, তাঁরা সর্বপিতৃ অমাবস্যা পালন করে পিতৃদায় থেকে মুক্ত হতে পারেন। শর্মার মতে, শ্রাদ্ধ বংশের প্রধান ধর্মানুষ্ঠান। এই অনুষ্ঠানে পূর্ববর্তী তিন পুরুষের উদ্দেশ্যে পিণ্ড ও জল প্রদান করা হয়, তাঁদের নাম উচ্চারণ করা হয় এবং গোত্রের পিতাকে স্মরণ করা হয়। এই কারণে একজন ব্যক্তির পক্ষে বংশের ছয় প্রজন্মের নাম স্মরণ রাখা সম্ভব হয় এবং এর ফলে বংশের বন্ধন দৃঢ় হয়। ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতাত্ত্বিক উষা মেননের মতেও, পিতৃপক্ষ বংশের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে। এই পক্ষে বংশের বর্তমান প্রজন্ম পূর্বপুরুষের নাম স্মরণ করে তাঁদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পিতৃপুরুষের ঋণ হিন্দুধর্মে পিতৃমাতৃঋণ অথবা গুরুঋণের সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কিংবদন্তিঃ—

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃলোকের শাসক মৃত্যুদেবতা যম। তিনিই সদ্যমৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য থেকে পিতৃলোকে নিয়ে যান। পরবর্তী প্রজন্মের একজনের মৃত্যু হলে পূর্ববর্তী প্রজন্মের একজন পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গমন করেন এবং পরমাত্মায় (ঈশ্বর) লীন হন এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের উর্ধ্বে উঠে যান। এই কারণে, কেবলমাত্র জীবিত ব্যক্তির পূর্ববর্তী তিন প্রজন্মেরই শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়ে থাকে। এবং এই শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

হিন্দু মহাকাব্য (যা হিন্দু শাস্ত্রের মধ্যে ইতিহাস নামে পরিচিত) অনুযায়ী, সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময় পূর্বপুরুষগণ পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাঁদের উত্তরপুরুষদের গৃহে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তাঁরা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান। পিতৃগণের অবস্থানের প্রথম পক্ষে হিন্দুদের পিতৃপুরুষগণের উদ্দেশ্যে তর্পণাদি করতে হয়।

মহালয়া পক্ষের পনেরোটি তিথির নাম হল প্রতিপদ, দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবস্যা। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণে ইচ্ছুক হন, তাঁকে তাঁর পিতার মৃত্যুর তিথিতে তর্পণ করতে হয়।

হিন্দু সমাজের অন্যতম একটি আচার হল মৃত মানুষের শ্রাদ্ধকর্ম। প্রচলিত ধারনা অনুযায়ী 'পিতর' শব্দটি মৃত পিতা, মাতা, পিতামহ ও প্রপিতামহকে বোঝানো হয়। পৌরানিক ধারনা অনুযায়ী মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধকর্ম করে পিতরদের খাদ্য দান করে তাদের তৃপ্ত করতে হয় এবং এতে পিতরদের পাপ ও মোচন হয়।

পিতর শব্দের অর্থ কিঃ—


পিতর- পালনকর্তা (নিরুক্ত ৪.২১) এ বলা আছে।

পিতর- জ্ঞানীজন (ঋগবেদ ১০.১২.১২) ইত্যাদি।



শরীরকৃত প্রাণদাতা য়স্য চান্নানি ভূন্জতে।

ক্রমেণৈতে এয়োবপ্যুক্ত পিতরো ধর্ম ধর্ম শাসনে
(মহাভারত আদিপর্ব ৭২.১৫)


অনুবাদঃ- যে গর্ভধারনের দ্বারা শরীর নির্মান করে, যে অভয়দান করে প্রাণীদের রক্ষা করে, যার অন্ন ভোজন করা হয়, ধর্মশাস্ত্রে সেই জীব কে পিতর বলা হয়েছে।
জনিতা চোপনেতা চ য়স্ত বিদ্যাং প্রয়চ্ছন্তি।

অন্নদাতা ভয়ত্রাতা পঞ্চেতে পিতরঃস্মৃতাঃ।।

(চাণক্য ৫.২২)

অনুবাদঃ- পিতা-আচার্য, অধ্যাপক, অন্নদাতা এবং ভয় ত্রান কর্তা, এদেরকে পিতর বলে।

মানী বধী পিতরঃ মীত মাতরম্

(যজুর্বেদ ১৬.১৫)

অনুবাদঃ- আমাদের পিতা মাতেক বধ করো না। এখানে পিতর শব্দ জীবিত পিতা-মাতা অর্থে প্রয়োগ করা হয়েছে।

শতমিন্ত শরদো অগ্নিদেবা য়াত্র নশ্চক্রাজরসন্তনূনাম।

পুত্রাসোয়ত্র পিতরো ভবন্তি মানো মধ্যারোরিষতায়ুর্গন্তোঃ।।

অনুবাদঃ- পিতা মাতার বৃদ্ধ বয়সে যখন পুত্র পিতর হয়ে যাবে, তখন পর্যন্ত যেন তাদের আয়ু নাশ না হয়।

পুত্র পিতর হয়ে যাবে অর্থ হলঃ- পুত্র যখন 'পিতা' এর ন্যয় বা ভরনপোষনকারী হয়ে যাবে।

গৃহণাং হি পিতরঃ ঈশতে-অর্থাত্ বাড়ির স্বামীই (কর্তা) পিতর (শতপথ ব্রাহ্মন ২.৬.১.৪০)



দেবা বা এতে পিতরঃ- বিদ্বানেরাই পিতর (গোপথ ব্রাহ্মন ৩.১.২৪)

জ্যষ্ঠো ভ্রাতা পিতা বাপিয়শ্চ বিদ্যাং প্রয়চ্ছতি এয়স্তে পিতরোজ্ঞেয়ঃ ধর্মে চ পথিবর্তিনঃ।।


(বাল্মিকী রামায়ন)
ধর্ম পথে চলে এমন বড় ভাই, পিতা ও বিদ্যা প্রদান কর্তা, এই তিনকে পিতর বলা উচিত।

শ্রাদ্ধ শব্দের অর্থ "শ্রদ্ধা করা" যা জীবিত ব্যক্তি বা পিতরকে করা হয়, মৃত ব্যক্তিকে নয়। মৃত ব্যক্তির প্রতি স্বজনদের আবেগকে পূঁজি করে পুরোহিতদের অবৈধ অর্থ উপার্জনের পন্থা ই হল বর্তমান হিন্দু সমাজের শ্রাদ্ধকর্মের বাস্তবতা।

পিতা ও মাতা, পুত্র ও কন্যা মৃত্যুর পরে বৈদিক মতে কি করনীয় তা ও বলা হয়েছে।

বৈদিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াঃ-


বায়ুরনিলমম্রতামথেদম ভস্মান্তঃ শরীরম।

(যজুর্বেদ ৪০.১৫)


The end of the body is ash, the prana vayu merges with cosmic energy.

অনুবাদ ভাষ্য— মৃত্যুর পর শাস্ত্র সম্মত ভাবে পবিত্র বেদমন্ত্রে দাহ করাই প্রধান ধর্ম।

মৃত্যুর সময় করনীয়ঃ—

কোন ব্যক্তির মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে ঐ ব্যক্তিকে প্রান ত্যগের স্থান থেকে সরানো যাবে না। শান্ত ও স্থিরভাবে প্রানত্যগ করবে। মৃত্যুর সময় কানে কোন পৌরানিক নাম প্রদান, টানা হেচড়া করা, বুকের উপর কোন ধর্ম বই রাখা, চিত্কার করা, ঢোল, করতাল বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো, নোংরা বিছানায় রাখা, কপালে বা শরীরে তিলক মাখানো কর্তব্য নহে। মৃত্যুর পর মৃত শরীরকে যত্নের সাথে একটি পরিস্কার স্থানে উত্তর দিকে মাথা ও দক্ষিন দিকে পদদ্বয় রেখে শুদ্ধ বিছানায় চিত করে শোয়াতে হবে। দুই চোখ, মুখ খোলা থাকলে বন্ধ করে দিতে হয়। দুই কান এবং দুই নাকের ছিদ্র তুলার সঙ্গে কর্পুর মিশিয়ে গুজে দিতে হয়। মৃত পুরুষকে পুরুষগন শুদ্ধ জলে স্নান করতে হয়। এবং মৃত মহিলাকে মহিলাগন স্নান করতে হয়। শুদ্ধ জলে নিম পাতা অথবা কুলপাতা মিশিয়ে জল ফুটিয়ে নিয়ে সেই জল কুসুম কুসুম গরম হলে সেই জল দ্বারা মৃতকের শরীর সাবান সহযোগে স্নান করাতে হয়। স্নান শেষে নতুন পরিস্কার বস্ত্র পড়াতে হয়। শশ্মানে নেয়ার আগে পরিবারের সবাই মৃত ব্যক্তির নিকট দাড়াবে এবং ঈশ্বরের উদ্দ্যেশ্যে প্রার্থনা করে বেদ মন্ত্রের শান্তি পাঠে করতে হয় এবং শান্তভাবে পবিত্র বেদের গায়ত্রী মন্ত্র অর্থসহ পড়তে পড়তে নীরবে মৃতকসহ চিতা এলাকায় যেতে হয়।

গ্রহনযোগ্য নয়ঃ—

শশ্মানে নেয়ার সময় ঢোল বাজানো, লম্ফ-ঝম্প, নিশান পোতা, খই বা পয়সা ছড়ানো, চিত্কার করা মোটেই গ্রহনযোগ্য নয়। চিতা এলাকায় বিড়ি, সিগারেট, গাজা, ভাং, মদ্যপান, মাদক গ্রহন, চিত্কার, কোলাহল, জোরেশোরে গান বাজনো করা যাবে না এটা কখনো গ্রহনযোগ্য নয়।

প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিঃ—

বেল, আম, ডুমুর, তেতুঁল, শমী, পলাশ প্রভৃতি মোটা শুকনা কাঠ যা মৃত ব্যক্তির ওজনের অন্তত ৭গুন। বেশিও দেয়া যেতে পারে। এছাড়া হোমযজ্ঞের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য যথা দুটি মাটির কলসি, একটি কোদাল, একটি কুড়াল, একটি দা, একটি প্রদীপ এবং সত্কার্যে চিতায় অগ্নি প্রবেশ করানোর জন্য পলতা, কর্পুর এবং পাঁচ থেকে পনের কেজি পর্যন্ত ধুপ বা ধুনা।

চিতায় অগ্নি প্রদান মুখাগ্নি করার সময় নিম্নোক্ত বেদ মন্ত্র পাঠ করা হয়-

"ওঁ কৃত্বা দুস্কৃতং কর্মং জানতা বাপ্যজানতা মৃত্যুকালবশং প্রাপ্য নবং পঞ্চত্বমাগতম।

দহেযং সর্বগাত্রানি দিব্যান্ লোকান্ স গচ্চতু।।"


অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার আত্মার কল্যাণ কামনায় "দিব্যান্ লোকান্ স গচ্চতু" বলা উচিৎ।

প্রজ্জ্বলনের আগে মৃতদেহকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে মুখাগ্নি করা হয়। কার্পাস তুলা অথবা নতুন কাপড় দ্বারা পলতা তৈরী করে অথবা মশাল তৈরী করে ঘি এবং কর্পুর মিশিয়ে ঘৃতের প্রদীপ হতে অগ্নি গ্রহন করে মৃত ব্যক্তির মাথায় নিম্নভাগ হতে পদদ্বয়ের নিম্নভাগে নিম্নের মন্ত্রে আহুতি প্রদান করবে। সন্তান না থাকলে স্ত্রী, ভাই, বোন, নিজের বংশের লোক, শ্বশুরের বংশের লোক অথবা অন্য আত্মীয় চিতায় অগ্নি প্রদান করতে পারবে। যে কোন ভাবে মৃত ব্যক্তির (স্বাভাবিক মূত্যু, আত্মহত্যা, জলেডোবা, আগুনেপোড়া, দুর্ঘটনায় মৃত) অবশ্যই দাহ্য কার্য বা সত্কার হয়। একমাত্র গর্ভপাতকৃত সন্তান এবং ৩ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানকে মাটিতে প্রথিত করতে হবে। এর পর বেদমন্ত্রে আহুতি দেয়া শুরু করতে হয়। সত্কার বা দাহকার্যে অংশগ্রহনকারী ব্যক্তিগন স্নান করে শুদ্ধবস্ত্র পরে প্রয়োজনে আচমন করে পবিত্র ভাবে দাহ কার্যে অংশগ্রহন করবেন। দাহকার্য শেষে যদি শরীরে ময়লা লাগে তবে স্নান করতে হয় তবে অবশ্যই অশৌচ হয়েছে মনে করে স্নান করা যাবেনা। প্রানত্যগের স্থানে স্বস্তিবাচন, শান্তিপ্রকরন এবং হোমযজ্ঞ করতে হয়। মুখে অগ্নি প্রদান, উলঙ্গ করে দাহ করা। প্রতি মৃত্যুবার্ষীকিতে হোমযজ্ঞ, ধর্মানুষ্ঠান, অনাথ আশ্রমে দান, বিদ্যালয় বা ধর্মচর্চা কেন্দ্র স্থাপন ইত্যাদি করা যেতে পারে। সবসময় মনে রাখতে হবে যে মহাশত্রু হলেও মৃত ব্যক্তির সত্কারে সাহায্য করা উচিত।

ওঁ শান্তিঃ  ওঁ শান্তিঃ  ওঁ শান্তিঃ


Post By : SVSVEDA

Previous Post
Next Post
Related Posts