গীতা ভাষ্য কি | গীতার সকল ব্যাখ্যাগ্রন্থই কি ভাষ্য ?

গীতা কি, গীতা ভাষ্য, শংকর ভাষ্য


বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক শ্রীমদভগবদগীতা ভাষ্যকার এবং বেদভাষ্যকারের দেখা মিলছে। তারা  শ্রীমদ্ভগবদগীতা এবং বেদচর্চা করছে, বিষয়টি অত্যন্ত আনন্দের। কিন্তু এই আনন্দের সাথে আরেকটি বিষয় চলে আসছে যে, যারা এই শ্রীমদ্ভগবদগীতা এবং বেদের তথাকথিত ভাষ্য রচনা করছেন; তারা প্রায় সকলেই সংস্কৃত ভাষা নিয়ে প্রথাগত বা কোন প্রতিষ্ঠানে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নূন্যতম পড়াশোনা করেননি। তাই তাদের সংস্কৃতের জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অবশ্য আধ্যাত্মিক জ্ঞানের জন্য কোন প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার প্রয়োজন নেই, একথা সত্য। কিন্তু বেদ এবং শ্রীমদ্ভগবদগীতার অনুবাদ ও ভাষ্য তৈরির ক্ষেত্রে সংস্কৃতের জ্ঞান আবশ্যক। তা না হলে অনুবাদে ভুল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রতি পদে পদে। এই ব্যক্তিরা গীতা বা বেদ প্রচারণা থেকে ব্যক্তিগত বা তাদের মতাদর্শ ধারণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রচার নিয়েই ব্যস্ত। কোন ভাষার অনুবাদ পড়ে সকল বিষয় কখনই সম্যক  উপলব্ধি করা যায় না । অনুবাদে সম্পূর্ণ ভাব কখনই ব্যক্ত হয় না। তাই গ্রন্থের প্রকৃত ভাবের সন্ধানে গ্রন্থটি যে ভাষার রচিত; সেই ভাষাতেই যথাসম্ভব পড়তে চেষ্টা করা উচিত। 

বর্তমানে আমরা চারিপাশে অনেক শ্রীমদ্ভগবদগীতার ভাষ্যকারের কথা শুনতে পাই। কিন্তু আমরা অনেকেই জানিনা ভাষ্য কাকে বলে? শ্রীমদ্ভগবদগীতার বাংলা অনুবাদ করে সেই অনুবাদের নিচে কয়েকটি সংস্কৃত ও কয়েকটি বাংলা লাইন বসিয়ে দিলেই তাকে ভাষ্য বলে না। ভাষ্যের সম্পূর্ণ বৈশিষ্ট্য এবং লক্ষণ রয়েছে। সূত্র অনুসারে বাক্য এবং স্বরচিত পথের দ্বারা সূত্রের ব্যাখ্যাকে ভাষ্য বলে। ভাষ্যে প্রশ্ন উত্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে, সেই প্রশ্নের যথাসম্ভব সমাধান দিতে হয়। তাই কোন সংস্কৃত শ্লোকের নিচে, সেই শ্লোকের মর্মার্থ অনুধাবনে কিছু বাক্য লিখলেই তা ভাষ্য বলে স্বীকৃত হয় না। বর্তমানকালের তথাকথিত ভাষ্যকারদের  অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তারা ভাষ্য বিষয়টি সম্পর্কেই খুব জ্ঞাত নন। তারা ভাষ্য বিষয়টি ভালো করে জানেন না বলেই, শ্লোকের ব্যাখ্যাকে ভাষ্য বলে প্রচার করেন। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং পরিতাপের। সংস্কৃতের রত্নাকরে প্রাচীনতম একটি ভাষ্যগ্রন্থ হল মহর্ষি পাতঞ্জলির মহাভাষ্য। ভাষ্য গ্রন্থটি একটি ব্যাকরণের গ্রন্থ। মহাভাষ্যকার পতঞ্জলির মূল লক্ষ্য ছিল মহর্ষি পাণিনির সূত্রের ব্যাখ্যা এবং তৎসহ কাত্যায়ন বররুচির বার্ত্তিক সূত্রেরও বিবরণ প্রদান করে নিজের অভিমত নিয়ে স্বমত স্থাপন। মহর্ষি পাতঞ্জলির মহাভাষ্য লক্ষণ প্রসঙ্গে বলা হয়:

সূত্ৰাৰ্থো বৰ্ণতে যত্র বাক্যৈঃ সূত্রানুসারিভিঃ।
 স্বপদানি চ বর্ণ্যন্তে ভাষ্যং ভাষ্যবিদো বিদুঃ।।

“সূত্রের অর্থ যেখানে বর্ণনা বা ব্যাখ্যা করা হয়, সূত্রের অনুসরণ করে বাক্যের দ্বারা যেখানে সূত্রার্থ বোঝান হয়, এবং নিজের রচিত পদের বা মতের ব্যাখ্যা করা হয়, তাকে ভাষ্যজ্ঞ পণ্ডিতেরা ভাষ্য বলে।”

ভাষ্যের এই একই প্রকার লক্ষণ পরাশর-উপপুরাণের অষ্টাদশ অধ্যায়েও পাওয়া যায়। সেখানে ভাষ্যের লক্ষণে বলা হয়েছে :

সূত্রস্থং পদমাদায় পদৈঃ সূত্রানুসারিভিঃ।
স্বপদানি চ বর্ণ্যন্তে ভাষ্যং ভাষ্যবিদো বিদুঃ।।

ভাষ্যের লক্ষণে যে বিষয়গুলো আবশ্যিক তা হল, প্রথমত সূত্রের অর্থ সুস্পষ্টভানে বর্ণনা বা ব্যাখ্যা করা।  সূত্রের অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় বাক্যের ব্যবহার দ্বারা সূত্রার্থ উপলব্ধিতে সহায়তা এবং যিনি ভাষ্য রচনা করবেন, ব্যকরণ এবং পরম্পরাকে অনুসরণ করে তার একটি স্বতন্ত্র যৌক্তিক অভিমত স্থাপন। সেই অভিমত অনুসারে তিনি শ্লোক,সূত্র ইত্যাদি ব্যাখ্যা করবেন। এ স্বরচিত অভিমত প্রসঙ্গে 'পদমঞ্জরী' গ্রন্থের প্রারম্ভে হরদত্ত বলেন, "আক্ষেপসমাধানপরো গ্রন্থঃ ভাষ্যম্"। অর্থাৎ যে গ্রন্থে প্রশ্ন উত্থাপনের সাথে সাথে সমাধান দেয়া হয়, তাকেই ভাষ্য বলে। উপর্যুক্ত আলোচনায় আমরা ভাষ্যের সুস্পষ্ট লক্ষণ পেলাম। এর মাধ্যমে আমরা শ্রীমদ্ভগবদগীতা বা বেদের যে সকল গ্রন্থ বাংলা ভাষায় দেখতে পাই, তা ভাষ্য নয়।

সমস্যাটি হয়েছে ইংরেজি কমেন্ট্রি শব্দ নিয়ে। সংস্কৃত ভাষায় শ্লোককে ব্যাখ্যা করার ভাষ্য, টীকা, টিপ্পনী, ন্যাস, পঞ্জিকা, ঢুণ্ডিকা, চূর্ণি ইত্যাদি অনেক প্রকার নাম রয়েছে। এদের সকলেরই বৈশিষ্ট্য স্বতন্ত্র। কিন্তু ইংরেজিতে শুধু একটিই শব্দ কমেন্ট্রি (Commentary)।  বিদেশি পণ্ডিতেরা বেদমন্ত্র বা সংস্কৃত শ্লোকের নিচে উক্ত সকল বাক্যকেই ইংরেজিতে কমেন্ট্রি বলে অবিহিত করেছে। সেই (Commentary) শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ  বিদেশি পণ্ডিতেরা করেছে ভাষ্য। এভাবেই বিদেশিদের ভুল সিদ্ধান্ত তাদের দ্বারা বাহিত হয়ে ভারতবর্ষের মানুষের চিন্তাতেও প্রবেশ করে বহুক্ষেত্রেই গোল পাকিয়ে দিয়েছে। তাদের শেখানো পথে আমরা ভাষ্য এবং ব্যাখ্যার পার্থক্য পর্যন্ত নির্ণয় করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

শ্রীমদ্ভগবদগীতার ভাষ্যের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বর্তমানে ভয়াবহ আকারে দেখা যায়, তা হল কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুগত শিষ্যরা অন্ধভাবে তাদের গুরুকৃত অনুবাদ বা ব্যাখ্যাকে অনুসরণ। অর্থাৎ গুরু যা বইতে লেখেছে, তাই সত্য। এ করতে গিয়ে তারা প্রচার করে যে, তাদের গুরুর লেখা শ্রীমদ্ভগবদগীতার অনুবাদই সর্বশেষ্ঠ। আজ পর্যন্ত কেউ এমন যথার্থ অনুবাদ করতে পারেনি এবং পারবেও না ইত্যাদি অতিস্তুতি বাক্য। এ কথাগুলো অন্ধ অনুসারী শিষ্যরা, প্রতিনিয়ত বলে চললেও, তারা একবারও নিজেদের বলা কথাগুলো বিচার করা দূরে থাক ভেবে দেখে না। তাদের গুরু গুরুর প্রতিষ্ঠান থেকে আগামীতে আর শ্রীমদ্ভগবদগীতার শ্রেষ্ঠ অনুবাদ হওয়ার সম্ভাবনা নেই- এ কথা বলে তারা শ্রীমদ্ভগবদগীতাকেই সংকীর্ণ করে ফেলছে। অথচ শ্রীমদ্ভগবদগীতা অনন্ত ভাবময়ী ঈশ্বরের বাণী। আজ থেকে লক্ষ এবং কোটি বছর পরেও যদি শ্রীমদ্ভগবদগীতার ভাষ্য বা ব্যাখ্যা রচিত হয়; তবে সেই লক্ষ-কোটি বছর পরে শ্রীমদ্ভগবদগীতা থেকে নতুন নতুন তথ্যের উদ্ভব হবে। এ প্রসঙ্গে শ্রীঅরবিন্দের একটি উক্তি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন যে, আগামী পৃথিবীতে শ্রীমদ্ভগবদগীতার হাজার হাজার ব্যাখ্যা রচিত হলেও এমন সময় কখনও আসবে না যে, যখন শ্রীমদভগবদগীতার নূতন ব্যাখ্যার আর প্রয়োজন হবে না। 

"গীতা অক্ষয় মণির আকর। যুগে যুগে আকরস্থ মণি যদি সংগ্রহ করা যায়, তথাপি ভবিষ্যৎ বংশধরগণ সর্ব্বদা নূতন নূতন অমূল্য মণিমাণিক্য লাভ করিয়া হৃষ্ট ও বিস্মিত হইবেন।

এইরূপ গভীর ও গুপ্তজ্ঞানপূর্ণ পুস্তক অথচ ভাষা অতিশয় প্রাঞ্জল, রচনা সরল, বাহ্যিক অর্থ সহজবোধগম্য। গীতাসমুদ্রের অনুচ্চ তরঙ্গের উপরে উপরে বেড়াইলেও, ডুব না দিলেও, কতক শক্তি ও আনন্দ বৃদ্ধি হয়। গীতারূপ আকরের রত্নোদ্দীপিত অন্ধকারের ভিতর প্রবেশ না করিয়া চারিপার্শ্বে বেড়াইলেও তৃণের মধ্যে পতিত উজ্জ্বল মণি পাওয়া যায়, ইহজীবনের তরে তাহাই লইয়া ধনী সাজিতে পারিব।

গীতার সহস্র ব্যাখ্যা হইলেও এমন সময় কখনও আসিবে না যখন নূতন ব্যাখ্যার প্রয়োজন হইবে না। এমন জগৎশ্রেষ্ঠ মহাপণ্ডিত বা গভীর জ্ঞানী গীতার ব্যাখ্যা করিতে পারেন না যে তাঁহার ব্যাখ্যা হৃদয়ঙ্গম হইলে বলিতে পারি, হইয়াছে, ইহার পরে আর গীতার ব্যাখ্যা করা নিষ্প্রয়োজন, সমস্ত অর্থ বোঝা গেল। সমস্ত বুদ্ধি খরচ করিয়া এই জ্ঞানের কয়েকদিক মাত্র বুঝিতে ও বুঝাইতে পারিব, বহুকাল যোগমগ্ন হইয়া বা নিষ্কাম কৰ্ম্মমার্গে উচ্চ হইতে উচ্চতর স্থানে আরূঢ় হইয়া এই পর্যন্ত বলিতে পারিব যে গীতোক্ত কয়েকটি গভীর সত্য উপলব্ধি করিলাম বা গীতার দু-একটি শিক্ষা ইহজীবনে কার্য্যে পরিণত করিলাম। লেখক যেটুকু উপলব্ধি করিয়াছেন, যেটুকু কৰ্ম্মপথে অভ্যাস করিয়াছেন, বিচার ও বিতর্ক দ্বারা তদনুযায়ী যে অর্থ করিয়াছেন, তাহা অপরের সাহায্যার্থে বিবৃত করা এই প্রবন্ধগুলির উদ্দেশ্য।"

(শ্রীঅরবিন্দ ২০০১ : ১)

শ্রীমদ্ভগবদগীতা সর্বদাই জ্ঞানের একটি মহাসমুদ্র হয়ে, নিত্য নতুন তথ্য প্রদান করবে। একটি রসালো আখের সকল রস নিংড়ে নেয়ার পড়ে থাকে শুধুই আখের ছাবা। শ্রীমদ্ভগবদগীতা কোন আখ নয় যে, ভাষ্যকারগণ, ব্যাখ্যাকারগণ সেই আখের জ্ঞানরূপ সকল রস নিংড়ে নিতে পারবেন। শ্রীমদ্ভগবদগীতা অনন্ত ভাববৈচিত্রময়ী; যেখানে সকল মত পথেরই সন্ধান দেয়া আছে। তাই কোন গুরু বা প্রতিষ্ঠানের অন্ধ অনুসারী না হয়ে মুক্তভাবে অনন্ত মতপথের দিশারী শ্রীমদ্ভগবদগীতার জ্ঞানকে গ্রহণ করতে হবে।

তথ্য সহায়তা:

১. শ্রীঅরবিন্দ, গীতার ভূমিকা, শ্রীঅরবিন্দ আশ্রম, পণ্ডিচেরী: পুনর্মুদ্রণ ২০০১

কুশল বরণ চক্রবর্ত্তী 
সহকারী অধ্যাপক, 
সংস্কৃত বিভাগ, 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়