বৈদিক ভ্রূণতত্ত্ববিদ্যা। ভ্রূণ বিবর্তনজ্ঞানের মূল উৎস।

বৈদিক-ভ্রূণতত্ত্ববিদ্যা-ভ্রূণ-বিবর্তনজ্ঞানের-মূল-উৎস

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অধ্যায়নরত প্রতিটি ব্যক্তি যখন ভ্রূণতত্ত্ববিদ্যা অর্থাৎ মাতৃজঠরে একটি বিন্দুসম কোষ থেকে কি করে একটি পূর্ন মানবসন্তান অস্তিত্ববান হয় তার বর্ননা পড়েন তখন নিশ্চিতভাবেই তিনি পুনঃপুনঃ বিস্মিত হন; কি অপূর্ব,কি নিঁখুত এক আশ্চর্য প্রনালী যার বিবরন পিয়ানো হাতে মায়েস্ত্রোর মত দিয়ে গেছেন মানব উৎকর্ষের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বিজ্ঞানীগন।আর আধুনিক গবেষনামূলক বিজ্ঞানের এই ছোঁয়া যদি পাওয়া যায় হাজারো বছর প্রাচীন ঋষিদের লিখিত বৈদিক উপনিষদে তাহলে সেই বিস্ময় তো দিগন্ত ছাড়াতে বাধ্য।

ঠিক এভাবেই বিস্মিত হতে হয় মহর্ষি মহিদাস এর লিখিত ঋগ্বেদীয় ঐতরেয় উপনিষদ পড়তে গেলে।মানুষ সৃষ্টির কথা সংক্ষেপে বলতে গিয়ে তিনি অসাধারন দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন জড়ায়ুতে একটি ভ্রূণনের বিবর্তন প্রক্রিয়া,এর লিঙ্গ নির্ধারনের নিয়ামক।
কিছুকাল আগেও অনগ্রসর সমাজে পুত্র বা কন্যাসন্তান জন্মের বিবাদে নারীদেরকেই দায়ী করা হত,আর এতে করে পারিবারিক কলহ থেকে শুরু করে নারী নির্যাতনসহ ঘটে যেত নানা অনাচার যতদিন পর্যন্ত না আধুনিক বিজ্ঞান আবিস্কার করল যে পুরুষ শুক্রানুর X ক্রোমোসোমের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিই সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারক,নারীর এতে কোন ভূমিকা নেই।



ঐতরেয় উপনিষদ এর দ্বিতীয় অধ্যয়ের প্রথম মন্ত্রে ঋষি মহিদাস বলেছেন,

"পুরুষে হ বা অয়মাদিতো গর্ভো ভবাতি।"

অর্থাৎ নিশ্চয়ই এই শিশু(প্রকৃতি) প্রথমেই পুরুষ বীর্যে ভবাতি বা স্থাপিত হয়।

অর্থাত্ মন্ত্রটি স্পষ্টত ব্যখ্যা করছে শুক্রানুর মাধ্যমেই সন্তানের প্রকৃতি অর্থাত্ তা ছেলে হবে না মেয়ে হবে তা নির্ধারিত হয়।



এখন নজর দেয়া যাক ভ্রূণনের বৃদ্ধি প্রক্রিয়ার দিকে।আধুনিক বিজ্ঞান বলছে জাইগোট তৈরীর ৩২ দিনের মাথায় ভ্রূণনের মাথা এবং মুখের সমন্বিতরুপ Stomodium দেখা যায়।পঞ্চম সপ্তাহে অলফ্যক্টরি প্ল্যকোড অর্থাত্ ঘ্রানসম্পর্কিত ইন্দ্রিয় এর উত্পন্ন হয়।এরইমধ্যে মুখের মধ্যে পেলেট,টাঙ,ভোকাল কর্ড তৈরী হয়।



আধুনিক ভ্রূণতত্ত্ববিদ্যা অনুসারে এই সময়ে ১২মি.মি. দীর্ঘ ভ্রূণনের মুখ,নাসারন্ধ্র দেখা গেলেও কোন চোখের উৎপত্তি হয়না।ভ্রূণনের বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ মি.মি. হলে তাতে চোখ দেখা যায় তবে কান এর উত্পত্তি হয় আরো পরে।


এইসব ই হয় দ্বিতীয় মাসের মধ্যে।৮-৯ সপ্তাহে Integumentary system অর্থাত্ ত্বকীয় তন্ত্রের এপিডার্মিস এর উত্পত্তি শুরু হয়।আবার ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে ইংল্যন্ডের গ্লাসগোতে অবস্থিত কুইনস মাদার হসপিটালের ডা.রবিনসন ডায়াসোনার এপারেটাস এর সাহায্যে প্রমান করেন যে উপরোক্ত বর্ননাসমূহের অব্যবহিত পরেই দ্বিতীয় মাসের শেষে জড়ায়ুস্থ সন্তানের হৃদপিন্ডের সঞ্চালন শুরু হয়।
তাহলে আধুনিক বিজ্ঞানের বর্ননা অনুযায়ী ক্রমটা দাড়াচ্ছে এরকম-
মুখ>ভোকাল কর্ড>নাক>চোখ>কান> ত্বক>হৃদপিন্ড।


ঐতরেয় উপনিষদ এর প্রথম অধ্যয়ের প্রথম খন্ডের চার নং মন্ত্রটি দেখে নেয়া যাক-

"যথান্ডম মুখাদ্বাগ(মুখাত্ বাক) বাচোহগ্নির্নাসিকে
 নিরভিদ্যেতাং নাসিকাভ্যাং প্রাণঃ প্রানাদ্বায়ুরক্ষিনী
নিরভিদ্যেতামক্ষিভ্যাং চক্ষুশ্চ্ক্ষুষ আদিত্যঃ

 কর্ণৌ নিরভিদ্যেতাং কর্ণাভ্যাং শ্রোত্রং নিরভিদ্যতত্বচো হৃদয়ং নিরভিদ্যত হৃদয়া "

অর্থাৎ
, প্রথম মুখ বেরিয়ে এল,মুখ থেকে বাক(Vocal cord) এর উৎপত্তি।এরপর নাসিকার দুটি ছিদ্র হল(নাসারন্ধ্র),পরে চক্ষুর দুটি ছিদ্র প্রকট হল।তারপর কর্ণের দুটি ছিদ্র বেরিয়ে এল এবং এরপরেই চর্ম প্রকটিত হল।তার হৃদয়(হৃদপিন্ড) প্রকট হয়।

তাহলে মন্ত্রটি অনুযায়ী আমরা পেলাম,
মুখ>বাক(Vocal cord)>নাকে>চক্ষু>কান>ত্বক>হৃদপিন্ড!


এভাবেই সেই প্রাচীন যুগের অরন্যে ধ্যনাবস্থিত ঋষিগন প্রকাশ করে গেছেন আপ্ত সত্যের বাণী,গড়ে দিয়েছেন এক অনন্য সভ্যতা,মহান বৈদিক সভ্যতা। By : choturranga
Previous Post
Next Post
Related Posts