মানবজীবনের আদর্শ পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র

মানবজীবনের আদর্শ পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র


"ভগবন্‌, ত্রিভুবন তোমাদের প্রত্যক্ষে বিরাজে-
কহ মোরে কার নাম অমর বীণার ছন্দে বাজে।
কহ মোরে বীর্য কার ক্ষমারে করে না অতিক্রম,
কাহার চরিত্র ঘেরি সুকঠিন ধর্মের নিয়ম
ধরেছে সুন্দর কান্তি মাণিক্যের অঙ্গদের মতো,
মহৈশ্বর্যে আছে নম্র, মহাদৈন্যে কে হয় নি নত,
সম্পদে কে থাকে ভয়ে, বিপদে কে একান্ত নির্ভীক,
কে পেয়েছে সব চেয়ে, কে দিয়েছে তাহার অধিক,
কে লয়েছে নিজশিরে রাজভালে মুকুটের সম
সবিনয়ে সগৌরবে ধরামাঝে দুঃখ মহত্তম-
কহ মোরে, সর্বদর্শী হে দেবর্ষি, তাঁর পুণ্য নাম।
নারদ কহিলা ধীরে, অযোধ্যায় রঘুপতি রাম।"



বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ভাষা এবং ছন্দ কবিতায় এভাবেই অসাধারণ পদলালিত্যে প্রকাশ করেছেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের শ্রেষ্ঠতম পুরুষোত্তমের বিভূতি। কবিগুরুর বাল্মীকি চরিত্রের মুখ দিয়ে কবিগুরুই যেন আমাদের বলছেন-
"জানি আমি জানি তাঁরে, শুনেছি তাঁহার কীর্তিকথা"-
কহিলা বাল্মীকি, তবু, নাহি জানি সমগ্র বারতা,
সকল ঘটনা তাঁর- ইতিবৃত্ত রচিব কেমনে।
পাছে সত্যভ্রষ্ট হই, এই ভয় জাগে মোর মনে।"


যেখানে মহাকবি বাল্মীকি বলেছেন, শ্রীরামচন্দ্র সম্পর্কে সকল কিছু জেনেও তিনি কিছুই জানতে পারেননি ; সেই মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের মাহাত্ম্যকথা আমরা সাধারণজন কি করে প্রকাশ করবো? কিন্তু বর্তমানে আমরা খুবই ব্যথিতচিত্তে লক্ষ্য করি অনেকেই হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে সফল, কিন্তু এর মানে এ নয় যে আমরা সকল বিষয়েই জ্ঞানী। স্কুল কলেজে তো রামায়ণ-মহাভারত বিষয়ে পড়াশুনার সুযোগ নেই ; এর পরেও রামায়ণ-মহাভারত সম্পর্কে সামান্য বিদ্যা নিয়েই, বা কদাচিৎ ক্ষেত্রে না পড়েই আমরা রামায়ণ-মহাভারতের পিণ্ডী চটকাতে চটকাতে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে শুরু করে দেই। মূল চব্বিশ হাজার শ্লোকের রামায়ণ, অথবা একলক্ষ শ্লোকের মহাভারত হয়তো আমরা কখনো চোখেই দেখিনি। আমরা ইউরোপীয় মুখস্থ তোতাপাখির বিদ্যা দিয়ে সকলকিছুই দেখতে যেয়ে অনেক সময় অনেক অমার্জনীয় ভুল করে ফেলি। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের উদ্দেশ্য করে অনেক আগেই সতর্কবাণী উচ্চারণ করে রামায়ণ-মহাভারত যে ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস এবং সত্য ইতিহাস সে কথা স্মরণ করে আমাদের পথের দিশা দিয়েছেন। কবিগুরু বলেছেন-


" শতাব্দীর পর শতাব্দী যাইতেছে কিন্তু রামায়ণ-মহাভারতের স্রোত ভারতবর্ষে আর লেশমাত্র শুষ্ক হইতেছে না। প্রতিদিন গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে তাহা পঠিত হইতেছে, মুদির দোকান হইতে রাজার প্রাসাদ পর্যন্ত সর্বত্রই তাহার সমান সমাদর। ধন্য সেই কবিযুগলকে, কালের মহাপ্রান্তরের মধ্যে যাঁহাদের নাম হারাইয়া গেছে, কিন্তু যাঁহাদের বাণী বহুকোটি নরনারীর দ্বারে দ্বারে আজিও অজস্রধারায় শক্তি ও শান্তি বহন করিতেছে, শত শত প্রাচীন শতাব্দীর পলিমৃত্তিকা অহরহ আনয়ন করিয়া ভারতবর্ষের চিত্তভূমিকে আজিও উর্বরা করিয়া রাখিতেছে।
এমন অবস্থায় রামায়ণ-মহাভারতকে কেবলমাত্র মহাকাব্য বলিলে চলিবে না, তাহা ইতিহাসও বটে; ঘটনাবলীর ইতিহাস নহে, কারণ সেরূপ ইতিহাস সময়বিশেষকে অবলম্বন করিয়া থাকে—রামায়ণ-মহাভারত ভারতবর্ষের চিরকালের ইতিহাস। অন্য ইতিহাস কালে কালে কতই পরিবর্তিত হইল, কিন্তু এ ইতিহাসের পরিবর্তন হয় নাই। ভারতবর্ষের যাহা সাধনা, যাহা আরাধনা, যাহা সংকল্প, তাহারই ইতিহাস এই দুই বিপুল কাব্যহর্ম্যের মধ্যে চিরকালের সিংহাসনে বিরাজমান।"
( দীনেশচন্দ্র সেন রচিত 'রামায়ণী কথা'র পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ভূমিকা )

সাহিত্য বিচারে, রামায়ণ পৃথিবীর প্রধান চারটি ক্লাসিক মহাকাব্যের প্রাচীনতম একটি মহাকাব্য। এবং
আধ্যাত্মিক, দার্শনিক এবং নীতিশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, রামায়ণ একটি সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন দর্শনের দীপ্তময় শাস্ত্র। প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভৌগলিকভাবে রামায়ণ একটি অভ্রান্ত গ্রন্থ । রামায়ণের অযোধ্যা, কিষ্কিন্ধ্যা, চিত্রকূট, লঙ্কা, সরজু নদী সহ সকল স্থানই ভৌগলিকভাবে বর্তমানে সেই সেই স্থানে অবস্থিত থেকে রামায়ণের কালের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য আজও বহন করে চলছে।
রামায়ণ শুধুমাত্র কাল্পনিক কাহিনী নয়, রামায়ণ হলো এই ভূখণ্ডের প্রাচীন ইতিহাস। এর অন্যতম পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ হলো রামসেতু, যা ভগবান শ্রীরামচন্দ্র লঙ্কায় পৌঁছানোর জন্য বানরসেনার সহায়তায় তৈরি করেছিলেন ; আজও তাঁর পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রামসেতু অক্ষত আছে। NASA-এর বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন সেতু এটি এবং এটি কোন প্রাকৃতিক সেতু নয়, সর্বপ্রাচীন এবং সর্ববৃহৎ মানবসৃষ্ট সেতু
কি নেই রামায়ণে? এ যেন একটি বিশ্বকোষ। রামায়ণের এ বিশ্বকোষ নির্মিত হয়েছে এক মর্যাদা পুরুষোত্তম দেব চরিত্রের উদ্বোধনে ; সেই দেব চরিত্রের নাম শ্রীরামচন্দ্র। যিনি শ্রীভগবানের অবতার রূপ পরিগ্রহ করে আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন, আদর্শ পরিবার কেমন হবে? আদর্শ দাম্পত্যজীবন কেমন হবে? আদর্শ সমাজ কেমন হবে? আদর্শ ভ্রাতৃত্ব কেমন হবে? আদর্শ সন্তান কেমন হবে? আদর্শ বন্ধুত্ব কেমন হবে? এ সকল আদর্শের একমাত্র দীপ্তিময় আদর্শরূপ হলেন ভগবান শ্রীরামচন্দ্র।


আজ ভগবান রামচন্দ্র বা রামায়ণের প্রসঙ্গ আসলেই কিছু মানুষ রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের শম্বুক হত্যার প্রসঙ্গ নিয়ে এসে রামচন্দ্রের চরিত্রে কালিমালিপ্ত করতে থাকেন। তাদের উদ্দেশ্যে সংক্ষেপে বলতে চাই - বর্তমানে প্রাপ্ত রামায়ণে উত্তরকাণ্ডের অনেকটাই প্রক্ষিপ্ত। সেখানে শম্বুকবধের কাহিনীটি যে প্রক্ষিপ্ত, এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এর সবচেয়ে বড় প্রমান হলো- রামায়ণের বালকাণ্ডে ১ম এবং ৩ য় সর্গে দুটি সূচিপত্র পাওয়া যায় ; প্রথম সূচিপত্রে নারদের মুখে সমগ্র রামচরিত সংক্ষেপে বর্ণিত, কিন্তু সেখানে উত্তরকাণ্ডের অথবা তার শম্বুকবধের কোন কথাই নেই। অর্থাৎ শম্বুকবধ পরবর্তীকালে কোন বর্ণবাদী দ্বারা সংযোজিত। যে রামের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেন নিষাদরাজ গুহক, যিনি বর্তমান জাতপাতের পরিভাষায় হলেন শূদ্র। যেই রামচন্দ্র শূদ্র কুলোদ্ভূত শবরীর মুখের এঠো ফল খেয়েছেন ; সেই রামচন্দ্র কি করে শুধুমাত্র তপস্যার কারণে একজন শূদ্রকে হত্যা করবেন? এ কি বিশ্বাসযোগ্য? এরকম অসংখ্য মিথ্যাচার ছড়ানো আছে রামায়ণকে কেন্দ্র করে, যার সুফল নিচ্ছে ভারতবর্ষের বিরোধী, হিন্দুবিরোধী কিছু সাম্প্রদায়িক ইতিহাসবেত্তারা। তাই আমাদের নতুন প্রজন্মের উচিত এ সকল মিথ্যাচারকে অপনোদন করে প্রকৃত ইতিহাসের গতিপথকে অক্ষুণ্ণ রাখা।
বহু বছরের বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা আমাদের এদেশীয় সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোকে আমাদের মন থেকে মুছে দেয়ার অপচেষ্টা করেছে, যার ফলে শিক্ষিত শ্রেণীর আমরা অনেকেই আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতে শিখেছি। এ ঘৃণা এবং অবজ্ঞাই আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাভিমানকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে৷ কিছু তথাকথিত বামপন্থী এবং সেকুলার নামধারী বুদ্ধিজীবীদের দ্বিচারিতা আমাদের জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐক্যবদ্ধ চিন্তাকে বিভ্রান্ত করে চলছে৷ এ তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা শ্রীরামের অস্তিত্ব এবং কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও, রাবণ তাদের কাছে মহিমান্বিত মহান। রাম-রাবণের শুভ-অশুভের দ্বন্দ্ব তাদের তথাকথিত গবেষণার পরিভাষায় হলো, অনার্যদের উপরে আর্যদের আগ্রাসন! অাশ্চর্যের বিষয়, আজও এই দ্বিচারীদের বিভিন্নভাবে জ্ঞানত বা অজ্ঞানত সমর্থন যুগিয়ে চলেছে কিছু বোধশক্তিহীন, আত্মকেন্দ্রিক কুলাঙ্গার।
ভারতবর্ষের সকল ভাষাতে তো বটেই, তিব্বত, চীন, ফিলিপাইন, বার্মা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডীয়া, লাওস সহ এশিয়ার সকল জনপদে প্রচলিত আছে রামায়ণ বিভিন্ন নামে।


জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন ধর্ম, ন্যায় এবং কর্তব্য পালনের এক জাজ্বল্যমানতার পরাকাষ্ঠা। তাই তিনি সকল মানবের আদর্শ, মর্যাদা পুরুষোত্তম। তিনি পিতৃসত্য রক্ষার জন্যে চৌদ্দবছর বনবাস সহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ধর্ম পালনে ছিলেন আপোষহীন। সাধু সজ্জনের কাছে তিনি ছিলেন কুসুমের মত কোমল, আবার দুর্জ্জন অধর্মের বিনাশে তিনি নির্মম বজ্রধর । রামায়ণের অসংখ্য স্থানে ধর্মের মাহাত্ম্য এবং অধর্মকে বিনাশ করে ধর্মের শরণে থাকার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
ধর্মাদর্থঃ প্রভবতি ধর্মাৎ প্রভবতে সুখম্।
ধর্মেণ লভতে সর্বং ধর্মসারমিদং জগৎ।।
(অরণ্যকাণ্ড : ৯.৩০)


"ধর্ম হতেই অর্থ এবং প্রভাব আসে, ধর্ম থেকেই সুখ উৎপন্ন হয়।ধর্মের দ্বারাই জগতে সকল অভীষ্ট বস্তুর লাভ হয় ; সুতরাং এ জগতে ধর্মই প্রকৃত সারবস্তু। তাই সকলেরই ধর্মের শরণে থাকার সর্বদা চেষ্টা করা উচিত।"
ভগবান শ্রীরামচন্দ্র আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, ধর্মরক্ষার্থে শুধুমাত্র তথাকথিত ধর্ম পালন নয়; ধর্মরক্ষার জন্য অধর্ম, পাশবিক শক্তির সাথে নিরন্তর সংগ্রাম করাটাও আবশ্যক। তাই আজও ভগবান শ্রীরামচন্দ্রই সকল হিন্দুর আদর্শ, জীবনের ধ্রুবতারা। তাঁর আবির্ভাব তিথি শ্রীরামনবমী তাই আমাদের কাছে ক্ষাত্রশক্তি জাগরণের তিথি


আজ হিন্দু সাধুসন্ন্যাসী, ধর্মগুরু এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের সর্বাগ্রে কর্তব্য, ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের জীবনের ধর্মরক্ষার্থে অধর্ম বিনাশের শিক্ষাকে তাঁদের শিষ্য, অনুগামীদের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরা৷ রামায়ণে বর্ণিত শ্রীরামচরিতের বর্তমান যুগোপযোগী প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা করে সমাজ জাগরণের নূতন পথের উন্মেষ এখন সময়ের দাবী৷ দেশে দেশে হিন্দু আজ অত্যাচারিত, নিপীড়িত৷ হিংস্র বিদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসনে স্বভূমিতেই হিন্দুর অস্তিত্ব আজ বিপন্ন৷
আমাদের সামনে আদর্শের প্রয়োজন, পরিবার, সমাজ, সংসারে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের মত আদর্শিক মানবের প্রয়োজন। তাইতো মহর্ষি বাল্মিকী রামায়ণের শুরুতেই ত্রিলোকদর্শী দেবর্ষি নারদের কাছে জানতে চান, "জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ ধার্মিক, গুণবান এবং ধর্মরক্ষক কে?" এ প্রশ্নটিকে উপলক্ষ করে নারদ বাল্মিকীকে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের প্রায় সকল গুণাবলি ব্যক্ত করেন। মহর্ষি নারদ বলেন:
"বাল্মিকী তুমি যে-সমস্ত গুণের কথা উলেখ করলে তা সামান্য মানুষের মধ্যে সুলভ না। এমন গুণবান মনুষ্য এ পৃথিবীতে কে আছেন, এক্ষণে আমি তা স্মরণ করছি, তুমি শ্রবণ কর। শ্রীরাম নামে ইক্ষ্বাকুবংশীয় সুবিখ্যাত এক নরপতি আছেন। তাঁর বাহুযুগল আজানুলম্বিত, স্কন্ধ অতি উন্নত, গ্রীবাদেশ রেখাত্রয়ে অঙ্কিত, বক্ষঃস্থল অতি বিশাল, মস্তক সুগঠিত, ললাট অতি সুন্দর, নেত্ৰ আকৰ্ণবিস্তৃত ও গাত্রবর্ণ স্নিগ্ধ। তিনি নাতিদীর্ঘ ও নাতিহ্রস্ব; তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রমাণানুরূপ ও বিরল। সেই সর্বসুলক্ষণসম্পন্ন সর্বাঙ্গসুন্দর মহাবীর শ্রীরাম অতিশয় বুদ্ধিমান ও সদ্বক্তা। তিনি ধর্মজ্ঞ, সত্যপ্রতিজ্ঞ, বিনীত ও নীতিপরায়ণ; তাঁর চরিত্র অতি পবিত্র; তিনি যশস্বী, জ্ঞানবান, সমাধিসম্পন্ন, সকল জীবের প্রতিপালক এবং সর্বোপরি স্বধর্মের রক্ষক। তিনি আত্মীয়স্বজন সকলকেই রক্ষা করছেন। তিনি প্রজাপতিসদৃশ ও শত্রুনাশক। তিনি শরণাপন্নদের সর্বদা আশ্রয় দেন। তিনি বেদ-বেদাঙ্গে পারদর্শী, ধনুর্বিদ্যাবিশারদ, মহাবীর্য্যশালী, ধৈর্যশীল ও জিতেন্দ্রিয়। তিনি বেদাদি সর্ব শাস্ত্ৰজ্ঞ, প্রতিভাসম্পন্ন ও স্মৃতিশক্তি-যুক্ত। সকলেই তাঁর প্রতি প্রীতি প্রদর্শন করে থাকে। তিনি অতি বিচক্ষণ, সদাশয় ও তেজস্বী। নদীসকল যেমন মহাসাগরকে সেবা করে, সেইরূপ সাধুগণ সততই তাঁর সেবা করে থাকে। তিনি শত্ৰু-মিত্রের প্রতি সমদর্শী এবং অতিশয় প্রিয়দর্শন। সেই কৌশল্যাগর্ভসম্ভূত লোকপূজিত রাম গাম্ভীর্য্যে সমুদ্রের ন্যায়, ধৈর্যে হিমাচলের ন্যায়, বলর্বীযে ভগবান বিষ্ণুর ন্যায়, সৌন্দর্যে চন্দ্রের ন্যায়, ক্ষমায় পৃথিবীর ন্যায়, ক্ৰোধে কালানলের ন্যায়, বদান্যতায় কুবেরের ন্যায় ও সত্যনিষ্ঠায় দ্বিতীয় ধর্মের ন্যায় কীর্তিত হয়ে থাকেন। এ সকল গুণের আধার যিনি, তিনিই হলেন অযোধ্যার রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠ ও গুণ-শ্রেষ্ঠ পুত্র শ্রীরামচন্দ্র ।"


(বাল্মীকি রামায়ণ:আদিকাণ্ড, প্রথম সর্গ, ৮-১৯)
রামায়ণের অসংখ্য শিক্ষার মধ্যে অন্যতম শিক্ষা হচ্ছে দেশপ্রেম। রামায়ণে আমরা দেখি যখন রাবন বধের পরে লঙ্কা বিজিত হলো তখন লক্ষ্মণ রামচন্দ্রকে বললেন, - দাদা,এমন সুন্দর স্বর্ণময়ী লঙ্কা যখন বিজিত হয়েছে, তখন আমরা মাতৃভূমি অযোধ্যায় ফিরে না গিয়ে এখানেই রাজত্ব করতে পারি। তখন উত্তরে শ্রীরামচন্দ্র বলেন হীরকখচিত দীপ্তিময় এক উক্তি -
অপি স্বর্ণময়ী লঙ্কা ন মে রোচতে লক্ষণ।
জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী।।

"লক্ষণ এই লঙ্কাপুরী যদিও স্বর্ণময়ী অতীব সুন্দরী, তবুও তা আমার কাছে রূচিকর নয়; কারণ জননী এবং জন্মভূমি স্বর্গ থেকেও অধিকতর শ্রেষ্ঠ।"
তাই আমরা শ্রীরামচন্দ্রের ধর্মরক্ষা এবং দেশপ্রেমের আদর্শকে প্রত্যেকের জীবনে বাস্তবায়িত করার মানসে ; পৃথিবীর সকল আসুরিক শক্তিকে বিনাশ এবং শুভশক্তি, দৈবশক্তির উদ্বোধনে আমরা যেন প্রত্যেকেই আমৃত্যু কাজ করে যেতে পারি সেই দীপ্ত প্রেরণায় আসুন আমরা সকলেই সংঘবদ্ধভাবে সংকল্পবদ্ধ হই।


ওঁ রাং শ্রীরামচন্দ্রায় নমঃ
দশরথায় বিদ্মহে সীতাবল্লভায় ধীমহি।
তন্নো রামঃ প্রচোদয়াৎ।।
রামায় রামভদ্রায় রামচন্দ্রায় বেধসে।
রঘুনাথায় নাথায় সীতায়াঃ পতয়ে নমঃ।।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্ত্তী
সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ

Previous Post
Next Post
Related Posts