ব্রহ্মবিদ্যার খনি উপনিষদ্ | দেবত্ব লাভের পথ

ব্রহ্মবিদ্যার খনি উপনিষদ, Upanishad, Dharma in Upanishad, মানবতা, সনাতনধর্ম

উপনিষদ্ সহ সমগ্র বেদকে 'শ্রুতি' বলা হয় এই কারণে যে, ইহা ব্যক্তি বিশেষের রচিত কোন গ্রন্থ নহে; ইহা পরমার্থতত্ত্ব ঋষিগণের স্ব স্ব উপলব্ধি, গুরু শিষ্য শ্রুতিঃ ইহা কোনও বিশিষ্ট ধর্মগুরুর বাণী নহে; কতকগুলি সার্বজনীন সত্যের সমষ্টিঃ। শ্রুতি (লিখিত নহে) বলিয়া ইহার নাম শ্রুতি।

সত্যদ্রষ্টা ঋষিগণ তাঁহাদের ধ্যান বা অতীন্দ্রিয় উপলব্ধির দ্বারা যে জ্ঞান আহরণ করিয়াছিলেন, যুগ যুগ ধরিয়া ঋষি-মুখ-নিঃসৃত সেই বাণীই বেদের কলেবর। উপনিষৎ ইহার অপর নাম উপনিষদ্ অর্থাৎ যে বিদ্যা গুরুর পদপ্রান্তে নির্জনে উপবিষ্ট হইয়া আহরণ করিতে হইত।

শঙ্করাচার্যের মতে উপনিষদ্ শব্দটির অন্য অর্থ হইতেছে সেই বিদ্যা যাহার দ্বারা অবিদ্যাজনিত মোহ অপনোদন করা যায়, ব্রহ্মের নিকট পোঁছাইয়া দেয়। এই জন্য, সমগ্র বেদের শীর্ষস্থানীয় এই বিদ্যাকে 'ব্রহ্মবিদ্যা' বলা হয়।

প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ্ কে তিনটি বিভিন্ন বিষয় বলা ঠক হইবে না, কারণ আরণ্যকগুলি ব্রাহ্মণের অন্তর্ভুক্ত; যে বিদ্যা গুরু বাণপ্রস্থী শিষ্যকে অরণ্যে বাস করিয়া শিক্ষা দিতেন বেদের সেই অংশকে আরণ্যক আখ্যা দেওয়া হইয়াছে এবং উপনিষদগুলি এই আরণ্যকেরই অঙ্গীভূত। তবে উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যা বা ব্রহ্মজ্ঞানের প্রাধান্য আছে বলিয়া ইহাকে জ্ঞানকাণ্ড বলা হয়।

উপনিষদের সংগৃহীত বেদের সারতত্ত্বগুলিকে অনেকেই স্বীকার না করেন, তবে বিভিন্ন তান্ত্রিক পুরাণের কাহিনী ও মতবাদের বিষয়কে কখনোই হিন্দুধর্মের অঙ্গ বলা যায় না।

  • উপনিষদ্ এর মূলতত্ত্ব কি?


'উপনিষদ্' শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিষ্পন্ন হয়েছে সংস্কৃত 'সদ্' ধাতু থেকে, যার অনেকগুলি অর্থ আছে— শিথিল করা, চালনা করা, বিনাশ করা। এই তিন অর্থ একত্রিত করলে 'উপনিষদ্' শব্দের অর্থ দাঁড়ায় এই সেই দিব্যজ্ঞান অথবা জ্ঞান, যা আমাদের নিজ প্রকৃতির অজ্ঞানতার বন্ধনকে শিথিল করে, তা (অজ্ঞানতা) বিনাশপূর্বক চূড়ান্ত সত্যের দিকে চালিত করে।

যে পুস্তক অথবা ধর্মশাস্ত্র উক্ত 'জ্ঞান' শিক্ষা দেয় তাকেও 'উপনিষদ্' বলা হয়। 'উপনিষদ' শব্দটির আরো একটি অর্থ রয়েছে 'ভক্তি সহকারে নিকটে উপবেশন করা'। সেজন্য একান্তভাবে উপযুক্ত কাছে এই 'আধ্যাত্মিক জ্ঞান' বিতরণ করা হয়, অনুপযুক্ত কারো কাছে নয়।

'উপনিষদ্' অর্থে 'বেদান্ত' ও বোঝায় আক্ষরিক অর্থে 'বেদের অন্ত' বা 'বৈদিক জ্ঞানের সার' যা মানবের দেবত্ব বিষয়ে আলোচনা করে। প্রতিটি সৃষ্টিচক্রের সূচনায় স্বয়ং ঈশ্বর উপযুক্ত কয়েক জনের কাছে উপনিষদ্ কে ব্যক্ত করেন বলেই প্রচলিক বিশ্বাস তাই এগুলি শাশ্বত।

পার্থিব বিজ্ঞানের মতোই, পবিত্রমনা বৈদিক ঋষিদের দ্বারাই উপনিষৎ সমূহ আবিষ্কৃত হয়েছে। তাঁকেই ঋষি বলা হয়, যিনি সত্যদ্রষ্টা।

বিভিন্ন পণ্ডিত বলে থাকেন যে, বর্তমান রূপে প্রাপ্ত উপনিষদের সময়কার—
৪৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ (বালগঙ্গাধর তিলকের মতে),
২৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ (হ্যাং-এর মতে) ও
১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ (ম্যাক্স মূলারের মতে)।

আধুনিক ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা উপনিষদের সময়কাল ৭০০–৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলে নির্ধারণ করেছেন। যদিও অনেকগুলি উপনিষদ্ আছে, তবুও সেহুলির মধ্যে দশটিকে প্রধান উপনিষদ্ বলা হয়। ভারতের মহান দার্শনিক সন্ন্যাসী শ্রীমৎ আদি শঙ্করাচার্য ঐ উপনিষৎ সমূহের টীকা রচনা করেছিলেন।

সেগুলি হলোঃ— ঈশ, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মাণ্ডক, মাণ্ডূক্য, তৈত্তিরীয়, ঐতরেয়, ছান্দোগ্য এবং বৃহদারণ্যক উপনিষদ্।

উপনিষদের মূল শিক্ষার জ্ঞান এই যে প্রত্যেকের মধ্যেই দেবত্ব রয়েছে এই দেবত্বকে 'ব্রহ্ম' বা 'আত্মা' যা'ই  বলা হোক না কেন, এটিই হলো প্রত্যেকে জীবের দিব্য সত্তা যা দেহ, ইন্দ্রিয়, প্রাণশক্তি, মন, বুদ্ধি ও অহংজ্ঞান থেকে আলাদা এবং সদামুক্ত। জীবাত্মারূপী মানুষ স্বরূপত পবিত্র ও নিত্য।

বেশিরভাগ উপনিষৎ সমূহেই দেখা যায়, আচার্য ও শিষ্যের মধ্যে কথোপকথনের মাধ্যমে 'চরম সত্য' তথা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের চৈতন্যসত্তার বিষয় আলোচিত হয়েছে। উপনিষৎ সমূহই ভারতবর্ষের মূল ধর্মগ্রন্থ। ভারতবর্ষের সংস্কৃতি ও চিন্তাভাবনাকে হাজার হাজার বছর ধরে সেগুলি প্রভাবিত করেছে।

জড়পদার্থ অপেক্ষা আত্মা, প্রকৃতি অপেক্ষা মানবের শ্রেষ্ঠত্বকে ঘোষণার মাধ্যমে উপনিষৎ–সমূহ আধ্যাত্মিকতার এক মহান ঐতিহ্যের সৃষ্টি করেছে তাকে শক্তিশালী ও সংরক্ষিত করেছে। ঋষিরা যে কেবলমাত্র নির্ভীকচিত্তে অনুসন্ধানের মাধ্যমে উপনিষদুক্ত যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন তা নয়, বরং বিচারশক্তির অগম্য স্বতোলব্ধ আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ অনুভূতির দ্বারাই তাঁরা এটি করেছেন।

গবেষণামূলক অনুসন্ধান করতে গিয়ে ভরতীয় দার্শনিকগণ লক্ষ করেছেন। ভারতবর্ষের বাইরে পূর্ব এশিয়ার জাপান, চীন, কোরিয়া এবং পশ্চিমে মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে মানুষের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক জীবনে উপনিষদের বিশেষ প্রভাব রয়েছে।

আধুনিক কালে স্বামী বিবেকানন্দ উপনিষদের বাণী পাশ্চাত্যে প্রচার করেছিলেন। যার প্রভাবে পাশ্চাত্যের বহু চিন্তাবিদ ও দেশনায়কের জীবনে পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল। উপনিষৎ ভারতীয় সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারিত্বের মূলভিত্তি। উপনিষদ্ পাঠ না করলে কেউই ভারতীয় সারবস্তু উপলব্ধি বা তার সমাদর করতে পারবেন না। এগুলিই ভারতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার পূর্বসূরিতুল্য।

ভারতবর্ষের সকল ধর্মবিশ্বাস, ধর্মীয় রীতিনীতি, উৎসব ও দার্শনিক মতবাদ সমূহ এবং ভারতবর্ষের সকল যোগী, সাধু-সন্তের জীবন ও বাণীর উৎস উপনিষৎ সমূহে নিহিত রয়েছে।

ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি! ওঁ শান্তি!
শ্রী বাবলু মালাকার