একাদশীর উপবাস কি শাস্ত্রে বাধ্যতামূলক?

Ekadashi, একাদশী,একাদশী মাহাত্ম্য, একাদশী কি, ভগবান বিষ্ণু, শ্রী কৃষ্ণ, পাপপুরুষ, পঞ্চশস্য,পাপ, ইস্কন, ISKCON, probupad,প্রভুপাদ
আমাদের যত Ritual আছে সবকিছুই আমাদের শাস্ত্রের বিশেষ করে বৈদিক শাস্ত্রের কোনো না কোনো টেক্সটের মধ্যে আছে, কিন্তু এরমধ্যে একাদশীকে কোনো বৈদিক টেক্সটের মধ্যে পাইনা আমরা।বেদের মধ্যে এত গৃহসূত্র আছে, এত ধর্মসূত্র আছে, এদের মধ্যে বা বেদের কোন অংশেই একাদশী সংক্রান্ত কিছু পাওয়া যায় না।
একটা যন্ত্রকে সপ্তাহে একদিন রেস্টে (Rest) রাখতে হয়।আমাদের শরীরটা একটা জটিল যন্ত্র, যতই নিরবচ্ছিন্ন কাজ করুক এর নিয়মিত বিশ্রাম বা রেস্টের প্রয়োজন।যদি নিত্যব্যবহার্য একটা যন্ত্রের রেস্টের প্রয়োজন হয়, তাহলে শরীর নামক এ জটিল যন্ত্রটির তো অবশ্যই রেস্টের প্রয়োজন আছে।কারন আমাদের পেটের অভ্যন্তরে খাদ্য পরিপাক করে যে যন্ত্রটি তার তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট, তাকে আমরা জঠরাগ্নি বলি।

পেটের অভ্যন্তরে এ জঠরাগ্নির প্রচণ্ড তাপ খাদ্যকে পরিপাক করে। এটা এমন একটা মেশিন, যে মেশিনে খাদ্য দেওয়া মাত্র পরিপাক করে প্রয়োজনীয় অংশ রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে পৌঁছে দেয়। তাই নিরবচ্ছিন্ন খেটে মরা এই দেহযন্ত্রটিকে সপ্তাহে অন্ততপক্ষে একদিন রেস্ট দেওয়া উচিত।

সপ্তাহে যদি না পারি, তাহলে ১৫ দিনে অন্ততপক্ষে বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে পারি।১৫ দিন অন্তর যদি না খেয়ে জঠরাগ্নিকে বিশ্রাম দেয়া হয়, তবে তা শরীরের জন্য ভাল।কিন্তু একাদশীর উপবাসের নামে পেটভরে খেয়েদেয়ে বর্তমানে যা হচ্ছে এটাকে আমি একাদশী বলব নাকি পেটাদশী বলব ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। একাদশী দিনে অনেককেই দেখি যে, উপবাসের নামে গাজরের হালুয়া, গাজরের মিষ্টান্ন, সাগুর মিষ্টান্ন, প্লেটে প্লেটে সব্জি সহ নিরবচ্ছিন্ন অমুক-সমুক দিনভর খেয়েই যাচ্ছে।

এদের কাণ্ডে মনে হয়, এটা কি উপবাস না উপবাসের নামে প্রহসন। নিজের প্রতিই নিজের প্রশ্ন আসে।
একঝুড়ি ফল এটা সেটা খেয়ে বলে,"না না শরীরটা আজকে ঠিক ভাল না,আজকে একাদশী আছি!"তো আমি আপনাদের বলব,একাদশী আপনি করেন,অবশ্যই করেন।কিন্তু,একাদশী নিয়ে বিভিন্ন অর্বাচীন পুরাণে যে কাহিনীগুলি আছে এ কাহিনীগুলো মোটেই মানা সম্ভব না।একাদশীর কথা আছে পদ্মপুরাণে। আমাদের হিন্দুদের মধ্যে দুইটা পুরাণ পদ্মপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ একেবারে আজগুবি কাহিনী দিয়ে ভর্তি, বিষয়টি একজন সংস্কৃতের স্টুডেন্ট মাত্রই জানেন।

এই পুরাণদুটি প্রায় ভোগাস, যা পরবর্তীকালের বাংলার কোনো পণ্ডিতদের দ্বারা লিখিত।অনেকে বলেছেন নবদ্বীপ বা তত্র এলাকার কোন পণ্ডিতদের লেখা।
ব্রহ্মবৈবতপুরাণ এবং পদ্মপুরাণ,এ দুইটা পুরাণের মধ্যে প্রচুর বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব দেখা যায় ।দুটোর মধ্যে বারেবারেই কাঁচি চালানো হয়েছে এটা যেকোন পুরাণ গবেষক ব্যক্তিমাত্রই জানে।পদ্মপুরাণের মধ্যে যে কাহিনীটি আছে একাদশী সম্পর্কে, তার উপরে ভিত্তি করে একটি সংগঠন থেকে "একাদশী মাহাত্ম্য" নামে একটা বই ছাপানো রয়েছে।সেই বইটা পড়লে পরে আপনার মনে আতঙ্ক বাসা বাঁধবে। সেখানে লেখা আছে প্রতি ১৫ দিন পরপর একাদশীর দিনে পৃথিবীর সকল পাপ অন্নের মধ্যে প্রবেশ করে, পঞ্চশষ্যের মধ্যে প্রবেশ করে, তাই সেদিন অন্ন খাওয়া যাবে না। এখানে অন্ন বলতে তারা শুধু পঞ্চশস্যকেই বুঝছে।

বেদের মধ্যে বিশেষ করে বেদমন্ত্রের মধ্যে আছে যে, অন্নকে কখনো নিন্দা করবে না,অন্নকে কখনো অতিক্রম করবে না।"অন্নং ব্রহ্ম" অর্থাৎ অন্নকে ব্রহ্মস্বরূপ বলা হচ্ছে। যেই অন্নকে বেদে ব্রহ্ম বলা আছে,যেই অন্নকে নিন্দা করতে নিষেধ করা আছে, যেই অন্ন কখনো অশুদ্ধ হয় না; তাহলে আমি কি করে মানতে পারি যে প্রতি ১৫ দিন পরপর সকল পাপ এই অন্নের মধ্যে, এই পঞ্চশষ্যের মধ্যে এসে প্রবেশ করে? এ অযৌক্তিক কথাগুলো কি অন্নরূপ ব্রহ্মের নিন্দা নয়?

যা খেয়ে প্রত্যেকটি জীব বেঁচে থাকে তাকেই অন্ন বলে।এ অন্নতেই আমরা বেঁচে থাকি, সকল জীব বেঁচে থাকে। তাই আমাদের দেহকে বলা হয় অন্নময় কোষ। বর্তমানে অন্ন বলতে যা বোঝানো হচ্ছে সেখানেই রয়েছে একটা বড় ধরনের ঘাপলা।বর্তমানে অন্নপাপ অন্নপাপ বলতে বলতে যাদের জীবন যাচ্ছে, তারা অন্ন বলতে শুধু ভাতকেই বোঝাচ্ছে। কিন্তু আমাদের শাস্ত্রে, বেদান্তে অন্ন বলতে চার প্রকার খাদ্যকে বোঝানো হয়েছে।এই চার প্রকার অন্ন হচ্ছে:
১.চর্ব্য- যা চিবিয়ে চিবিয়ে খাওয়া হয়; ভাল, রুটি সহ অধিকাংশ খাবার।
২.চোষ্য- যা চুষে চুষে খেতে হয়; শিশু এবং বৃদ্ধদের উপযোগী বিভিন্ন খাবার।
৩.লেহ্য- যা চেটে চেটে খেতে হয়; চাটনি জাতীয় বিভিন্ন খাবার।
৪.পেয়- যা পান করা হয়; দুধ, জল, চা ইত্যাদি।
বেদান্ত দর্শনের স্মৃতি প্রস্থানের হিরন্ময় গ্রন্থ শ্রীমদভগবদগীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের ১৪ নং শ্লোকে উল্লেখ্য এ চারপ্রকার অন্নের কথা অত্যন্ত সুন্দর করে বলা আছে।
অহং বৈশ্বানরো ভূত্বা প্রাণিনাং দেহমাশ্রিতঃ।
প্রাণাপানসমাযুক্তঃ পচাম্যন্নং চতুর্বিধম্।।
"অামিই প্রাণিগণের উদরে বৈশ্বানর অগ্নিরূপে স্থিত হয়ে প্রাণ ও অপান বায়ুর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে চর্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, এবং পেয় এ চতুর্বিধ অন্নকে পরিপাক করি।

জগতের সকল খাদ্যই এ চার প্রকার অন্নের মধ্যে পরে। অন্নে যদি প্রতি ১৫ দিন পরপর একাদশীর দিনে পাপ প্রবেশ করে, তাহলে তো একগ্লাস জলও খাওয়া যাবে না; কারণ গীতা বা বেদান্তের ভাষ্যানুসারে জলও চতুর্বিধ অন্নের মধ্যে পেয়রূপ অন্ন। জলের মধ্যেও পাপ প্রবেশ করবে। তাই আপনি পদ্মপুরাণ এবং নব বৈষ্ণবদের ভাষ্যানুসারে সেদিন জলও পান করতে পারবেন না। একাদশী করবেন, করুন; কিন্তু, মানুষকে ভয় দেখাবেন না। একাদশীর উপবাস অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শারীরিক দিক দিয়ে, কিন্তু তা বৈদিক শাস্ত্রে বাধ্যতামূলক নয়। এ কথাটিই আমি মূলত বলিতে চেয়েছি।

একাদশীর নামে পেটভরে খেয়েদেয়ে পেটাদশী থাকার দরকার নাই।অন্তত ১৫ দিনে একদিন শরীরের জঠরাগ্নি যন্ত্রটারে বিশ্রামে রাখুন, ভালো থাকতে পারবেন। সুস্থ থাকতে পারবেন।কিন্তু উপবাসের নামে পেট ভরে খেয়ে এই একাদশী ব্রতকে লোকদেখানো উৎসবে রূপান্তরিত করা এটা একটা নিছক মূর্খতা। পূর্ববর্তী বৈষ্ণব মহাজনেরা এভাবে খেয়েদেয়ে একাদশী পালন করেননি। তাঁরা ছিলেন দৈন্যতার মূর্ত প্রতীক।
শ্রীমদ্ভাগবতপুরাণ এবং বিষ্ণুপুরাণ হল বৈষ্ণব মতের প্রধান অবলম্বন। এ দুটি পুরাণের উপরে ভিত্তি করেই বৈষ্ণব মত প্রচারিত এবং সম্প্রসারিত। এ দুটি পুরাণের কোথাও একদশীর দিনে অন্নের মধ্যে পাপ প্রবেশ করে জাতীয় অলীক ভয় দেখানো কাহিনী নেই। এ কাহিনীটি আছে পদ্মপুরাণে এবং কিছু আছে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে। দুটি পুরাণই অর্বাচীনকালের, দুটিগ্রন্থের মধ্যে প্রচুর শ্লোক প্রক্ষিপ্ত হয়ে মূল অংশটিই প্রায় হারিয়ে গেছে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ একজন সচেতন হিন্দুর কখনই মানা সম্ভব না, কারণ এ গ্রন্থটির প্রকৃতিখণ্ডে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সম্পর্কে অনেক কদর্য কথা বলা আছে এবং প্রচুর পরস্পরবিরোধিতা আছে।
বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে আছে, উপবাস অর্থাৎ নিকটে বাস,কার নিকটে বাস? ব্রহ্মের নিকটে বাস।মেডিক্যাল সাইন্সে এ উপবাসকেই বলে 'অটোফেজি’ ( অবশ্য বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিতর্ক আছে)। ২০১৬ সালে নোবেল কমিটি জাপানের ডাক্তার ‘ওশিনরি ওসুমি’-কে উপবাস বা অটোফেজি আবিষ্কারের জন্যে নোবেল পুরষ্কারে পুরষ্কৃত করে।
একাদশী অবৈদিক প্রথা হলেও, এটাকে বাদ দেয়া অপ্রয়োজনীয়, কারণ সমাজে প্রথাটি জনপ্রিয়। আমরা এই প্রথাটি থেকে শুধু ভয় দেখানো অংশটি এবং উপবাসের নামে ভরপেট খাওয়া অংশটি বাদ দিতে পারি।একাদশী তিথিতে ভগবানের দিব্য নাম জপ, কীর্তন, ধ্যান ইত্যাদি পারমার্থিক কাজে সারাদিন অতিবাহিত করুন।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কিছুই না খেয়ে, দিনব্যাপী নির্জলা উপবাস থেকে ; যদি নির্জলা সম্ভব না হয় তবে সামান্য জল খেয়ে সন্ধ্যার পরে ফলমূল সহ সামান্য খাবার খেয়ে একাদশী ব্রত পালন করুন।এতে স্বাস্থ্য ভাল থাকবে, শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, সহসাই শরীরে কোন রোগ-ব্যাধি আক্রমণ করতে পারে না। এবং শরীরের সাথে সাথে আপনার মন সহ অন্তঃকরণও প্রফুল্লতা পাবে।

শ্রীকুশল বরণ চক্রবর্তী
সহকারী অধ্যাপক,সংস্কৃত বিভাগ,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
সভাপতি, সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ
Previous Post
Next Post
Related Posts